হিন্দুরা বাংলাদেশে “সংখ্যালঘু” নন, তাহলে কী?

গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বললেন, বাংলাদেশে কারও সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত হওয়ার দরকার নাই। একই মঞ্চে জানালেন, হিন্দুদের ভোটেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। হাততালি পড়ল, ছবি উঠল ব্যাপক। তেইশ দিন পর ২৭ সেপ্টেম্বর সেই একই মন্ত্রী সংবিধান সংশোধন কমিটির আহ্বায়ক হয়ে সংসদ মিডিয়া সেন্টারে ঘোষণা দিলেন, সংবিধানে “মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” ফিরছে। ডিসেম্বরে প্রতিবেদন, জানুয়ারিতে বিল, তারপর গণভোট।

একই মানুষ, এক মাসের মধ্যে দুই কথা। মঞ্চে বললেন হিন্দু সমান নাগরিক, কমিটির টেবিলে বসে ঠিক করলেন রাষ্ট্রের মূলনীতিতে কার ঈশ্বর থাকবে। সংখ্যালঘু শব্দটা তুলে দিলেই যদি সংখ্যালঘুর সমস্যা মিটে যেত, তাহলে এত সহজ কাজ আপনারা করলেন না কেন এখনো?

ইতিহাসটা বিএনপির নিজের হাতেই লেখা অবশ্য। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের ফরমানে আট অনুচ্ছেদ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা সরে গেল, বসল আল্লাহর ওপর আস্থা। বারো অনুচ্ছেদ পুরোটাই বাদ। এখন সেই পুরনো ফরমানের পথেই ফেরার ঘোষণা আসছে, এবার গণভোটের মোড়কে।

অথচ ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রধর্ম পাসের সময় যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, দেশের নব্বই শতাংশ মানুষের মূল্যবোধ, সেই নব্বই তখন সত্যই ছিল না। ১৯৮১ সালের শুমারিতে মুসলমান ছিলেন ৮৬.৬ শতাংশ। আজও অ্যাটর্নি জেনারেল হাইকোর্টে দাঁড়িয়ে বলেন, এই দেশের ৯০ ভাগ মুসলমান, তাই আল্লাহর ওপর আস্থা ফেরা উচিত। সংখ্যার যুক্তি চলছে চল্লিশ বছর ধরে, শুধু বক্তা বদলায়।

বিএনপির পাশে বসা জামায়াতের বক্তব্য আরও মজাদার। জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, তাদের শাসনে অমুসলিমরা নিরাপদ থাকবেন। নিরাপদ থাকবেন, মানে নিরাপত্তা একটা দয়া। কেউ দিলে পাবেন, না দিলে নাই। বরগুনার বামনায় জামায়াতের নির্বাচনী সমাবেশে দলে সদ্য যোগ দেওয়া এক ব্যক্তি প্রকাশ্যে বলেন, কোনো বিধর্মী এই দেশে সংসদ সদস্য হতে পারবে না। দল পরে তাকে “আলাদা” করল। কিন্তু মাইক্রোফোনটা তো দলেরই ছিল, মঞ্চটাও।

২০০১ সালের কথা কি এত তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে পারে কেউ? বিএনপি-জামায়াত জোট জেতার পর হিন্দু বাড়িতে হামলা, লুট, ধর্ষণ হলো দেশের নানা জায়গায়। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, নৌকায় ভোট দেওয়ার শাস্তি ছিল এটা। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় স্কুলছাত্রী পূর্ণিমা রানী শীলকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হলো। মামলার রায় এল ২০১১ সালে। বিএনপি এখন হিন্দুর ভোটে ক্ষমতায় আসার গল্প শোনায়। ২০০১ সালে হিন্দুর ভোট যে দলে গিয়েছিল, তার শাস্তি কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, সেই হিসাব ২৫ বছরেও মেটেনি।

২০২৬ সালের আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে আর বারো বছরের ছেলের লাশ পাওয়া গেল। পরিবার পুলিশের বিবরণ মানেনি। ঐক্য পরিষদ বলছে, তদন্তে কিছু আড়াল করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে দপ্তরের প্রধান, সেই পুলিশের বিবরণই ভরসা করতে পারছে না নিহতের স্বজনরা। আইন ও সালিশী কেন্দ্র বলছে, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মব পিটুনিতে প্রাণ গেছে ৪৭৯ জন ধর্মীয় সংখ্যালঘুর। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর মবে মৃত্যুর একটা মামলারও বিচার শেষ হয়নি, বেশির ভাগে অভিযোগপত্রই নাই। দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে মারা হলো, লাশ পোড়ানো হলো। আর ফেসবুকে ঘৃণার ডাক দেওয়া পোস্টগুলো সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও রয়ে গেল সেখানেই।

মন্ত্রিসভার অবস্থাটা দেখার মতো। পঞ্চাশ সদস্যের মন্ত্রিসভায় হিন্দু মাত্র একজন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সংখ্যালঘু জোট সুরক্ষা আইন, মন্ত্রণালয় আর পাঁচ দিনের ছুটি চেয়েছিল। চার দিন পর এক দিন ছুটি বাড়ল, আইন আর মন্ত্রণালয়ের নামগন্ধ নাই। এবার বিএনপি সরকার পাঁচ কোটি টাকা অনুদান দিল, ছুটি দিল, মণ্ডপে নিরাপত্তা বসাল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আটটা মন্দিরের নেতাদের নিয়ে বসলেন, তাঁরা ধন্যবাদ দিলেন। কিন্তু সুরক্ষা আইনের দাবিতে সরকার কোনো প্রকাশ্য সিদ্ধান্ত জানায়নি। পূজার সময় পুলিশ পাহারা দিলে ভালো লাগে, কিন্তু পূজা শেষ হওয়ার পরের তিনশো ঘাট দিনের কথা কে ভাববে?

মিটফোর্ড হাসপাতালে ১৮৫৮ সাল থেকে থাকা ষাটটা পরিচ্ছন্নতাকর্মী পরিবারকে নোটিশ দেওয়া হলো, কোয়ার্টার ঝুঁকিপূর্ণ, সরে যেতে হবে। পুনর্বাসনের জায়গা আছে কি না জানতে চাইলে হাসপাতাল বলল, নাই। সরকারি হাসপাতাল, সরকার বিএনপির। বর্ণহিন্দু, দলিত, হরিজন, কারও বেলায় আলাদা কিছু ঘটেনি। জমির মালিকানা না থাকা মানুষদের উচ্ছেদ ঠেকানোর একমাত্র পথ হাইকোর্টের আদেশ।

জমির কথাও থাকুক। অর্পিত সম্পত্তি ফেরতের আপিল ট্রাইব্যুনালের ডিক্রি হাতে পেয়েও একুশ জেলার নমুনায় ২,৭৬৮টা ডিক্রির মাত্র ৫৪৮টায় জমি মালিকের হাতে গেছে, উনিশ শতাংশ। বাকি একাশি শতাংশ কাগজে জিতে মাঠে হেরে বসে আছে। আবার সরকারের হিসাবে ২০২৫ সালের ৬৪৫টা ঘটনার মাত্র একাত্তরটা সাম্প্রদায়িক, জমি নিয়ে তেইশটা বিরোধের একটাও না। সরকারি খাতায় সাম্প্রদায়িকতা যত কম দেখা যায়, দায়ও তত কমে।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। রংপুরের একটা স্কুলে হিন্দু মেয়েদের হিজাব পরতে বলার অভিযোগ উঠল, সমাবেশে কোরআন তেলাওয়াত হলো, গীতা পাঠ বাদ গেল। দুই শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত হলেন, তদন্তের চূড়ান্ত ফল আর খবরেই এল না। হেফাজতের আপত্তিতে রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন সেন আর লালনের লেখা পাঠ্যবই থেকে বাদ গেল, আর হেফাজত প্রধান সেটাকে নিজেদের সংগ্রামের ফল বলে ঘোষণা দিলেন। আর ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার বইয়ে রাজনৈতিক ইতিহাসও বদলে ফেলল।

হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্নে সংসদ স্বাধীনতার পর কোনো আইন করেনি। ছেলে থাকলে মেয়ে বাবার সম্পত্তি পায় না, বিধবা পান শুধু সীমিত স্বত্ব। ২০২৫ সালের এপ্রিলে সংস্কার কমিশন সব ধর্মের নারীর সমান অধিকারের সুপারিশ করল, হেফাজত কমিশন বিলুপ্তির দাবিতে মাঠে নামল, আর সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো খবর নাই।

পঁচিশ বছরে হিন্দুকে ভোটব্যাংক বলা হয়েছে, ভারতের লোক বলা হয়েছে, এখন বলা হচ্ছে তারা সংখ্যালঘুই না। কিন্তু সংখ্যালঘু শব্দটা মুছলে কুমিল্লার ১২৪টা মামলার বিচার শুরু হয় না, ডিক্রির জমি ফিরে আসে না, মিটফোর্ডের ষাটটা পরিবারের মাথার ওপর ছাদও জোটে না। জানুয়ারিতে বিল উঠবে, তারপর গণভোট। সেখানে ঠিক হবে মূলনীতিতে কোন শব্দ থাকবে, কিন্তু ঘরে আগুন দেওয়া মানুষগুলোর শাস্তি হবে কি না, সে প্রশ্নের কোনো ভোট হচ্ছে না।

গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বললেন, বাংলাদেশে কারও সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত হওয়ার দরকার নাই। একই মঞ্চে জানালেন, হিন্দুদের ভোটেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। হাততালি পড়ল, ছবি উঠল ব্যাপক। তেইশ দিন পর ২৭ সেপ্টেম্বর সেই একই মন্ত্রী সংবিধান সংশোধন কমিটির আহ্বায়ক হয়ে সংসদ মিডিয়া সেন্টারে ঘোষণা দিলেন, সংবিধানে “মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” ফিরছে। ডিসেম্বরে প্রতিবেদন, জানুয়ারিতে বিল, তারপর গণভোট।

একই মানুষ, এক মাসের মধ্যে দুই কথা। মঞ্চে বললেন হিন্দু সমান নাগরিক, কমিটির টেবিলে বসে ঠিক করলেন রাষ্ট্রের মূলনীতিতে কার ঈশ্বর থাকবে। সংখ্যালঘু শব্দটা তুলে দিলেই যদি সংখ্যালঘুর সমস্যা মিটে যেত, তাহলে এত সহজ কাজ আপনারা করলেন না কেন এখনো?

ইতিহাসটা বিএনপির নিজের হাতেই লেখা অবশ্য। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের ফরমানে আট অনুচ্ছেদ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা সরে গেল, বসল আল্লাহর ওপর আস্থা। বারো অনুচ্ছেদ পুরোটাই বাদ। এখন সেই পুরনো ফরমানের পথেই ফেরার ঘোষণা আসছে, এবার গণভোটের মোড়কে।

অথচ ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রধর্ম পাসের সময় যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, দেশের নব্বই শতাংশ মানুষের মূল্যবোধ, সেই নব্বই তখন সত্যই ছিল না। ১৯৮১ সালের শুমারিতে মুসলমান ছিলেন ৮৬.৬ শতাংশ। আজও অ্যাটর্নি জেনারেল হাইকোর্টে দাঁড়িয়ে বলেন, এই দেশের ৯০ ভাগ মুসলমান, তাই আল্লাহর ওপর আস্থা ফেরা উচিত। সংখ্যার যুক্তি চলছে চল্লিশ বছর ধরে, শুধু বক্তা বদলায়।

বিএনপির পাশে বসা জামায়াতের বক্তব্য আরও মজাদার। জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, তাদের শাসনে অমুসলিমরা নিরাপদ থাকবেন। নিরাপদ থাকবেন, মানে নিরাপত্তা একটা দয়া। কেউ দিলে পাবেন, না দিলে নাই। বরগুনার বামনায় জামায়াতের নির্বাচনী সমাবেশে দলে সদ্য যোগ দেওয়া এক ব্যক্তি প্রকাশ্যে বলেন, কোনো বিধর্মী এই দেশে সংসদ সদস্য হতে পারবে না। দল পরে তাকে “আলাদা” করল। কিন্তু মাইক্রোফোনটা তো দলেরই ছিল, মঞ্চটাও।

২০০১ সালের কথা কি এত তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে পারে কেউ? বিএনপি-জামায়াত জোট জেতার পর হিন্দু বাড়িতে হামলা, লুট, ধর্ষণ হলো দেশের নানা জায়গায়। ভুক্তভোগীরা বলেছেন, নৌকায় ভোট দেওয়ার শাস্তি ছিল এটা। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় স্কুলছাত্রী পূর্ণিমা রানী শীলকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হলো। মামলার রায় এল ২০১১ সালে। বিএনপি এখন হিন্দুর ভোটে ক্ষমতায় আসার গল্প শোনায়। ২০০১ সালে হিন্দুর ভোট যে দলে গিয়েছিল, তার শাস্তি কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, সেই হিসাব ২৫ বছরেও মেটেনি।

২০২৬ সালের আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে আর বারো বছরের ছেলের লাশ পাওয়া গেল। পরিবার পুলিশের বিবরণ মানেনি। ঐক্য পরিষদ বলছে, তদন্তে কিছু আড়াল করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে দপ্তরের প্রধান, সেই পুলিশের বিবরণই ভরসা করতে পারছে না নিহতের স্বজনরা। আইন ও সালিশী কেন্দ্র বলছে, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত মব পিটুনিতে প্রাণ গেছে ৪৭৯ জন ধর্মীয় সংখ্যালঘুর। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর মবে মৃত্যুর একটা মামলারও বিচার শেষ হয়নি, বেশির ভাগে অভিযোগপত্রই নাই। দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে মারা হলো, লাশ পোড়ানো হলো। আর ফেসবুকে ঘৃণার ডাক দেওয়া পোস্টগুলো সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও রয়ে গেল সেখানেই।

মন্ত্রিসভার অবস্থাটা দেখার মতো। পঞ্চাশ সদস্যের মন্ত্রিসভায় হিন্দু মাত্র একজন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সংখ্যালঘু জোট সুরক্ষা আইন, মন্ত্রণালয় আর পাঁচ দিনের ছুটি চেয়েছিল। চার দিন পর এক দিন ছুটি বাড়ল, আইন আর মন্ত্রণালয়ের নামগন্ধ নাই। এবার বিএনপি সরকার পাঁচ কোটি টাকা অনুদান দিল, ছুটি দিল, মণ্ডপে নিরাপত্তা বসাল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আটটা মন্দিরের নেতাদের নিয়ে বসলেন, তাঁরা ধন্যবাদ দিলেন। কিন্তু সুরক্ষা আইনের দাবিতে সরকার কোনো প্রকাশ্য সিদ্ধান্ত জানায়নি। পূজার সময় পুলিশ পাহারা দিলে ভালো লাগে, কিন্তু পূজা শেষ হওয়ার পরের তিনশো ঘাট দিনের কথা কে ভাববে?

মিটফোর্ড হাসপাতালে ১৮৫৮ সাল থেকে থাকা ষাটটা পরিচ্ছন্নতাকর্মী পরিবারকে নোটিশ দেওয়া হলো, কোয়ার্টার ঝুঁকিপূর্ণ, সরে যেতে হবে। পুনর্বাসনের জায়গা আছে কি না জানতে চাইলে হাসপাতাল বলল, নাই। সরকারি হাসপাতাল, সরকার বিএনপির। বর্ণহিন্দু, দলিত, হরিজন, কারও বেলায় আলাদা কিছু ঘটেনি। জমির মালিকানা না থাকা মানুষদের উচ্ছেদ ঠেকানোর একমাত্র পথ হাইকোর্টের আদেশ।

জমির কথাও থাকুক। অর্পিত সম্পত্তি ফেরতের আপিল ট্রাইব্যুনালের ডিক্রি হাতে পেয়েও একুশ জেলার নমুনায় ২,৭৬৮টা ডিক্রির মাত্র ৫৪৮টায় জমি মালিকের হাতে গেছে, উনিশ শতাংশ। বাকি একাশি শতাংশ কাগজে জিতে মাঠে হেরে বসে আছে। আবার সরকারের হিসাবে ২০২৫ সালের ৬৪৫টা ঘটনার মাত্র একাত্তরটা সাম্প্রদায়িক, জমি নিয়ে তেইশটা বিরোধের একটাও না। সরকারি খাতায় সাম্প্রদায়িকতা যত কম দেখা যায়, দায়ও তত কমে।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। রংপুরের একটা স্কুলে হিন্দু মেয়েদের হিজাব পরতে বলার অভিযোগ উঠল, সমাবেশে কোরআন তেলাওয়াত হলো, গীতা পাঠ বাদ গেল। দুই শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত হলেন, তদন্তের চূড়ান্ত ফল আর খবরেই এল না। হেফাজতের আপত্তিতে রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন সেন আর লালনের লেখা পাঠ্যবই থেকে বাদ গেল, আর হেফাজত প্রধান সেটাকে নিজেদের সংগ্রামের ফল বলে ঘোষণা দিলেন। আর ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার বইয়ে রাজনৈতিক ইতিহাসও বদলে ফেলল।

হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্নে সংসদ স্বাধীনতার পর কোনো আইন করেনি। ছেলে থাকলে মেয়ে বাবার সম্পত্তি পায় না, বিধবা পান শুধু সীমিত স্বত্ব। ২০২৫ সালের এপ্রিলে সংস্কার কমিশন সব ধর্মের নারীর সমান অধিকারের সুপারিশ করল, হেফাজত কমিশন বিলুপ্তির দাবিতে মাঠে নামল, আর সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো খবর নাই।

পঁচিশ বছরে হিন্দুকে ভোটব্যাংক বলা হয়েছে, ভারতের লোক বলা হয়েছে, এখন বলা হচ্ছে তারা সংখ্যালঘুই না। কিন্তু সংখ্যালঘু শব্দটা মুছলে কুমিল্লার ১২৪টা মামলার বিচার শুরু হয় না, ডিক্রির জমি ফিরে আসে না, মিটফোর্ডের ষাটটা পরিবারের মাথার ওপর ছাদও জোটে না। জানুয়ারিতে বিল উঠবে, তারপর গণভোট। সেখানে ঠিক হবে মূলনীতিতে কোন শব্দ থাকবে, কিন্তু ঘরে আগুন দেওয়া মানুষগুলোর শাস্তি হবে কি না, সে প্রশ্নের কোনো ভোট হচ্ছে না।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ