ক্ষমতা হস্তান্তরের পর সম্ভাব্য মব বা জনরোষের আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। এই নিরাপত্তাহীনতা থেকেই দায়িত্ব ছাড়ার মাত্র কয়েক দিন আগে, গত ১০ ফেব্রুয়ারি এক বিশেষ গেজেটের মাধ্যমে নিজেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য ‘ভেরি ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন’ বা ভিভিআইপি ঘোষণা করেছেন তিনি।
বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ) আইন-২০২১ এর ধারা ২(ক) ব্যবহার করে জারি করা এই গেজেটের ফলে তিনি বিদায়ের পর পরবর্তী এক বছর এসএসএফ-এর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে থাকবেন। সাধারণত বিদায়ী সরকারপ্রধানদের ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তা স্বয়ংক্রিয় নয়, তবে বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ড. ইউনূস নিজের জন্য এই সুরক্ষা নিশ্চিত করে গেছেন।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্বচ্ছতার খাতিরে সরকারি গেজেটগুলো বাংলাদেশ গভার্নমেন্ট প্রেসের (বিজি প্রেস) ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলেও ড. ইউনূসের এই ভিভিআইপি ঘোষণার গেজেটটি সেখানে পাওয়া যায়নি। বিজি প্রেসের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে আসা নথির ভিত্তিতে এটি মুদ্রিত হলেও তাদের বিশেষ অনুরোধেই তা ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়নি। এই গোপনীয়তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
‘রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বিধিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী, এখন থেকে ড. ইউনূসের বাসভবন, কর্মস্থল এবং দেশ-বিদেশের প্রতিটি পদক্ষেপে এসএসএফ নিয়োজিত থাকবে এবং তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ব্যাকগ্রাউন্ড কঠোরভাবে যাচাই করা হবে।
ড. ইউনূসের এই মব আতঙ্কের পেছনে তার আমলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্রকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ১৮ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব ভায়োলেন্স চরম আকার ধারণ করেছিল। ৪১৩টি গণপিটুনির ঘটনায় ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছেন অন্তত ৬০ জন।
এছাড়া বঙ্গবন্ধু ভবন ভাঙচুর, আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর হামলা, মাজার ভাঙচুর এবং আন্দোলনের সমন্বয়কদের চাঁদাবাজির মতো ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থার কারণে সাবেক এই শাসকরা এখন নিজেরাই জনরোষের কবলে পড়ার ভয় পাচ্ছেন।
নিরাপত্তাহীনতার এই একই কারণে সাবেক অনেক উপদেষ্টা সরকারি বাসভবন ছাড়তে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং চলতি ফেব্রুয়ারির মধ্যেই তাদের বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইতোমধ্যে মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডের বাংলো ও অ্যাপার্টমেন্টগুলো নতুন সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’ ছেড়েছেন। ১৮ মাসের শাসনকাল শেষে বিদায় নিলেও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই বিশেষ আইনি ঢাল ব্যবহার করা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

