রাজপথে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া নেতার ক্ষমতার মসনদে বসে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর ধরার নজির নতুন নয়, তবে এনবিআর সংস্কারের নামে ৪০০ কোটি টাকার ‘পরামর্শক ফি’ অপচয়ের ঘটনাটি সেই পুরোনো ইতিহাসকেই নতুন করে উন্মোচিত করেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অটোমেশন ও সংস্কারের জন্য নির্ধারিত ১ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থ কেবল অদৃশ্য পরামর্শকদের পকেটে ভরার আয়োজনে যখন তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তখন সেই নগ্ন লুটপাটকে আড়াল করতে সাফাই গাইছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তাপুষ্ট ৩ হাজার ৪৩ কোটি টাকার ‘সিটা’ (SITA) প্রকল্পের এই বরাদ্দ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মূল প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে পাশ কাটিয়ে ৪০০ কোটি টাকাই লিখে দেওয়া হয়েছে পরামর্শক ফির নামে। অর্থ-বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি ‘ঘোড়ার চেয়ে লাগামের দাম বেশি’ হওয়ার শামিল। যেখানে সাধারণ সরকারি প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় ১ থেকে ৩ শতাংশের বেশি হওয়া অস্বাভাবিক, সেখানে ৪০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ রাখার পেছনে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের আইনি পথ তৈরির চক্রান্ত স্পষ্ট।
একসময় রাজপথ ও বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠানে সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতার বুলি আওড়ানো জুনায়েদ সাকি ক্ষমতার মসনদে বসার পর যেভাবে এই প্রকল্পকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন, তা স্পষ্টতই দুর্নীতির সাথে তাঁর চরম আপসকামিতাকেই নির্দেশ করে। প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাজেটের অস্বাভাবিক অপচয় নিয়ে কোনো প্রশ্ন না তুলে এই তথাকথিত অটোমেশনকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে তিনি মূলত সিন্ডিকেটের স্বার্থ সুরক্ষাতেই ব্যস্ত ভূমিকা পালন করছেন। পরিকল্পনা বিভাগের মতো দায়িত্বশীল সংস্থা যেখানে এই অস্বাভাবিক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার কথা ছিল, সেখানে পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আখতারের তড়িঘড়ি ব্যাখ্যা এবং নীরবতা প্রমাণ করে যে এই চক্রান্তের শিকড় কত দূর বিস্তৃত।
জনগণের করের টাকা দিয়ে ভুয়া পরামর্শকের পকেট ভারী করা এবং সেই লুটপাটকে রাষ্ট্রীয় আয়ের স্তম্ভ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার এই নির্লজ্জ চেষ্টা নাগরিক সমাজ ও অর্থ বিশেষজ্ঞদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। জুনায়েদ সাকির এমন দ্বিমুখী অবস্থানের স্পষ্ট জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, এই ৪০০ কোটি টাকার রহস্যময় ব্যয়ের পেছনের সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করতে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং অবিলম্বে এই ভুয়া বাজেট বাতিল করে প্রকৃত অটোমেশনে তা ব্যবহারের দাবি আজ সর্বস্তরে উঠেছে। জনগণের পকেট কেটে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এমন হরিলুট বন্ধ না হলে এই প্রশাসনের ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা’র রাজনৈতিক বুলি যে কেবল শূন্যগর্ভ বাকচাতুরি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

