তৌহিদী জনতা শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একদল উন্মত্ত মানুষের ছবি। এদের চেহারায় ধর্মের প্রলেপ থাকলেও ভেতরে জ্বলতে থাকে নিষ্ঠুরতার চুল্লি। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এদেরই কর্মকাণ্ডে কলঙ্কিত হয়েছে ইসলামের সুমহান আদর্শ। নবীর মৃত্যুর দিন থেকে শুরু করে আজকের বাংলাদেশ পর্যন্ত এই তৌহিদী জনতার চরিত্র বদলায়নি এক বিন্দুও। এক হাতে কোরান আরেক হাতে তরবারি নিয়ে এরা ছিনিয়ে নিয়েছে অগণিত নিরপরাধ মানুষের জান ও ইজ্জত।
আজকের বাংলাদেশে সেই তৌহিদী জনতার আধুনিক ভার্সন জামাতে ইসলামী আর তার জ্বালানি হিসেবে আছে বিএনপি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের মানুষ দেখেছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক প্রহসন। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে সাজানো ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসে গেছে সেই শক্তি যার জন্মই হয়েছিল সেনানিবাসের গর্ভে। জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া এই দল আর তার সহচর যুদ্ধাপরাধী জামাত আজ দেশকে নিয়ে যাচ্ছে এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে।
এই জামাতের অদৃশ্য কিন্তু সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র তৌহীদী জনতা। এদের বোঝানো সম্ভব নয় যে কোরান কি বলে। এদের কানে পৌঁছায় না সুফিবাদের শান্তির বাণী। এরা শোনে না ফরিদউদ্দিন আত্তারের গল্প। এরা বোঝে না রুমির ভাষা। এরা শুধু বোঝে আগুন, পেট্রোল বোমা আর মব অ্যাটাক। এরা নিজেদের বিশ্বাসকে চাপিয়ে দিতে চায় পুরো জাতির উপর।
ইতিহাস বারবার সাক্ষী হয়েছে এই তৌহিদী জনতার বর্বরতার। নবীজির মৃত্যুর পর যখন তাঁর পবিত্র দেহ গোসল দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল তখনই একদল উন্মত্ত মানুষ মিছিল শুরু করলো এই যুক্তিতে যে গোসল দিতে গেলে কাপড় খুলতে হবে আর এতে নবীর অবমাননা হবে। অথচ নিজেরাই কত বড় অবমাননা করছে তা বোঝার মত জ্ঞানটুকুও তাদের ছিল না।
এরপর যখন আবু বকরকে খলিফা নির্বাচন করা হলো তখন আরেকদল তৌহিদী জনতা গিয়ে হাজির হলো ফাতেমা ও আলীর ঘরের সামনে। মশাল হাতে। তাঁরা খলিফার প্রতি আনুগত্য প্রকাশে দেরি করছিলেন এই অপরাধে ঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হলো। আবু বকর তাঁর পুরো সাতাশ মাসের শাসনকাল তৌহিদী জনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন। এই তৌহিদী জনতাই সর্বপ্রথম ইসলাম ত্যাগ করে মুসাইলিমাকে নতুন নবী হিসেবে মেনে নিয়েছিল।
খলিফা উমরকে হত্যার নেপথ্যেও সেই তৌহিদী জনতা। আবু লুলুয়া নামের এক ব্যক্তিকে ব্যবহার করে নামাজ পড়া অবস্থায় তাঁকে ছুরিকাঘাত করানো হয়। খলিফা উসমানকে নিজের ঘরে অবরুদ্ধ করে কোরান তিলাওয়াত করার সময় হত্যা করেছিল এই তৌহিদী জনতা। তাঁর স্ত্রী যখন বাঁচাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন তখন সেই ভদ্রমহিলার উপরও ছুরি চালাতে দ্বিধা করেনি এরা।
হযরত আলীর শাহাদাতের পেছনেও সেই তৌহিদী জনতারই হাত। ফজরের নামাজ পড়া অবস্থায় আব্দুর রহমান নামের এক খারেজী জঙ্গী ছুরি চালিয়ে দেয় তাঁর শরীরে। কোন কাফের বা মুশরিক নয়। যে নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করতো সেই খুন করলো ইসলামের চতুর্থ খলিফাকে। আর এই খারেজীরাই ইতিহাসের প্রথম ইসলামী রাজনৈতিক দল। পৃথিবীতে যত ইসলামী দল আছে সবই এই খারেজী কাফেলার বংশধর। যাকে তাকে কাফের বলার চল, কথায় কথায় তাকফিরের মত ভয়ংকর রোগ এদের কাছ থেকেই ছড়িয়েছে। কোরানের ভুল তাফসিরের আবিষ্কর্তাও এই খারেজীরা। এমনকি নারীদের বুরকা পরার নিয়মও খারেজীদেরই সৃষ্টি।
ইতিহাসের এই কলঙ্কিত অধ্যায়গুলো স্মরণ করলেই স্পষ্ট হয় যে তৌহিদী জনতা কোন ধর্মের অনুসারী নয়। এরা ক্ষমতার পূজারী। ধর্মকে ঢাল বানিয়ে নিজেদের পৈশাচিকতা চরিতার্থ করাই এদের একমাত্র কাজ। নবীপত্নী আয়েশা থেকে শুরু করে ইমাম হাসানের স্ত্রী হাফসা কিংবা ইমাম হুসাইনের স্ত্রী সহরবানু প্রত্যেককেই এই তৌহিদী জনতা যৌন হয়রানি আর কুপ্রস্তাব দিতে দ্বিধা করেনি। নবীর পুরো বংশকে নির্বংশ করেছিল এই তৌহিদী জনতা। ইমাম হাসানকে বিষপ্রয়োগ, কারবালার প্রান্তরে হুসাইনকে হত্যা এর সবই তৌহিদী জনতার কর্ম। কোন কাফের বা ইহুদী নয়। হুসাইনের পুত্র আলি আকবর, শিশুপুত্র আলি আসগর, হাসানের তিন পুত্র কাসেম, আবু বকর আর আব্দুল্লাহ এঁরা সবাই নবীর রক্তের উত্তরাধিকারী ছিলেন। এদের প্রত্যেককে হত্যা করেছিল এই তৌহিদী জনতা।
এমনকি কাবা ঘরও রক্ষা পায়নি এদের হাত থেকে। ৬৮৩ সালে উমাইয়া বাহিনী ও যুবায়ের বাহিনীর মধ্যে যখন সংঘর্ষ বাঁধে তখন তৌহিদী জনতা পবিত্র কাবা ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ৯৩০ সালে তৌহিদী জনতা কাবা ঘরেই গণহত্যা চালায়। হাজার হাজার হাজীকে হত্যা করে। আর হাজীরা যে কালো পাথরে চুমু খায় সেই পবিত্র হাজরে আসওয়াদ চুরি করে নিয়ে যায় বাহরাইনে। বিশ বছর সেটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ফাতেমী খলিফারা যে অসংখ্য লাইব্রেরি নির্মাণ করেছিলেন যেগুলোকে বলা হতো দার আল হিকমা সেই জ্ঞানের ভান্ডারগুলোও ধ্বংস করেছে এই তৌহিদী জনতা। কত অমূল্য গ্রন্থ যে এদের হাতে পুড়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ২০১৬ সালে মসজিদে নববীতে যে আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়েছিল সেটাও চালিয়েছিল তৌহিদী জঙ্গীরাই।
এখন প্রশ্ন হলো আজকের বাংলাদেশে এই তৌহিদী জনতা কারা। সরাসরি উত্তর দিলে বলতে হয় জামাতে ইসলামী আর তার মিত্র বিএনপি। এরা প্রকাশ্যে সহিংসতা না করলেও আড়াল থেকে এই তৌহিদী জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত দেশে যে আগুন সন্ত্রাস চালানো হয়েছিল তার পেছনে ছিল জামাতের তৌহিদী জনতা। ২০২৩ সালের শেষ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে সেখানেও এদের হাত স্পষ্ট।
বিএনপি আর জামাতের এই অশুভ জোট দেশকে ঠেলে দিচ্ছে তালেবানী এক রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে। যেখানে নারীরা পূর্ণাঙ্গ বোরকা ছাড়া ঘর থেকে বেরুতে পারবে না। যেখানে গানের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। যেখানে ভিন্ন মতের প্রকাশের জন্য শারীরিক নিগ্রহ থেকে শুরু করে প্রাণদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে নিরব থাকা মানে অপরাধে সহায়তা করা। ইতিহাস সাক্ষী আছে যখনই এই তৌহিদী জনতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তখনই মুসলিম উম্মাহর সর্বনাশ হয়েছে। আজ যদি আমরা এদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ না করি তাহলে ইসলাম নামের এই শান্তির ধর্মের বিলুপ্তি আসন্ন। হিন্দু ধর্ম সাত হাজার বছর ধরে টিকে আছে। আর ইসলামের বয়স মাত্র চৌদ্দশ বছর। খুব বেশি সময় নয়। অন্ধ অনুসারীদের জন্য অতীতেও অনেক শক্তিশালী ধর্ম বিলুপ্ত হয়েছে।
আমাদের সন্তানদের এই তৌহিদী জনতার আসল চেহারা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তাদের জানাতে হবে যে এরা কারা আর এদের ইতিহাস কতটা নৃশংস। মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই এজিদি জনতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। নইলে সারা বিশ্বে মুসলিম বিদ্বেষ বাড়বে আর ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য চাপা পড়ে যাবে এই তৌহিদী জনতার জঙ্গিবাদী তৎপরতার আড়ালে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এই তৌহিদী জনতার রাজনৈতিক অভিভাবকদের চিহ্নিত করা। বিএনপি আর জামাত যে এই তৌহিদী জনতাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তা এখন আর কারো অজানা নয়। ২০২৬ সালের সেই তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে এরা ক্ষমতায় এসে আবারো প্রমাণ করলো যে এদের কাছে গণতন্ত্রের কোন মূল্য নেই। জনগণ কর্তৃক বয়কট করা এক পাতানো ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এরা এখন দেশকে সেই পথেই নিয়ে যাচ্ছে যেই পথের শেষে অপেক্ষা করছে আফগানিস্তান বা সিরিয়ার মত ধ্বংসস্তূপ।

