শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ফোনালাপ নজরদারির রেকর্ড লোপাটের উদ্দেশ্যে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে অকালে অবসরে পাঠানো, পরবর্তীতে তুলে নিয়ে পাসওয়ার্ড আদায় ও রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এনটিএমসির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে তলব করে শান্তভাবে জানান যে তাকে অবসরে পাঠানো হচ্ছে। পরবর্তী পদক্ষেপ জানতে চাইলে সেনাপ্রধান তাকে বাশার রোডের ‘নক্ষত্র’ ভবনে নিরাপদ বাসস্থানের আশ্বাস দেন।
তবে পরদিন ৭ আগস্ট রাতে ডিজিএফআই-এর সিটি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো কাউন্টার-টেরোরিজমের ব্রিগেডিয়ার তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীসহ একটি দল তার বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তাকে সেনানিবাসের ‘নির্ঝর আবাসিক এলাকা’র ডিজিএফআই মেসের ৬০৪ নম্বর কক্ষে আটকে রাখা হয়। ডিজিএফআই-এর মিডিয়া উইং থেকে ছড়ানো হয় যে, তিনি বিদেশ পালানোর চেষ্টাকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, এনটিএমসি-র অতি সংবেদনশীল ডেটা ও টেলিফোন কথোপকথনের পাসওয়ার্ড আদায়ের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন।
পরবর্তীতে, ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডির একটি ‘সেফ হাউসে’ নিয়ে সাবেক আইসিটি চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল তাকে শেখ হাসিনা ও মেজর জেনারেল (অব.) তারিক সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য চাপ দেয়। গুম সংক্রান্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিসও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
পরিবারকে হুমকি দিয়ে বলা হয় যে, রাজি হলে যেকোনো দেশে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া হবে, অন্যথায় সন্তানদের এতিম হতে হবে। তার বোন নাজনীন নাহারকে জানানো হয় যে, সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল মামুন ইতোমধ্যে রাজসাক্ষী হয়েছেন। জিয়াউল আহসান রাজি না হওয়ায় প্রসিকিউশন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার (আইকেবি) শরণাপন্ন হয়।
শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযানে জড়িত শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছিলেন যে, তাদের ফোনালাপ রেকর্ড এনটিএমসিতে সংরক্ষিত আছে এবং ভবিষ্যতে তা তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। জিয়াউল আহসান ২০০৯-২০১৪ সালে র্যাবে কর্মরত থাকাকালীন ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী (বিশেষ করে উলফা) দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং পরবর্তীতে লে. কর্নেল হাসিনুর রহমানের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সংযোগ তদন্তেও অংশ নেন। এসব কারণে তিনি প্রমাণ লোপাটে সহযোগিতা করতে রাজি হননি বলে অভিযোগ।
এছাড়া, বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে পাকিস্তানের আইএসআই, কিছু সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর যোগাযোগের প্রমান লোপাট করতে বলা হয়েছিলো।

