বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি’ নিয়ে দেশজুড়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। এই চুক্তির বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সরাসরি পঙ্গু করে দেওয়ার এবং সামরিক বাহিনীকে নির্দিষ্ট একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল করে তোলার নীল নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
চুক্তির ‘সেকশন ৬’ এবং ‘অ্যানেক্স ৩’ অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার সশস্ত্র বাহিনীর জন্য মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বৃদ্ধি করার অঙ্গীকার করেছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এতে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশ ‘নির্দিষ্ট কিছু দেশ’ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র এবং সাশ্রয়ী সামরিক উৎসের বাজার হারাবে, যা প্রকারান্তরে সেনাবাহিনীকে আধুনিকায়নের বদলে মার্কিন ইচ্ছার দাসে পরিণত করবে।
চুক্তির ‘আর্টিকেল ৪.২’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ‘এক্সপোর্ট কন্ট্রোল রেজিম’ বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে মার্কিন ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সম্মত হয়েছে ইউনূস সরকার। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ কাকে সামরিক বা সংবেদনশীল প্রযুক্তি দেবে বা কার কাছ থেকে নেবে, তা এখন থেকে মার্কিন মানদণ্ড অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর চরম আঘাত এবং সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে মনে করা হচ্ছে।
চুক্তির ‘আর্টিকেল ৪.২.২’ অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন হতে পারে এমন কোনো লেনদেন বাংলাদেশ করতে পারবে না। শুধু তাই নয়, ‘আর্টিকেল ৪.৩.৫’ অনুযায়ী, মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি দণ্ড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ক্রয় করা থেকেও বাংলাদেশকে বিরত থাকতে হবে। এতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজ করার নাম দিয়ে মূলত বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট ব্লকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সাথে সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য করার এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সামরিক শক্তির ভারসাম্য নষ্ট করবে। ড. ইউনূসের এই চুক্তি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে এবং সামরিক বাহিনীকে আধুনিক সমরাস্ত্রের বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে বঞ্চিত করে কার্যত ‘পঙ্গু’ করার পথ প্রশস্ত করেছে।
যে কারণে আমেরিকার দাসত্ব পছন্দ ইউনূসের
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার মেয়াদের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন এক বাণিজ্য চুক্তিতে সই করেছিলেন, যা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই ‘রিসিপোকাল ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির শর্তগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্য চুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও দেশীয় শিল্পের ভবিষ্যৎকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়ার এক নীল নকশা। সমালোচকরা একে ‘দেশবিক্রির চুক্তি’ হিসেবেও অভিহিত করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, আমেরিকার কাছে দেশবিক্রির চুক্তি করে অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসেছিলেন ইউনূস। যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে নিজেদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে “ কোয়াড পোর্টস ফর ফিউচার” কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশে একটি বন্দর ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। এ উদ্যোগ মূলত এ অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে কমাতে করা হচ্ছে।
এরইমধ্যে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিদেশি অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সংস্থার প্রকাশিত তথ্য, কংগ্রেসে সাক্ষ্য এবং অনুদান ডাটাবেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক দশকে বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন, যুব উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএসবি নিউজ ইউএসএর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ৩২৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করেছে।
আমেরিকাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ঠিকানার এক প্রতিবেদনে গত বছর বলা হয়, ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানগত গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এশিয়া-আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। চীনের নৌসামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নৌঘাঁটি করার প্রস্তাব দিয়েছে। তারা ৯৯ বছরের জন্য দ্বীপের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লিজ নিতে চায়।
সূত্র বলছে, মিয়ানমারে চীন-সমর্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান নিতে সক্রিয় হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট, মানবিক করিডোর, এবং চট্টগ্রাম বন্দর—সব মিলে এই অঞ্চলটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে একটি “খ্রিস্টান রাজ্য” গঠনের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন অনেকে, যা পূর্ব তিমুরের ঘটনার সাথে তুলনা করা হচ্ছে।
একাধিক সূত্র ও বিশ্লেষকের মতে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এই ষড়যন্ত্রে “প্রক্সি নেতা” হিসেবে ব্যবহার করছে মার্কিন প্রশাসন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের সহায়তা, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে বাধা এবং বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টির মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যেন অন্য কোনো শক্তির হাতিয়ার হয়ে না পড়ে সেই বিষয়ে জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

