দেশজুড়ে একের পর এক বোমা উদ্ধার, আর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দূর নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরক রাখার ঘটনায় আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। পুলিশ বলছে, কারাগার থেকে বের হওয়া জঙ্গি বোমারু মামুন ও তার শিষ্যরা এখন রিমোট নিয়ন্ত্রিত বোমা বানাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে কারা? কেন ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তাদের শরিক জামাতে ইসলাম এই ইস্যুতে মুখে কুলুপ এঁটেছে? নাকি এটাই তাদের পুরনো কৌশল?
সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কুমিল্লা, সায়েদাবাদ, মতিঝিল, ফরিদপুর, বরিশাল। বিগত কয়েক মাসের ঘটনাপঞ্জি দেখলে চোখ কপালে উঠবে। প্রেশার কুকার বোমা, পাইপ বোমা, রিমোট ডিভাইস, ডেটোনেটর, বারুদ মেশানো কটন বাড, জিহাদি বই। পুলিশ যা যা উদ্ধার করছে তাতে স্পষ্ট, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সংগঠিত চক্রের কাজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই চক্রকে প্রশ্রয় দিচ্ছে কে? কারা চাইছে দেশে ফের অস্থিরতা তৈরি হোক?
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল। বিএনপি জামাত জোট সরকারের সেই মেয়াদে সারাদেশে বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলা, সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের ভয়াবহতা বাংলাদেশের মানুষ আজও ভোলেনি। রমনার বটমূলে বোমা হামলা, উদয়ন স্কুলে বোমা হামলা, ঝালকাঠিতে বিচারক হত্যা, ষাট গম্বুজ মসজিদে হামলা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ, আর সর্বোপরি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা। তখনকার পরিবেশটাই ছিল এমন, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বোমা ফাটছে, মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনী তখন অসহায়, প্রশাসন অকার্যকর, আর উগ্রবাদীরা ছিল মদদপুষ্ট।
সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলো কি আবার ফিরে আসছে? নতুন করে এবার ২০২৬ সালে?
সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এক কথা বলছেন, পুলিশ আরেক কথা বলছে। জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে বিভ্রান্তি, অথচ মাঠপর্যায়ে বোমা উদ্ধার চলছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার রাতে সাভারে এক জঙ্গির আস্তানা ঘিরে রাতভর অভিযান চলে। উদ্ধার হয় পাইপ বোমা, রাসায়নিক, রিমোট ও কন্ট্রোলার। পরদিন ভোরে একই এলাকার মাঠ থেকে উদ্ধার হয় আরেকটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত প্রেশার কুকার বোমা। অথচ এই ঘটনাগুলো নিয়ে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে কোনো উচ্চকিত প্রতিক্রিয়া নেই। নেই কোনো কঠোর বার্তা। যে দলগুলো একসময় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কথা বলত, আজ তারা যেন সবকিছু এড়িয়ে যেতে চাইছে।
পুলিশ সূত্র বলছে, ২০১৭ সালে হোটেল ওলিওতে বোমা হামলার মূল কারিগর বোমারু মামুন কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও সংগঠিত হয়েছে। তার শিষ্য আরিফকে গ্রেপ্তারের পর যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে স্পষ্ট, চক্রটি অনেক দূর এগিয়েছে। তারা এখন শুধু বোমা বানাচ্ছে না, রিমোট কন্ট্রোল সিস্টেমও যুক্ত করছে। সহজ করে বললে, এখন আর বোমার কাছে কাউকে যেতে হচ্ছে না। দূর থেকে বোতাম টিপলেই বিস্ফোরণ। এই কৌশল এই দেশে আগে কখনো এভাবে ব্যবহার হতে দেখা যায়নি। অথচ এই ভয়াবহ সত্যিটা নিয়ে জাতীয়ভাবে কোনো আলোচনাই নেই।
এবার আসা যাক প্রশ্নটায়। এই চক্রের সঙ্গে কার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে? পুলিশ এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম বলেনি। তবে নীরবতাই কি ইঙ্গিত দেয় না? যে সময়টাতে দেশে জঙ্গি তৎপরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল, সেই সময়ে ক্ষমতায় কারা ছিল, তার ইতিহাস তো সবার জানা। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার পর দেশজুড়ে তোলপাড় হয়েছিল। সেই ঘটনায় জেএমবি নিষিদ্ধ হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তলে যায়। অথচ সেই সময়কার সরকারপ্রধানের পুত্রই এখন স্বঘোষিত প্রধানমন্ত্রী, আর তার দলই এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। তাদের শরিক জামাতে ইসলামের শীর্ষ নেতৃত্ব তখনকার দিনে জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের উত্থানের সময়ে প্রকাশ্যেই কিছু কর্মকাণ্ডে সমর্থন দিয়েছিল, যার প্রমাণ পরবর্তীতে আদালতের রায়েও উঠে এসেছে।
আজ সেই রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই জঙ্গি উত্থানের বিরুদ্ধে। নেই কোনো নিন্দা। নেই কোনো আহ্বান। অথচ প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বোমা উদ্ধার হচ্ছে। মসজিদের সামনে, মন্দিরের পথে, আদালত চত্বরে, বাসস্ট্যান্ডে। জায়গাগুলো দেখলেই বোঝা যায় উদ্দেশ্য কী। সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করা, ধর্মীয় উসকানি দেওয়া, আর প্রশাসনকে ব্যর্থ প্রমাণ করা। এই কৌশল কি পরিচিত মনে হয় না? ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বাংলাদেশে ঠিক এই পদ্ধতিই তো ব্যবহার করা হয়েছিল।
তখনো প্রতিদিন সংবাদপত্রে থাকত কোথাও বোমা পাওয়া গেছে, কেউ নিহত হয়েছে, কেউ আহত হয়েছে। মানুষ আতঙ্কে বাস করত। বিদেশি বিনিয়োগ কমে গিয়েছিল। দেশের অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছিল। ঠিক এখনকার মতোই। পার্থক্য শুধু এটাই, তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি জামাত জোট, আর এখনও সেই একই চক্র ক্ষমতায়। চেহারা বদলেছে, কিন্তু চরিত্র বদলায়নি।
পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, বোমারু মামুনের তৈরি বোমাগুলোর গঠন ও কৌশল দেখে মনে হচ্ছে এগুলো তারই সিগনেচার কাজ। অর্থাৎ চক্রটি তার নেতৃত্বেই সংগঠিত। কিন্তু মামুন তো একা কিছু করতে পারে না। তার পেছনে অর্থ, আশ্রয়, নিরাপত্তা দিতে হয়। কারা দিচ্ছে সেটা খুঁজে বের করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ যে প্রশাসন এই চক্রকে ধরার কথা বলছে, সেই প্রশাসনই আবার বলছে দেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই। এই অসংলগ্নতা পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করছে।
সবশেষ বরিশাল আদালত চত্বরে যে বিস্ফোরণ হলো, তার ধরন নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। পুলিশ বলছে সেটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত নয়, আবার ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে হঠাৎ ধোঁয়া ও ধুলো উড়ছে। আদালতের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় বোমা পৌঁছানোটা নেহাত ছোটখাটো ঘটনা নয়। কিন্তু এ নিয়ে তেমন কোনো মাতামাতি নেই। জনমনে প্রশ্ন জাগছে, প্রকৃত অপরাধীরা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, যে ধরনের বোমা উদ্ধার হচ্ছে, সেগুলো তৈরি করতে দরকার নির্দিষ্ট রাসায়নিক, প্রশিক্ষণ আর আর্থিক সহায়তা। একজন সাধারণ অপরাধী এসব করতে পারে না। এতে সংগঠিত নেটওয়ার্কের হাত থাকার সম্ভাবনাই বেশি। আর এই নেটওয়ার্কের শিকড় যত গভীরে, ততই বিপদ। আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও যোগ থাকতে পারে। তবে সে আলোচনাও যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যারা এই মুহূর্তে দেশ চালাচ্ছে, তারা কি আসলেই জঙ্গি দমনে আন্তরিক? নাকি নীরবে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে দিচ্ছে, যাতে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে সরানো যায়? যেভাবে একের পর এক ঘটনা ঘটছে, আর দায়িত্বশীলদের প্রতিক্রিয়া নেই, তাতে সন্দেহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কোনো ঘটনার পর শক্ত কোনো হুঁশিয়ারি নেই, নেই জাতির উদ্দেশ্যে কোনো ভাষণ। অথচ একটি রাষ্ট্রে এ ধরনের পরিস্থিতি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
দেশের মানুষের মনে এখন শঙ্কা। বাসে, ট্রেনে, অফিসে, স্কুলে, মন্দিরে, মসজিদে, কোথাও নিরাপদ নয়। অভিভাবকরা সন্তানদের বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ করতে দ্বিধায় আছেন। বিদেশি কূটনীতিকরা নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অথচ দেশের নেতৃত্বে যারা আছেন, তারা যেন সব দেখেও দেখছেন না। চোখ বন্ধ করে আছেন। কানে তুলে দিয়েছেন ইয়ারপ্লাগ।
এই অবস্থা যদি দ্রুত বদলানো না হয়, তাহলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। ২০০৫ সালের পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে দেশে এক ধরনের অরাজকতা তৈরি হয়েছিল। আজ যদি সেই পথে আবার হাঁটা হয়, তাহলে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না কারোরই।
যে দলগুলো অতীতে জঙ্গি তৎপরতার সময় ক্ষমতায় থেকে সুবিধা নিয়েছে, তাদের কাছে এবারের পরিস্থিতি যেন আরেকটি সুযোগ মনে হচ্ছে। কিন্তু জনগণ এবার আর বোকা নয়। মানুষ দেখছে, বোঝার চেষ্টা করছে, কারা দেশকে আবার সেই অন্ধকারে ঠেলে দিতে চাইছে।
বোমা উদ্ধারের খবরে আসলে অবাক হওয়া উচিত নয়। বরং অবাক হওয়া উচিত, কেনো এত ঘটনার পরও দায়ীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে না? কেনো এই চক্রের বিরুদ্ধে জাতীয়ভাবে তীব্র কোনো পদক্ষেপ নেই? কেনো মিডিয়াতেও এ নিয়ে আলোচনা সীমিত? কারা চাইছে এই ইস্যু চাপা পড়ে যাক? কাদের স্বার্থ এতে?

