হাবিবুর রহমানের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। মাসে ৫৮ হাজার টাকা বেতন পান, তারপরও এখন ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে তাঁকে। গরুর মাংস বন্ধ, ফল বন্ধ, ছুটির দিনে বাচ্চাদের নিয়ে বের হওয়া বন্ধ। এটা শুধু হাবিবুরের গল্প না। ঢাকার লাখো পরিবারের এখন একই অবস্থা। আর এই অবস্থা তৈরিতে বিএনপি সরকারের ভূমিকা সরাসরি এবং অনস্বীকার্য।
ক্ষমতায় আসার দুই মাসের মধ্যে এই সরকার গ্যাস আর জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারে একলাফে ৬০০ টাকা বাড়ল। ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা। এগুলো শুধু সংখ্যা না, এগুলো মানুষের থালা থেকে খাবার কমে যাওয়ার হিসাব। লাইজু বেগম গৃহকর্মীর কাজ করেন, ভাড়া বাসায় থাকেন, লাইনের গ্যাস নেই, সিলিন্ডার ছাড়া উপায় নেই। তাঁর কাছে ৬০০ টাকা মানে অনেক কিছু। বিএনপি সরকার সেই হিসাবটা করেনি, করার প্রয়োজন মনে করেনি।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়লে সবজি থেকে ডিম সব কিছুর দাম বাড়ে, এটা অর্থনীতির প্রাথমিক পাঠ। বিএনপির নেতারা এই পাঠ জানেন না, এমন দাবি করলে সেটা হাস্যকর হবে। তারা জানেন, জেনেশুনেই করেছেন। এক সপ্তাহে ডিমের দাম ডজনে ২০ টাকা বেড়েছে, সোনালি মুরগির দাম কেজিতে গত বছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেশি, চালের দাম মাসে ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর সঙ্গে বোতলজাত সয়াবিন তেলের কৃত্রিম সংকট চলছে প্রায় দুই মাস ধরে। কোম্পানিগুলো দাম বাড়াতে চায়, সরকার আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়নি, কিন্তু ডিলার পর্যায়ে দাম বেড়ে গেছে। সুতরাং ভোক্তার পকেট কাটা হচ্ছেই, শুধু দায়টা নেওয়া হচ্ছে না।
এখানে একটা জরুরি প্রশ্ন উঠে আসে। এই সরকার কার প্রতিনিধিত্ব করছে? ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ছিল না। সাধারণ মানুষ ভোট দিতে যায়নি। যে নির্বাচনে জনগণ নেই, সেই নির্বাচনে জেতা সরকারের কাছে জনগণের কষ্টের হিসাব চাওয়াটাই আসলে বেমানান। কারণ জনগণের ভোটের মুখোমুখি না হয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে না, থাকার কথাও না। হাবিবুর রহমান বা লাইজু বেগমের মতো মানুষ এই সরকারকে ভোট দেয়নি, পছন্দ করেনি, বেছে নেয়নি। তবু তাদের সিদ্ধান্তের মাশুল গুনতে হচ্ছে এই মানুষগুলোকেই।
বিএনপি দলটির জন্ম ইতিহাস সবার জানা। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর ছায়ায় বসে এই দলটি বানিয়েছিলেন রাজনৈতিক ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে। সেই উত্তরাধিকার বহন করে চলা দলটি যখন আবার ক্ষমতায় আসে, তখন প্রথমেই যা করে সেটা হলো সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ানো। তিন বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে আট থেকে নয় শতাংশের মধ্যে ঘুরছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি কমছে না। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বাড়ানো মানে আগুনে ঘি ঢালা।
ক্যাবের সভাপতি সফিকুজ্জামান ঠিকই বলেছেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগে দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছে সরকারের নীতি। বাজার নজরদারি নেই, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই, ভোক্তার স্বার্থ রক্ষার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। যে সরকার নিজেই জনগণের রায় ছাড়া ক্ষমতায় বসেছে, তারা ভোক্তার অধিকার নিয়ে মাথা ঘামাবে, এই আশা করাটাই বোধহয় ভুল।
এপ্রিল মাস চলছে। গরম পড়েছে। মানুষ বাজারে যাচ্ছে, পকেটে টাকা কম নিয়ে ফিরছে। হাবিবুর রহমানের মতো মধ্যবিত্ত মানুষ ধার করছেন। লাইজু বেগমের মতো নিম্নআয়ের মানুষ হিসাব মেলাতে পারছেন না। এই দায় বিএনপি সরকারের, এবং শুধু এই সরকারের।

