ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাহেব বলেছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে নাকি দেশে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। কথা শুনে মনে হলো, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন এমন একজন, যিনি গ্রিড ম্যানেজমেন্টের প্রাথমিক অঙ্কটুকুও বোঝেন না, অথবা বোঝেন কিন্তু জেনে-শুনে দেশবাসীকে বোকা বানাতে চান। দুটোই তো ব্যাপক শরমের বিষয়।
একটা সহজ হিসাব করি। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গড় চার্জিং ক্যাপাসিটি দেড় থেকে দুই কিলোওয়াট। দেশে এসব অটোরিকশার সংখ্যা আনুমানিক চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ। সবগুলো একসঙ্গে চার্জে বসলে চাহিদা দাঁড়ায় আট থেকে দশ হাজার মেগাওয়াটের মতো, এটা ঠিক। কিন্তু সমস্যা হলো, এই সংখ্যাটা রাতের অফ-পিক আওয়ারে ছড়িয়ে থাকে, আর গ্রিডের মোট সক্ষমতা ধরা হয়েছে অন্তত পনেরো থেকে ষোলো হাজার মেগাওয়াট। তাহলে অটোরিকশা কি আসলেই সমস্যা, নাকি সমস্যা হলো মন্ত্রণালয়ের চাহিদা পূর্বাভাস আর জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা নেই? জানতেন না আপনারা? প্রস্তুতি কোথায়? আর না জানলে ওই চেয়ারে বসে আছেন কেন?
তার চেয়ে বড় কথা, অটোরিকশার চার্জিং লোডকে যদি সরকার নিয়ন্ত্রিত সোলার মাইক্রো-গ্রিড, টাইম-বেজড মিটারিং বা ডেডিকেটেড ইভি চার্জিং ফিডারের আওতায় আনা হতো, তাহলে এটা জাতীয় গ্রিডের বোঝা তো হতো-ই না, বরং সাশ্রয়ের উৎস হতে পারত। কিন্তু সেটা তো করতে গেলে কাজ করতে হয়, পলিসি ভাবতে হয়, মাথা খাটাতে হয়। এ সরকারের সেই অভ্যেসটাই নেই। কাজের বদলে অজুহাত, পরিকল্পনার বদলে অপপ্রচার।
আরেকটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। এই অটোরিকশাগুলোর বেশিরভাগই চলে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারিতে। সেগুলো চার্জ নেয় রাতের লো-ডিমান্ড সময়ে। দিনের পিক আওয়ারে তো এই অটোগুলো রাস্তায় চলেই, চার্জও করে না। তাহলে দিনের লোডশেডিংয়ের দায় অটোরিকশার ঘাড়ে চাপাচ্ছেন কীভাবে? যারা দিনের বেলা শিল্পকারখানা আর সেচের পাম্পে বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, তাদের উদ্দেশে বলছেন, রাতে অটো চার্জ দেওয়ায় তোমাদের দিনের কারখানা বন্ধ। এটা অদ্ভুত এক ফালতু যুক্তি, যেটা শুধু অজ্ঞতা দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়, নয়তো ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি।
বাস্তব চিত্র হলো, স্থানীয় গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, কয়লার দাম বাড়ায় উৎপাদন কম, ডলার সংকটে জ্বালানি আমদানি ব্যাহত, আর বড় বড় গোপন চুক্তিতে দুর্নীতি। এসব কারণেই উৎপাদন ঘাটতি। কিন্তু এই সরকার কখনো নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে না। ২০০১ থেকে ২০০৬, বিএনপির সেই চেনা চেহারা, দুর্নীতি আর অপশাসনের পেটেন্ট করা কায়দা। তখনো গ্যাসের দাবিতে আন্দোলনে সাধারণ মানুষ মারা গেছে, বিদ্যুতের অভাবে শিল্প ধুঁকেছে, আর মন্ত্রীরা মিডিয়ায় এসে উদ্ভট অজুহাত দিয়েছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দেখি, প্রজেক্টর বদলেছে, পর্দার ছবি একই। জনগণের দুর্ভোগ নিয়ে ঠাট্টা করার সাহস শুধু বিএনপিই দেখাতে পারে।
তাই মন্ত্রী সাহেবকে বলব, অটোরিকশা চালকদের দোষ দিয়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি ঢাকতে পারবেন না। যারা সারাদিন খেটে রাতে একবার ব্যাটারি চার্জ দেন, তারা দেশের গ্রিড ধ্বংস করছেন না, করছেন জীবিকা চালানোর চেষ্টা। আসল গ্রিড ধ্বংস করছে মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা, নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা আর দায় এড়ানোর পুরোনো অভ্যাস। অটোরিকশা বন্ধ করে দিলেও আপনার বিদ্যুতের সংকট যাবে না, যাবে তখনই যদি আপনারা ক্ষমতা ছেড়ে দেশটাকে রেহাই দেন।

