মব জাগে যখন সরকার ঘুমায়: ভাঙা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের মৌনব্রত পালন

মাজারে আগুন জ্বলে, কবর ভাঙা হয়, মানুষ পিটিয়ে মারা হয় আর আমরা খবরের পাতায় সেই একই ছবি দেখি বারবার। চমকে ওঠার ক্ষমতাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছি আমরা। অথচ এই যে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া, এই যে নির্বিকার হয়ে পড়া, এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ অস্বাভাবিকতা। কিন্তু আজ আমি এই ঘটনাপ্রবাহকে আরেকটি আয়নায় দেখতে চাই। যে আয়নায় প্রতিফলিত হয় আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আর সেই ক্ষমতার বলয়ে বেড়ে ওঠা দায়মুক্তির সংস্কৃতি।

দেশজুড়ে যখন মব জাগে, যখন তৌহিদী জনতার ব্যানারে মাজারে হামলা হয়, যখন কোনো পীরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় প্রকাশ্য দিবালোকে, তখন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রথম প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সহিংসতার ঘটনাগুলোতে পুলিশ প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে নীরব দর্শকের মতো। কখনো কখনো তাদের উপস্থিতিই যেন মবকে আরো সাহস জোগায়। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা একটা প্যাটার্ন।

এই প্যাটার্নের পেছনে কাজ করে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অভয়। যখন কোনো সরকার মবের বিচার না করে বরং নীরবে তাদের বৈধতা দেয়, তখন সমাজে একটা বার্তা চলে যায়। বার্তাটা হলো, তুমি সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে, তুমি উগ্র হলে, তুমি ধর্মের দোহাই দিলে আইন তোমাকে ছুঁতে পারবে না।

বর্তমান বাস্তবতায় আমরা দেখছি, ইউনুস সরকার এবং তার পেছনে থাকা বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান এই মব সংস্কৃতিকে কার্যত আইনী স্বীকৃতি দিয়ে চলেছে। এটা কোনো আবেগতাড়িত অভিযোগ নয়, বরং ঘটনার পর ঘটনা বিশ্লেষণ করলে যে চিত্র ফুটে ওঠে তা এমনই।

বিএনপির জন্মই হয়েছে সেনানিবাসের ভেতরে, একজন স্বৈরশাসকের হাত ধরে। জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক দলটি বানিয়েছিলেন, সেটির ডিএনএই হলো ক্ষমতাকে যে কোনো মূল্যে ধরে রাখার মানসিকতা। এই দলটি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, জনগণের মতামতে বিশ্বাস করে না। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণ যে নির্বাচন সম্পূর্ণ বয়কট করেছিল, সেই পাতানো ভোটের মাধ্যমেই তারা ক্ষমতায় বসেছে। এটা কোনো নির্বাচন ছিল না, ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক প্রহসন।

যে সরকার এভাবে ক্ষমতায় আসে, তার কাছে জনগণের মতামতের কোনো মূল্য থাকে না। তাদের টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো বিভাজনের রাজনীতি, ভয়ের রাজনীতি, আর ধর্মকে ব্যবহার করে জনমানসে উগ্রতার বীজ বপন করা। মব সন্ত্রাস এ কাজে তাদের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, যখনই কোনো রাষ্ট্রক্ষমতা নিজের দুর্বলতা ঢাকতে চায়, তখনই সে ধর্মীয় উগ্রতাকে প্রশ্রয় দেয়। এটা কোনো নতুন কৌশল নয়। পাকিস্তানের জিয়াউল হক থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের তালেবান, সর্বত্র একই ছবি দেখা গেছে। বাংলাদেশেও এখন সেই একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে এখানে উগ্রতা এখনো পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় রূপ পায়নি, তবে দ্রুত সেদিকেই এগোচ্ছে।

যে ভিডিও ফুটেজগুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলোতে দেখা যায় কীভাবে মব নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করছে আর পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখছে। এটা কোনো ব্যর্থতা নয়, এটা নকশাকৃত নীরবতা। যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানে যে তারা কোনো ব্যবস্থা নিলে রাজনৈতিক মহল থেকে চাপ আসবে, তখন তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকে। আর এই নিষ্ক্রিয়তাই মবকে আরো উৎসাহিত করে।

এপ্রিল ২০২৬। আমরা এখন এই সময়ে দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে যখন ধর্মের নামে মানুষ মারার ঘটনা ঘটছে, যখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের শীর্ষ মহল থেকে কোনো জোরালো নিন্দা আসে না। বরং উল্টোটা হয়। দায়ীদের গ্রেপ্তার করা তো দূরের কথা, তাদের বিচারের আওতায় আনার কোনো উদ্যোগই দেখা যায় না। এটা কোনো অবহেলা নয়, এটা সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই সরকার জানে যে তাদের রাজনৈতিক ভিত্তি খুবই দুর্বল। তারা জানে যে জনগণ তাদের গ্রহণ করেনি। তাই তারা জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাতে চায়। ধর্মীয় বিভাজন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, মবের উত্থান এ সবই তাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। কারণ যখন সমাজ বিভক্ত থাকে, যখন মানুষ ধর্মের নামে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেগে থাকে, তখন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি তাদের থাকে না।

একটি সমাজ কখনোই সুস্থ থাকতে পারে না যদি সেখানে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আর এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয় তখনই যখন রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা নিজেরাই আইনের উর্ধ্বে থাকতে চান। ইউনুস সরকার এবং বিএনপির এই জোট শুধু যে নিজেরা আইনের উর্ধ্বে থাকতে চায় তা নয়, তারা তাদের পছন্দের লোকদেরও আইনের আওতার বাইরে রাখতে চায়। মব সন্ত্রাসীরা এই সুযোগটাই কাজে লাগায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর প্রতিকার কী? কীভাবে আমরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে পারি?

প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে যে এটা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটা রাজনৈতিক সমস্যা। যতদিন পর্যন্ত এই অবৈধ সরকার ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন মবের শক্তি বরং বাড়বে, কমবে না। কারণ এটা তাদের টিকে থাকার কৌশলেরই অংশ।

দ্বিতীয়ত, আমাদের মনে রাখতে হবে যে ভিন্নমত দমন করা যায় না। ইতিহাস সাক্ষী, যত রক্তই ঝরানো হোক, যত মাজারই পোড়ানো হোক, যত মানুষকেই হত্যা করা হোক, চিন্তাকে কখনোই হত্যা করা যায় না। মনসুর হাল্লাজকে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু তার কথা আজও বেঁচে আছে। সক্রেটিসকে বিষপান করানো হয়েছিল, কিন্তু তার দর্শন আজও আমাদের পথ দেখায়। যে সরকার ভাবে সহিংসতা দিয়ে তারা ভিন্নমত স্তব্ধ করে দিতে পারবে, তারা ইতিহাসের শিক্ষা থেকে কিছুই শেখেনি।

তৃতীয়ত, আমাদের নাগরিক সমাজকে আরো সোচ্চার হতে হবে। ভয়কে জয় করতে হবে। যখন রাষ্ট্র ন্যায়বিচার করতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকদের কণ্ঠই একমাত্র আশ্রয়। লেখালেখির মাধ্যমে, আলোচনার মাধ্যমে, সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে আমাদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে হবে। নীরবতা এই পরিস্থিতিতে অপরাধের সামিল।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশে যা ঘটছে তা শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারেরও প্রশ্ন। যখন একটি সরকার নিজের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, বরং উল্টো সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয়, তখন বিশ্বসমাজের দায়িত্ব আছে এর প্রতিবাদ জানানো।

পঞ্চমত, আমাদের ধর্মের প্রকৃত শিক্ষায় ফিরে যেতে হবে। যে ধর্ম মানুষ হত্যাকে উৎসাহিত করে, যে ধর্ম ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে না, সে ধর্ম আসলে ধর্মই নয়। ধর্মের মূল কথা হলো মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো। যখন ধর্ম ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সেটা সবচেয়ে বড় বিকৃতি।

সবশেষে বলতে চাই, এপ্রিল ২০২৬ এর এই বাংলাদেশে আমরা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। সামনের দিনগুলো আরো কঠিন হবে। কিন্তু আমাদের হাল ছাড়া চলবে না। কারণ ইতিহাসের গতিপথ কখনোই একরৈখিক নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় হবেই, সেটা আজ হোক বা কাল। প্রয়োজন শুধু ধৈর্য, সাহস, এবং ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার মানসিকতা।

মাজারে আগুন জ্বলুক বা না জ্বলুক, মানুষের ভেতরের যে আলো, যে নম্রতা, যে ভালোবাসা সেটাকে কোনো মব কখনোই নিভিয়ে দিতে পারবে না। সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আর এই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে এক অন্যায়মুক্ত সমাজ গঠনের পথে।

যে সরকার ভাবে মবের বিচার না করে তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে, তারা ভুল ভাবে। কারণ একদিন না একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের দাঁড়াতেই হবে। আর সেদিন এই সব রক্ত, এই সব আগুন, এই সব নীরবতা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। সদিচ্ছা থাকলেই শাস্তি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু সেই সদিচ্ছা যখন রাষ্ট্রের শীর্ষ মহলেই অনুপস্থিত, তখন নাগরিকদেরই সেই ইচ্ছাশক্তি জাগাতে হবে নিজেদের ভেতরে।

মাজারে আগুন জ্বলে, কবর ভাঙা হয়, মানুষ পিটিয়ে মারা হয় আর আমরা খবরের পাতায় সেই একই ছবি দেখি বারবার। চমকে ওঠার ক্ষমতাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছি আমরা। অথচ এই যে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া, এই যে নির্বিকার হয়ে পড়া, এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ অস্বাভাবিকতা। কিন্তু আজ আমি এই ঘটনাপ্রবাহকে আরেকটি আয়নায় দেখতে চাই। যে আয়নায় প্রতিফলিত হয় আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আর সেই ক্ষমতার বলয়ে বেড়ে ওঠা দায়মুক্তির সংস্কৃতি।

দেশজুড়ে যখন মব জাগে, যখন তৌহিদী জনতার ব্যানারে মাজারে হামলা হয়, যখন কোনো পীরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় প্রকাশ্য দিবালোকে, তখন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রথম প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সহিংসতার ঘটনাগুলোতে পুলিশ প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে নীরব দর্শকের মতো। কখনো কখনো তাদের উপস্থিতিই যেন মবকে আরো সাহস জোগায়। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা একটা প্যাটার্ন।

এই প্যাটার্নের পেছনে কাজ করে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অভয়। যখন কোনো সরকার মবের বিচার না করে বরং নীরবে তাদের বৈধতা দেয়, তখন সমাজে একটা বার্তা চলে যায়। বার্তাটা হলো, তুমি সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে, তুমি উগ্র হলে, তুমি ধর্মের দোহাই দিলে আইন তোমাকে ছুঁতে পারবে না।

বর্তমান বাস্তবতায় আমরা দেখছি, ইউনুস সরকার এবং তার পেছনে থাকা বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান এই মব সংস্কৃতিকে কার্যত আইনী স্বীকৃতি দিয়ে চলেছে। এটা কোনো আবেগতাড়িত অভিযোগ নয়, বরং ঘটনার পর ঘটনা বিশ্লেষণ করলে যে চিত্র ফুটে ওঠে তা এমনই।

বিএনপির জন্মই হয়েছে সেনানিবাসের ভেতরে, একজন স্বৈরশাসকের হাত ধরে। জিয়াউর রহমান যে রাজনৈতিক দলটি বানিয়েছিলেন, সেটির ডিএনএই হলো ক্ষমতাকে যে কোনো মূল্যে ধরে রাখার মানসিকতা। এই দলটি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, জনগণের মতামতে বিশ্বাস করে না। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণ যে নির্বাচন সম্পূর্ণ বয়কট করেছিল, সেই পাতানো ভোটের মাধ্যমেই তারা ক্ষমতায় বসেছে। এটা কোনো নির্বাচন ছিল না, ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক প্রহসন।

যে সরকার এভাবে ক্ষমতায় আসে, তার কাছে জনগণের মতামতের কোনো মূল্য থাকে না। তাদের টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো বিভাজনের রাজনীতি, ভয়ের রাজনীতি, আর ধর্মকে ব্যবহার করে জনমানসে উগ্রতার বীজ বপন করা। মব সন্ত্রাস এ কাজে তাদের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, যখনই কোনো রাষ্ট্রক্ষমতা নিজের দুর্বলতা ঢাকতে চায়, তখনই সে ধর্মীয় উগ্রতাকে প্রশ্রয় দেয়। এটা কোনো নতুন কৌশল নয়। পাকিস্তানের জিয়াউল হক থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের তালেবান, সর্বত্র একই ছবি দেখা গেছে। বাংলাদেশেও এখন সেই একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে এখানে উগ্রতা এখনো পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় রূপ পায়নি, তবে দ্রুত সেদিকেই এগোচ্ছে।

যে ভিডিও ফুটেজগুলো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলোতে দেখা যায় কীভাবে মব নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করছে আর পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখছে। এটা কোনো ব্যর্থতা নয়, এটা নকশাকৃত নীরবতা। যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানে যে তারা কোনো ব্যবস্থা নিলে রাজনৈতিক মহল থেকে চাপ আসবে, তখন তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকে। আর এই নিষ্ক্রিয়তাই মবকে আরো উৎসাহিত করে।

এপ্রিল ২০২৬। আমরা এখন এই সময়ে দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে যখন ধর্মের নামে মানুষ মারার ঘটনা ঘটছে, যখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের শীর্ষ মহল থেকে কোনো জোরালো নিন্দা আসে না। বরং উল্টোটা হয়। দায়ীদের গ্রেপ্তার করা তো দূরের কথা, তাদের বিচারের আওতায় আনার কোনো উদ্যোগই দেখা যায় না। এটা কোনো অবহেলা নয়, এটা সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন এই সরকার জানে যে তাদের রাজনৈতিক ভিত্তি খুবই দুর্বল। তারা জানে যে জনগণ তাদের গ্রহণ করেনি। তাই তারা জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরাতে চায়। ধর্মীয় বিভাজন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, মবের উত্থান এ সবই তাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। কারণ যখন সমাজ বিভক্ত থাকে, যখন মানুষ ধর্মের নামে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেগে থাকে, তখন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি তাদের থাকে না।

একটি সমাজ কখনোই সুস্থ থাকতে পারে না যদি সেখানে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আর এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয় তখনই যখন রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা নিজেরাই আইনের উর্ধ্বে থাকতে চান। ইউনুস সরকার এবং বিএনপির এই জোট শুধু যে নিজেরা আইনের উর্ধ্বে থাকতে চায় তা নয়, তারা তাদের পছন্দের লোকদেরও আইনের আওতার বাইরে রাখতে চায়। মব সন্ত্রাসীরা এই সুযোগটাই কাজে লাগায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর প্রতিকার কী? কীভাবে আমরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে পারি?

প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে যে এটা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটা রাজনৈতিক সমস্যা। যতদিন পর্যন্ত এই অবৈধ সরকার ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন মবের শক্তি বরং বাড়বে, কমবে না। কারণ এটা তাদের টিকে থাকার কৌশলেরই অংশ।

দ্বিতীয়ত, আমাদের মনে রাখতে হবে যে ভিন্নমত দমন করা যায় না। ইতিহাস সাক্ষী, যত রক্তই ঝরানো হোক, যত মাজারই পোড়ানো হোক, যত মানুষকেই হত্যা করা হোক, চিন্তাকে কখনোই হত্যা করা যায় না। মনসুর হাল্লাজকে হত্যা করা হয়েছিল, কিন্তু তার কথা আজও বেঁচে আছে। সক্রেটিসকে বিষপান করানো হয়েছিল, কিন্তু তার দর্শন আজও আমাদের পথ দেখায়। যে সরকার ভাবে সহিংসতা দিয়ে তারা ভিন্নমত স্তব্ধ করে দিতে পারবে, তারা ইতিহাসের শিক্ষা থেকে কিছুই শেখেনি।

তৃতীয়ত, আমাদের নাগরিক সমাজকে আরো সোচ্চার হতে হবে। ভয়কে জয় করতে হবে। যখন রাষ্ট্র ন্যায়বিচার করতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকদের কণ্ঠই একমাত্র আশ্রয়। লেখালেখির মাধ্যমে, আলোচনার মাধ্যমে, সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে আমাদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে হবে। নীরবতা এই পরিস্থিতিতে অপরাধের সামিল।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশে যা ঘটছে তা শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারেরও প্রশ্ন। যখন একটি সরকার নিজের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, বরং উল্টো সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয়, তখন বিশ্বসমাজের দায়িত্ব আছে এর প্রতিবাদ জানানো।

পঞ্চমত, আমাদের ধর্মের প্রকৃত শিক্ষায় ফিরে যেতে হবে। যে ধর্ম মানুষ হত্যাকে উৎসাহিত করে, যে ধর্ম ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে না, সে ধর্ম আসলে ধর্মই নয়। ধর্মের মূল কথা হলো মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো। যখন ধর্ম ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সেটা সবচেয়ে বড় বিকৃতি।

সবশেষে বলতে চাই, এপ্রিল ২০২৬ এর এই বাংলাদেশে আমরা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। সামনের দিনগুলো আরো কঠিন হবে। কিন্তু আমাদের হাল ছাড়া চলবে না। কারণ ইতিহাসের গতিপথ কখনোই একরৈখিক নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় হবেই, সেটা আজ হোক বা কাল। প্রয়োজন শুধু ধৈর্য, সাহস, এবং ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার মানসিকতা।

মাজারে আগুন জ্বলুক বা না জ্বলুক, মানুষের ভেতরের যে আলো, যে নম্রতা, যে ভালোবাসা সেটাকে কোনো মব কখনোই নিভিয়ে দিতে পারবে না। সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আর এই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে এক অন্যায়মুক্ত সমাজ গঠনের পথে।

যে সরকার ভাবে মবের বিচার না করে তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে, তারা ভুল ভাবে। কারণ একদিন না একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের দাঁড়াতেই হবে। আর সেদিন এই সব রক্ত, এই সব আগুন, এই সব নীরবতা তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। সদিচ্ছা থাকলেই শাস্তি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু সেই সদিচ্ছা যখন রাষ্ট্রের শীর্ষ মহলেই অনুপস্থিত, তখন নাগরিকদেরই সেই ইচ্ছাশক্তি জাগাতে হবে নিজেদের ভেতরে।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ