মানুষ যখন বিদায় নেয়, তখন সে সাধারণত নিজের পেছনে কিছু একটা ভালো স্মৃতি রেখে যেতে চায়। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই দলের মানুষ না। তিনি যাওয়ার সময়ও নিজের জন্য যা নেওয়ার নিয়ে গেছেন, রাখঢাক না করেই।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি, একেবারে চুপেচাপে, তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ড. ইউনূস দায়িত্ব হস্তান্তরের পর আগামী এক বছর ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে গণ্য হবেন এবং বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) নিরাপত্তা পাবেন। প্রজ্ঞাপনটি জারি হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইনের ক্ষমতাবলে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, আইনটা কী বলে আর উনি কী করলেন, সেটা একটু মিলিয়ে দেখলেই চিত্রটা পরিষ্কার হয়ে যায়।
২০০৬ সালের যে আদেশের কথা এখানে প্রাসঙ্গিক, সেখানে বলা ছিল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টারা পদ ছাড়ার পর সর্বোচ্চ তিন মাস এই সুবিধা পাবেন। তিন মাস। এক বছর না। আর ড. ইউনূস নিজে নিজের জন্য সেটাকে এক বছরে টেনে তুললেন। শুধু নিজের জন্য। বাকি যাদের কথা আইনে ছিল, তাদের সময়সীমা কিন্তু বাড়াননি তিনি।
এখানেই আসল বিষয়টা। আপনি যদি মনে করেন সময়সীমা তিন মাস থেকে বাড়ানো দরকার, তাহলে সবার জন্য বাড়ান। বিদায়ি রাষ্ট্রপতির জন্য, প্রধানমন্ত্রীর জন্য, সবার জন্য। কিন্তু উনি কেবল নিজেরটা বাড়ালেন। এই কাজটাকে আইনি ভাষায় যাই বলুন, সহজ বাংলায় এটা নিজের জন্য নিজে আইন বানানো। আইন বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, এটা সংবিধানের মৌলিক নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কোনো ব্যক্তির জন্য আইন প্রণয়ন করা যায় না, এটা আইনের প্রাথমিক পাঠ।
কিন্তু ড. ইউনূসের কাছে এই প্রাথমিক পাঠ বোধহয় কখনো পৌঁছায়নি। অথবা পৌঁছেছে, কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মনে করেননি।
ক্ষমতায় থাকার সাড়ে আঠারো মাসে তিনি কী করেছেন, সেটার একটা তালিকা করলে লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায়। নিজের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহার করিয়েছেন। নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোর সুদ মওকুফ করিয়েছেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে। ক্ষমতায় বসে নিজের নামে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েছেন, রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিয়েছেন। একজন মানুষ ক্ষমতায় এসে এত কিছু নিজের জন্য করতে পারেন, সেটা ভাবলেও অবাক লাগে।
আর এই সবকিছুর মাথায় এখন এই ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র তকমা। নোবেল বিজয়ী একজন মানুষ, যিনি দরিদ্র মানুষের ক্ষমতায়নের কথা বলে পুরো দুনিয়ায় নাম করেছেন, তিনি ক্ষমতা ছাড়ার আগের দিনগুলোতে নিজের নিরাপত্তা, নিজের সুবিধা, নিজের মামলা নিয়ে ব্যস্ত। এই বৈপরীত্যটা চোখে লাগার মতো।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রজ্ঞাপনটি ১০ ফেব্রুয়ারি জারি হলেও জনসমক্ষে আসতে সময় লেগেছে। মানে, এটা জনগণকে জানানোর উদ্দেশ্যে করা হয়নি। চুপেচাপে সেরে নেওয়া হয়েছে। যে কাজ সততার সঙ্গে করা হয়, সেটা লুকিয়ে করতে হয় না। এই লুকিয়ে করাটাই বলে দেয় এর পেছনে সততার লেশমাত্র নেই।
সুদের ব্যবসায়ে যিনি শ্রেষ্ঠ, তাকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ বলা চলে, সেটা অস্বীকার করার জায়গা নেই। তবে সেই গুরুত্বটা দেশের মানুষের কাছে না, নিজের কাছে। নিজেকে নিয়ে এত ভাবনা যার, তিনি কখনো দেশ নিয়ে ভাবেননি, ভাবতেও পারেন না। ইতিহাস এই মানুষটাকে মনে রাখবে, তবে ভালোভাবে না অবশ্যই।

