খুলনা শহরে গত দুই মাসে আটটি খুন, যার পাঁচটিতেই ব্যবহৃত হয়েছে গুলি। আহত অর্ধশতাধিক। আইনশৃঙ্খলার এই চিত্র যেন ২০০১-২০০৬ সালের দিককার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সেই সময় যখন দেশের বিভিন্ন নগরীতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী সন্ত্রাসী গ্রুপের গোলাগুলিতে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ত, যখন খুনের পর খুন, গুলির পর গুলি স্বাভাবিক সংবাদে পরিণত হয়েছিল।
যে বিএনপি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল, সেই সময়ের শেষ দিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল যে, ২০০৭ সালে সামরিক-বেসামরিক জোট সরকার এসে জরুরি অবস্থা জারি করে ব্যাপক অভিযান চালাতে বাধ্য হয়। কারাগারে ভর্তি হতে হয় সে সময়কার বহু সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীকে। শুধু খুলনা নয়, সারা দেশে তখন সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি ছিল অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পথের কাঁটা। সেই সময়ের অন্ধকার অধ্যায় আবার যেন ফিরে এসেছে আজ।
প্রশ্ন উঠতেই পারে : আজকে যারা ক্ষমতায়, তারা কি সেই অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শেখেনি? উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, এই সরকারের জন্মই যে গণতন্ত্রের লঙ্ঘন, জনগণের ভোটের প্রত্যাখ্যান আর স্বৈরাচারি পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সেই তথাকথিত নির্বাচন, যেখানে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশগ্রহণ করেনি, জনগণ ব্যাপকভাবে বয়কট করেছে, এবং নিজেরা নিজেদের ভোটের আয়োজন করে ক্ষমতায় বসেছেন আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছেন।
যে দলটির উত্থানই হয়েছিল ১৯৭৫-এর পর সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের হাত ধরে, যে দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অস্ত্রের রাজনীতি, সন্ত্রাসী গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা ও আধিপত্যের সংস্কৃতিকে লালন করে এসেছে, আজ তারই সভাপতি দেশের প্রধানমন্ত্রী, তার দলের মন্ত্রীরা পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিচ্ছেন। অথচ খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা নিজেই বলছেন, “সন্ত্রাসীরা জামিনে বেরিয়ে অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।” জামিন দেওয়া সেই বিচার ব্যবস্থার ওপর কার প্রভাব, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক তানিয়া সুলতানার কথায় উঠে এসেছে গভীর উদ্বেগ। তিনি ঠিকই বলেছেন, শুধু পুলিশের ওপর দায় চাপিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন হলো, যে সরকারের অস্তিত্বই সন্ত্রাসী সংস্কৃতির পুনরুত্থানের জায়গা তৈরি করে দিয়েছে, সেই সরকার কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সন্ত্রাসীদের চেয়ে চৌকস হওয়ার নির্দেশ দেবে?
গত দুই মাসে খুন হওয়া আটজনের প্রতিটি পরিবারের কাছে এটা শুধু পরিসংখ্যান নয়। গুলিবিদ্ধ অর্ধশতাধিক মানুষ প্রত্যেকেই কারো না কারো প্রিয়জন। পুলিশের তথ্য বলছে, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, আসামি হয়েছে ৩০ জন। কিন্তু সেই মামলাগুলোর পরিণতি কী হবে, সন্ত্রাসীরা কবে জামিনে বেরিয়ে আবার পুরোনো নেটওয়ার্ক চাঙ্গা করবে, সেই হিসেবটা আজকের খুলনা নাগরিকদের খুব ভালো করেই জানা।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে যেভাবে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির উৎপাত ছিল, আপাতদৃষ্টিতে ঠিক সেই চিত্র ফিরে এসেছে খুলনায়। তবে শুধু খুলনা কেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্রের দাপট, ভূমিদস্যুতা, দলীয় কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, রাস্তায় প্রকাশ্যে গুলি – সব মিলিয়ে মনে হয়, ফিরে এসেছে সেসব অন্ধকার দিন।
আইনশৃঙ্খলার এই অবনতি কেবল পুলিশি ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়। এটি রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির অনুপস্থিতি, এটি সেই রাজনৈতিক দলের শিকড়ের প্রতিফলন যা অস্ত্রের রাজনীতিকে লালন করে বেড়ে উঠেছে। খুলনায় প্রতিদিন যে খবর আসছে, তা একক থানার ব্যর্থতা নয়, এটি পুরো শাসন ব্যবস্থার সংকটের প্রতিচ্ছবি।
যখন একটি সরকার বৈধতার ভিত হারিয়ে বসে, তখন আইনের কঠোর প্রয়োগ তো দূরের কথা, জননিরাপত্তাই হয়ে ওঠে চরম অনিশ্চিত। খুলনার রাস্তায় আজ সাধারণ মানুষ যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তার সমাধান এই সরকারের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ এই সরকারের ভিত্তি যেখানে, সেই সেনানিবাসের জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতি যেখানে সন্ত্রাসের আশ্রয়, সেখানে প্রকৃত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নই অবান্তর।

