যে সরকার প্রবাসীর টাকায় চলে, সে প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ডের খোঁজও রাখে না

নজরুল ইসলাম আর সুইটি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রথম এসেছে সৌদি প্রেস এজেন্সির মাধ্যমে। ১৫ অক্টোবর জেদ্দা কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র দপ্তরকে চিঠি লিখল, অর্থাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর। কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তা বললেন, বিচার চলা বা দণ্ড কার্যকরের কোনো নোটিফিকেশন বা কূটনৈতিক পত্র তাঁরা পাননি। সৌদি বিবৃতিতে ছিল শুধু দুটি নাম, আকামার নম্বর নেই, পাসপোর্টের তথ্য নেই। দুজন নাগরিকের প্রাণ যে রাষ্ট্রের খাতায় এতটা অচেনা, সেই রাষ্ট্রের সরকার এখন কোন মুখে বলবে সে প্রবাসীদের অভিভাবক?

কনস্যুলেটের এই সাফাই আবার টিকছেও না। ১৯ অক্টোবরের ডেইলি স্টার জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ সেপ্টেম্বরেই প্রায় ২ হাজার ৫০০ বন্দীর একটি তালিকা দিয়েছিল। তাতে নজরুল ও সুইটির নাম ছিল, আর একজনের অপরাধের ঘরে লেখা ছিল ‘অ্যাডাল্টারি’। যে দেশে ওই শব্দের শাস্তি কী হতে পারে, তা জানতে কোনো আইন বিশেষজ্ঞ লাগে না। তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের কথা সরাসরি ছিল না, মানলাম। কিন্তু ওই একটি শব্দ দেখেই তো দূতাবাসে বসে থাকা কর্মকর্তাদের ছুটে বেরোনোর কথা ছিল। তাঁরা বসে ছিলেন। আর ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে লাভ নেই। বন্দীকে ওই অনুচ্ছেদ চেনার দায় দেওয়া যায় না, কিন্তু তালিকা হাতে পেয়ে নিজেদের দায় চেনার কথা ছিল মিশনের।

মামলাটি জেদ্দার আদালতে চলেছে কয়েক মাস ধরে। দুজন বাংলাদেশি নাকি দোভাষীর কাজ করেছেন। মাসের পর মাস বিচার চলল, বাংলাদেশিরাই ভাষান্তর করলেন, অথচ বাংলাদেশ মিশনের কানে একটা কথাও পৌঁছাল না। এটাকে অবহেলা বললে কম বলা হয়। এই দোভাষীরা কারা, কে তাঁদের ঠিক করল, তাঁরা নিরপেক্ষ ছিলেন কি না, আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারছে না।

রায়ের ধরনটাই সবচেয়ে বড় খটকা। আদালত শাস্তি দিয়েছে তাআজির বিধানে, যেটা বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তি। ইসলামি ফৌজদারি আইনে জেনার শাস্তি পড়ে হদের আওতায়, আর হদ প্রমাণ করতে লাগে চারজন প্রাপ্তবয়স্ক নির্ভরযোগ্য সাক্ষী, যাঁদের আমলনামায় কোনো কালি থাকবে না। প্রমাণে সামান্য সন্দেহ থাকলে হদ বাতিল, ফকিহদের সবচেয়ে প্রচলিত মত এটাই। অভিযুক্ত বারবার স্বীকারোক্তি পাল্টাতে পারেন, আগের কথা প্রত্যাহারও করতে পারেন। অর্থাৎ হদের কঠিন শর্ত আসলে অভিযুক্তকে বাঁচানোর জন্যই। সেই শর্ত এড়িয়ে তাআজিরে যাওয়ার অর্থ, প্রমাণের কঠিন পরীক্ষাটাই বাদ দেওয়া। তার ওপর তাআজির সাধারণত ছিঁচকে অপরাধ, প্রতারণা, মারামারির বিচারের জন্য। বহু আলেমের মত, এতে দশ বেত্রাঘাতের বেশি শাস্তি দেওয়াও উচিত নয়। সেখানে মৃত্যুদণ্ড! রুডলফ পিটার্স তাঁর ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট ইন ইসলামিক ল বইয়ে দেখিয়েছেন, তাআজিরের অধীনে কঠোর শাস্তির পেছনে সাধারণত মূল অপরাধের বাইরের কোনো গূঢ় কারণ থাকে। সেই কারণ কী, ঢাকা খুঁজেছে? চার সাক্ষী কোথায় ছিল, এই প্রশ্নটুকুও কি কেউ সৌদি কর্তৃপক্ষকে করেছে? রায়টা বিচারিক হত্যা কি না, সে প্রশ্নের জবাব পাওয়ার আগেই লাশ মাটির নিচে।

এই সরকারের সমর্থকেরা বলবেন, কূটনীতিকেরা আগেও অনেক বন্দীকে ছাড়িয়েছেন। সত্যি, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালে ২০টি দেশ থেকে ৪৯ হাজার ৫০৩ জন ফিরেছেন, সৌদি আরব থেকেই ১৭ হাজার ৩৩৫ জন। কিন্তু এর বড় অংশ আকামা বা ভিসার মেয়াদ পেরোনো শ্রমিক। তাঁদের ‘মুক্তি’র মানে বিমানের টিকিট আর আউট-পাস জোগাড় করে দেওয়া। কাজটা দরকারি, কিন্তু প্রতিটি দূতাবাসের রুটিন কাজ। এই হিসাব দেখিয়ে মৃত্যুদণ্ডের মামলার জবাবদিহি এড়ানো যায় না। প্রথমটা খাতার কাজ, দ্বিতীয়টা প্রাণ বাঁচানোর কাজ।

আর প্রাণ বাঁচানোর কাজ যে চেষ্টা করলে হয়, তার প্রমাণ এই দেশের ইতিহাসেই আছে। ২০১০ সালে আরব আমিরাতে ছয় বাংলাদেশি শ্রমিকের কী হওয়া উচিত ছিল? তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল এক পাকিস্তানিকে খুনের। সেখানকার আদালত মৃত্যুদণ্ডই দিয়েছিল। আইন তো মানা হয়েছিল, রায় তো হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সেই ‘আইন’ মেনে নেয়নি। রক্তপণ হিসেবে চার লাখ দিরহাম, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৪ লাখ, সরকারি উদ্যোগে মিটিয়ে ছয়জনকে ফিরিয়ে এনেছিল। আজ যাঁরা ক্ষমতায়, সেই বিএনপি নজরুল আর সুইটির জন্য তাঁরা একবারও কি ফোন তুলেছিলেন?

ইন্দোনেশিয়া সাতিনাহকে বাঁচাতে ২০১৪ সালে সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ১৮-১৯ লাখ ডলার রক্তপণ দিয়েছে। জাকার্তার চেষ্টায় ফাঁসি পাঁচবার পিছিয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিজে সৌদি কর্তৃপক্ষকে তিনটি চিঠি লিখেছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরও চারজনের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন। ২০১১ সালে রুয়াতিকে না জানিয়ে শিরশ্ছেদ করার পর ইন্দোনেশিয়া সৌদিতে গৃহকর্মী পাঠানোই স্থগিত করেছিল। ফিলিপাইন গৃহকর্মীদের ন্যূনতম মজুরি দাবি করলে সৌদি আরব নিয়োগ বন্ধ করল, ম্যানিলা পিছু হটল না। শেষে ২০১৩ সালের মে মাসে চুক্তি হলো ১ হাজার ৫০০ রিয়াল ন্যূনতম বেতন, সাপ্তাহিক ছুটি, পাসপোর্ট না আটকানো, মুক্ত যোগাযোগ আর ২৪ ঘণ্টার সহায়তা ব্যবস্থা নিয়ে। ২০১৮ সালে কুয়েতে জোয়ানা ডেমাফেলিসের লাশ ফ্রিজারে পাওয়ার পর ফিলিপাইন শ্রমিক পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করল এবং চুক্তিতে আদায় করল শ্রমিকের নিজের ফোন রাখার অধিকার, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন আর উদ্ধারে বিশেষ পুলিশ ইউনিটের সহায়তা। ভারত ২০১৪ সালের ২ জানুয়ারি সৌদির সঙ্গে চুক্তিতে নিয়োগ খরচ বেতন থেকে কাটা নিষিদ্ধ করাল, শ্রমিকের নামে ব্যাংক হিসাব আর জরুরি অবস্থায় এক্সিট ভিসার ব্যবস্থা রাখাল। শ্রীলঙ্কাও একই মাসে প্রায় একই চুক্তি করল।

বাংলাদেশ গৃহকর্মী চুক্তি করল মাত্র ৮০০ রিয়াল মজুরিতে, ফিলিপাইনের প্রায় অর্ধেক। তখন ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া কর্মী পাঠানো বন্ধ রেখেছিল, দর কষার সুযোগ বাংলাদেশের হাতেই ছিল। বায়রা সভাপতি নিজেই স্বীকার করেছেন, তাঁরা সুরক্ষা আর মর্যাদার বদলে বাজার খোলাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তুরুপের তাস হাতে নিয়েও বাজার বাজার করে চেঁচানো, এটাই হলো নীতি।

২০১১ সালের অক্টোবরে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ হয়েছিল, কিসাস মামলায়, যেখানে ক্ষমার চাবি শুধু নিহতের পরিবারের হাতে। বাংলাদেশ তখন রক্তপণের প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু পরিবার রাজি হয়নি। ওই মামলায় রাষ্ট্র অন্তত চেষ্টা করেছিল। আর এবার বিএনপির নিস্ক্রিয়তার দাম দিতে হলো দুটি প্রাণ দিয়ে।

প্রতিটি মিশনে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলার তালিকা আর মাসিক নজরদারির একটা সেল থাকলে এই খবর পত্রিকায় আসত না, আসত কনস্যুলেটের ডেস্কে, বহু আগে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিলে আইনজীবী, স্বাধীন দোভাষী আর রক্তপণের নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকলে আদালতে বাংলাদেশি দোভাষীর পরিচয় নিয়ে আজ এই প্রশ্ন উঠত না। ইন্দোনেশিয়া এসব করেছে, আমাদের সরকার করেনি। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের গুণগান গাইতে সরকার এক পায়ে খাড়া, অথচ সেই মানুষ বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় উঠলে খোঁজ নেওয়ার মতো একটা ব্যবস্থাও তৈরি হয়নি।

নজরুল ইসলাম আর সুইটি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রথম এসেছে সৌদি প্রেস এজেন্সির মাধ্যমে। ১৫ অক্টোবর জেদ্দা কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র দপ্তরকে চিঠি লিখল, অর্থাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর। কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তা বললেন, বিচার চলা বা দণ্ড কার্যকরের কোনো নোটিফিকেশন বা কূটনৈতিক পত্র তাঁরা পাননি। সৌদি বিবৃতিতে ছিল শুধু দুটি নাম, আকামার নম্বর নেই, পাসপোর্টের তথ্য নেই। দুজন নাগরিকের প্রাণ যে রাষ্ট্রের খাতায় এতটা অচেনা, সেই রাষ্ট্রের সরকার এখন কোন মুখে বলবে সে প্রবাসীদের অভিভাবক?

কনস্যুলেটের এই সাফাই আবার টিকছেও না। ১৯ অক্টোবরের ডেইলি স্টার জানিয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ সেপ্টেম্বরেই প্রায় ২ হাজার ৫০০ বন্দীর একটি তালিকা দিয়েছিল। তাতে নজরুল ও সুইটির নাম ছিল, আর একজনের অপরাধের ঘরে লেখা ছিল ‘অ্যাডাল্টারি’। যে দেশে ওই শব্দের শাস্তি কী হতে পারে, তা জানতে কোনো আইন বিশেষজ্ঞ লাগে না। তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের কথা সরাসরি ছিল না, মানলাম। কিন্তু ওই একটি শব্দ দেখেই তো দূতাবাসে বসে থাকা কর্মকর্তাদের ছুটে বেরোনোর কথা ছিল। তাঁরা বসে ছিলেন। আর ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে লাভ নেই। বন্দীকে ওই অনুচ্ছেদ চেনার দায় দেওয়া যায় না, কিন্তু তালিকা হাতে পেয়ে নিজেদের দায় চেনার কথা ছিল মিশনের।

মামলাটি জেদ্দার আদালতে চলেছে কয়েক মাস ধরে। দুজন বাংলাদেশি নাকি দোভাষীর কাজ করেছেন। মাসের পর মাস বিচার চলল, বাংলাদেশিরাই ভাষান্তর করলেন, অথচ বাংলাদেশ মিশনের কানে একটা কথাও পৌঁছাল না। এটাকে অবহেলা বললে কম বলা হয়। এই দোভাষীরা কারা, কে তাঁদের ঠিক করল, তাঁরা নিরপেক্ষ ছিলেন কি না, আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারছে না।

রায়ের ধরনটাই সবচেয়ে বড় খটকা। আদালত শাস্তি দিয়েছে তাআজির বিধানে, যেটা বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তি। ইসলামি ফৌজদারি আইনে জেনার শাস্তি পড়ে হদের আওতায়, আর হদ প্রমাণ করতে লাগে চারজন প্রাপ্তবয়স্ক নির্ভরযোগ্য সাক্ষী, যাঁদের আমলনামায় কোনো কালি থাকবে না। প্রমাণে সামান্য সন্দেহ থাকলে হদ বাতিল, ফকিহদের সবচেয়ে প্রচলিত মত এটাই। অভিযুক্ত বারবার স্বীকারোক্তি পাল্টাতে পারেন, আগের কথা প্রত্যাহারও করতে পারেন। অর্থাৎ হদের কঠিন শর্ত আসলে অভিযুক্তকে বাঁচানোর জন্যই। সেই শর্ত এড়িয়ে তাআজিরে যাওয়ার অর্থ, প্রমাণের কঠিন পরীক্ষাটাই বাদ দেওয়া। তার ওপর তাআজির সাধারণত ছিঁচকে অপরাধ, প্রতারণা, মারামারির বিচারের জন্য। বহু আলেমের মত, এতে দশ বেত্রাঘাতের বেশি শাস্তি দেওয়াও উচিত নয়। সেখানে মৃত্যুদণ্ড! রুডলফ পিটার্স তাঁর ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট ইন ইসলামিক ল বইয়ে দেখিয়েছেন, তাআজিরের অধীনে কঠোর শাস্তির পেছনে সাধারণত মূল অপরাধের বাইরের কোনো গূঢ় কারণ থাকে। সেই কারণ কী, ঢাকা খুঁজেছে? চার সাক্ষী কোথায় ছিল, এই প্রশ্নটুকুও কি কেউ সৌদি কর্তৃপক্ষকে করেছে? রায়টা বিচারিক হত্যা কি না, সে প্রশ্নের জবাব পাওয়ার আগেই লাশ মাটির নিচে।

এই সরকারের সমর্থকেরা বলবেন, কূটনীতিকেরা আগেও অনেক বন্দীকে ছাড়িয়েছেন। সত্যি, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালে ২০টি দেশ থেকে ৪৯ হাজার ৫০৩ জন ফিরেছেন, সৌদি আরব থেকেই ১৭ হাজার ৩৩৫ জন। কিন্তু এর বড় অংশ আকামা বা ভিসার মেয়াদ পেরোনো শ্রমিক। তাঁদের ‘মুক্তি’র মানে বিমানের টিকিট আর আউট-পাস জোগাড় করে দেওয়া। কাজটা দরকারি, কিন্তু প্রতিটি দূতাবাসের রুটিন কাজ। এই হিসাব দেখিয়ে মৃত্যুদণ্ডের মামলার জবাবদিহি এড়ানো যায় না। প্রথমটা খাতার কাজ, দ্বিতীয়টা প্রাণ বাঁচানোর কাজ।

আর প্রাণ বাঁচানোর কাজ যে চেষ্টা করলে হয়, তার প্রমাণ এই দেশের ইতিহাসেই আছে। ২০১০ সালে আরব আমিরাতে ছয় বাংলাদেশি শ্রমিকের কী হওয়া উচিত ছিল? তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল এক পাকিস্তানিকে খুনের। সেখানকার আদালত মৃত্যুদণ্ডই দিয়েছিল। আইন তো মানা হয়েছিল, রায় তো হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সেই ‘আইন’ মেনে নেয়নি। রক্তপণ হিসেবে চার লাখ দিরহাম, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৪ লাখ, সরকারি উদ্যোগে মিটিয়ে ছয়জনকে ফিরিয়ে এনেছিল। আজ যাঁরা ক্ষমতায়, সেই বিএনপি নজরুল আর সুইটির জন্য তাঁরা একবারও কি ফোন তুলেছিলেন?

ইন্দোনেশিয়া সাতিনাহকে বাঁচাতে ২০১৪ সালে সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ১৮-১৯ লাখ ডলার রক্তপণ দিয়েছে। জাকার্তার চেষ্টায় ফাঁসি পাঁচবার পিছিয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিজে সৌদি কর্তৃপক্ষকে তিনটি চিঠি লিখেছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরও চারজনের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন। ২০১১ সালে রুয়াতিকে না জানিয়ে শিরশ্ছেদ করার পর ইন্দোনেশিয়া সৌদিতে গৃহকর্মী পাঠানোই স্থগিত করেছিল। ফিলিপাইন গৃহকর্মীদের ন্যূনতম মজুরি দাবি করলে সৌদি আরব নিয়োগ বন্ধ করল, ম্যানিলা পিছু হটল না। শেষে ২০১৩ সালের মে মাসে চুক্তি হলো ১ হাজার ৫০০ রিয়াল ন্যূনতম বেতন, সাপ্তাহিক ছুটি, পাসপোর্ট না আটকানো, মুক্ত যোগাযোগ আর ২৪ ঘণ্টার সহায়তা ব্যবস্থা নিয়ে। ২০১৮ সালে কুয়েতে জোয়ানা ডেমাফেলিসের লাশ ফ্রিজারে পাওয়ার পর ফিলিপাইন শ্রমিক পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করল এবং চুক্তিতে আদায় করল শ্রমিকের নিজের ফোন রাখার অধিকার, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন আর উদ্ধারে বিশেষ পুলিশ ইউনিটের সহায়তা। ভারত ২০১৪ সালের ২ জানুয়ারি সৌদির সঙ্গে চুক্তিতে নিয়োগ খরচ বেতন থেকে কাটা নিষিদ্ধ করাল, শ্রমিকের নামে ব্যাংক হিসাব আর জরুরি অবস্থায় এক্সিট ভিসার ব্যবস্থা রাখাল। শ্রীলঙ্কাও একই মাসে প্রায় একই চুক্তি করল।

বাংলাদেশ গৃহকর্মী চুক্তি করল মাত্র ৮০০ রিয়াল মজুরিতে, ফিলিপাইনের প্রায় অর্ধেক। তখন ভারত, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া কর্মী পাঠানো বন্ধ রেখেছিল, দর কষার সুযোগ বাংলাদেশের হাতেই ছিল। বায়রা সভাপতি নিজেই স্বীকার করেছেন, তাঁরা সুরক্ষা আর মর্যাদার বদলে বাজার খোলাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তুরুপের তাস হাতে নিয়েও বাজার বাজার করে চেঁচানো, এটাই হলো নীতি।

২০১১ সালের অক্টোবরে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ হয়েছিল, কিসাস মামলায়, যেখানে ক্ষমার চাবি শুধু নিহতের পরিবারের হাতে। বাংলাদেশ তখন রক্তপণের প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু পরিবার রাজি হয়নি। ওই মামলায় রাষ্ট্র অন্তত চেষ্টা করেছিল। আর এবার বিএনপির নিস্ক্রিয়তার দাম দিতে হলো দুটি প্রাণ দিয়ে।

প্রতিটি মিশনে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলার তালিকা আর মাসিক নজরদারির একটা সেল থাকলে এই খবর পত্রিকায় আসত না, আসত কনস্যুলেটের ডেস্কে, বহু আগে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিলে আইনজীবী, স্বাধীন দোভাষী আর রক্তপণের নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকলে আদালতে বাংলাদেশি দোভাষীর পরিচয় নিয়ে আজ এই প্রশ্ন উঠত না। ইন্দোনেশিয়া এসব করেছে, আমাদের সরকার করেনি। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের গুণগান গাইতে সরকার এক পায়ে খাড়া, অথচ সেই মানুষ বিদেশে মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় উঠলে খোঁজ নেওয়ার মতো একটা ব্যবস্থাও তৈরি হয়নি।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ