রৌদ্র রুদ্র
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ও কালজয়ী দুটি চলচ্চিত্র—তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘লালসালু’ এবং ‘চিত্রা নদীর পারে’ প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক, লজ্জাজনক এবং চরম হটকারী।
অবৈধ সরকারের সরাসরি নির্দেশে এবং তাদের মদদপুষ্ট শক্তির প্রত্যক্ষ চাপে এই সিনেমা দুটির মূল কনটেন্ট বা বিষয়বস্তুকেই টার্গেট করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে মূলত দেশের সংস্কৃতিচর্চার টুটি চেপে ধরার সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টা চলছে, আর এই সরকারের মৌলবাদী আচরণ দেশকে সচেতনভাবে এক অন্ধকার ও কূপমন্ডুকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
দেশের ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির শেকড়কে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার পরিবর্তে জাতীয় পতাকাবাহী একটি সংস্থাকে ব্যবহার করে এমন সংস্কৃতিবিদ্বেষী সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কেন সিনেমা দুটির কনটেন্টকে ভয় পাচ্ছে এই সরকার?
মৌলবাদী মুখোশ উন্মোচনের ভয়: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘লালসালু’ সিনেমায় ধর্মান্ধতা, সমাজ মূলে গেঁড়ে বসা কুসংস্কার এবং ধর্মের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে চরম সত্য তুলে ধরা হয়েছে। মজিদের মতো চরিত্রগুলোর মাধ্যমে ধর্মের নামে চলা শোষণকে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা এই সরকারের মৌলবাদী ও কূপমন্ডুক মানসিকতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ইতিহাস ও চেতনার প্রতি বিদ্বেষ: অন্যদিকে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, তৎকালীন রাজনৈতিক নির্মমতা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের হাহাকারের পটভূমিতে নির্মিত ‘চিত্রা নদীর পারে’ চলচ্চিত্রটি নিছক কোনো সাধারণ বিনোদনের ছবি নয়; এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত, আত্মত্যাগ এবং পূর্ব বাংলার মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রামাণ্য ও শৈল্পিক দলিল। এই ঐতিহাসিক ও প্রগতিশীল কনটেন্ট স্বাধীনতাবিরোধী ও সংকীর্ণ মানসিকতার গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূল নয়, যে কারণে তাদের গায়ে জ্বালা ধরেছে।
মুক্তচিন্তা ও প্রগতির কনটেন্টে সেন্সরশিপ: সিনেমা দুটি আমাদের সমাজসত্য, জীবনবোধ ও মননশীলতার প্রতীক। এই কনটেন্টগুলোর অন্তর্নিহিত প্রতিবাদী ও প্রগতিশীল সুরকে সহ্য করতে না পেরেই বিমান কর্তৃপক্ষকে দিয়ে এগুলো ব্যান করানো হয়েছে।
সাংস্কৃতিক ভিন্নমত দমনের নীল নকশা: সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে সিনেমা দুটির কনটেন্টকে ‘আপত্তিকর’ বা ব্রাত্য হিসেবে চিহ্নিত করার এই অপচেষ্টা প্রমাণ করে যে, এই সরকার স্বাধীন ও সাহসী শিল্পসৃষ্টির টুটি চেপে ধরতে চায়।
সিনেমা দুটির সাহসী ও সত্যনিষ্ঠ কনটেন্টই তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল—যে কারণে কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার মুখোশ উন্মোচনকারী এই শিল্পকর্মগুলোকে আকাশপথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার হীন চক্রান্ত করা হয়েছে।
মৌলবাদী চক্র সুপরিকল্পিতভাবে এভাবেই দেশের সকল প্রগতিশীলতার পথ রুদ্ধ করার চক্রান্ত বাস্তবায়ন করে চলেছে। অন্ধ রাজনীতির বেড়াজালে আটকে তারা প্রতিনিয়ত দেশকে ঠেলে দিচ্ছে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার এক গভীর অন্ধকারের দিকে। তবে তাদের এই হীন উদ্দেশ্য সফল হতে দেওয়া যাবে না। বাংলার আপামর প্রগতিশীল ও মুক্তমনা মানুষ এক হয়ে এই সকল অপচেষ্টা তীব্র প্রতিরোধে রুখে দেবে।
সেন্সরশিপের এই হীন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ চলচ্চিত্র দুটিকে অবিলম্বে পুনরায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় দেশের সংস্কৃতিপ্রেমী জনগণ এই জঘন্য মৌলবাদী আক্রমণ ও সাংস্কৃতিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আরও জোরালো এবং কঠোর সংগ্রাম গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।
আমাদের শিল্প, আমাদের সাহিত্য এবং আমাদের সিনেমা—আমাদের জাতীয় পরিচয়ের মূল শক্তি। কূপমন্ডুকতা ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতার কোনো অন্ধকার ছায়া দিয়ে সত্যের কনটেন্টকে কখনো দাবিয়ে রাখা যাবে না।
লেখা: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

