দারিদ্র্য দূরীকরণের নামে বরাদ্দ করা কোটি কোটি টাকা একজন নিঃস্ব, বাস্তুহারা কিংবা ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে পৌঁছায় না; বরং সেই টাকার সিংহভাগ উধাও হয়ে যায় একশ্রেণীর সুবিধাবাদী আমলা ও তথাকথিত ‘পরামর্শকদের’ পকেটে! সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘প্রজেক্ট ইন্টিগ্রেট’ (Project INTEGRATE) নামের একটি প্রকল্পে চরম অনিয়ম ও নজিরবিহীন লুটেরার উৎসবের চিত্র উঠে এসেছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে—পরিকল্পনা কমিশনকে তোয়াক্কা না করে এমন অনৈতিক বাজেট অনুমোদনের দুঃসাহস আসে কোথা থেকে? অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের গভীর নেটওয়ার্কের তথ্য। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বর্তমানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চলছে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের একক ক্ষমতার রাজত্ব। প্রশাসনিক নিয়মকানুনকে তোয়াক্কা না করে পুরো সমাজসেবা অধিদপ্তরকে হরিলুটের অভয়ারণ্যে পরিণত করায় প্রশাসনিক অলিন্দে তিনি আজ ‘হরিলুটের রানী’ খেতাবে পরিচিতি পেয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, এই প্রজেক্টের লুটের টাকার অন্তত ৩০ শতাংশ সরাসরি চলে যাচ্ছে তারেক রহমানের গুলশান ভিত্তিক গোপন সিন্ডিকেটের পকেটে। হাওয়া ভবনের পুরোনো ঐতিহ্য বজায় রাখতে সেখানে নাকি গঠিত হয়েছে নতুন ‘গিয়াস উদ্দিন আল মামুন’ মার্কা এজেন্ট চক্র, যাদের মূল কাজ প্রজেক্ট থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন কাট করা এবং তা বিদেশে পাচার করা।
আন্তর্জাতিক সংস্থা GIZ-এর অর্থায়নে গৃহীত এই প্রকল্পের মোট বাজেট ৬১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। কাগজপত্রে প্রকল্পটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সর্বস্ব হারানো ও বাস্তুহারা মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের কথা বললেও খরচের খতিয়ান দেখলে যে কারও মাথা ঘুরে যাবে। মোট বাজেটের মধ্যে চরম দরিদ্র ও অসহায় মানুষের ভাগ্যে আসল সহায়তা হিসেবে জুটেছে মাত্র ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা—যা পুরো বরাদ্দের মাত্র ১৩ শতাংশ! আর এই সামান্য পরিমাণ অর্থ বণ্টনের নাম করে তথাকথিত বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখানো হয়েছে বাকি ৫৩ কোটি টাকা।
হিসাব করলে দেখা যায়, গরিব মানুষকে ১০০ টাকা সহায়তা দেওয়ার নাম করে আমলা ও পরামর্শকদের পেছনেই উড়ানো হচ্ছে ৮৭ টাকা। এটি কোনো প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং সরকারি কোষাগার ও বৈশ্বিক সহায়তার অর্থের সরাসরি নগ্ন হরিলুট।
অর্থ অপচয়ের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে, মাত্র ৮ কোটি টাকা বিতরণের ‘উপদেশ’ দেওয়ার অজুহাতে বসানো হচ্ছে ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক! কেবল এদের ফি ও বেতন-ভাতাতেই চলে যাচ্ছে ২৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেক। সরকারি স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে কর্মকর্তাদের তথাকথিত প্রশিক্ষণ ও বিদেশ ভ্রমণের নামে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
যখন দেশের বাস্তুহারা মানুষ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে, তখন কর্মকর্তাদের বিলাসবহুল অফিস ভাড়ার নামে ৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা এবং অহেতুক ফাইল চালাচালি ও মিটিংয়ের ‘ব্যবস্থাপনা চার্জ’ হিসেবে আরও ১০ কোটি টাকা উড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এমনকি দেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সংস্থা ‘পরিকল্পনা কমিশন’ নিজেও এই অযৌক্তিক ও নজিরবিহীন বাজেট প্রস্তাব নিয়ে চরম বিস্ময় প্রকাশ করেছে এবং প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হয়েছে। এই নজিরবিহীন অনিয়ম ও সিন্ডিকেটরাজ নিয়ে কড়া ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশাসন ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
একজন প্রশাসন ও উন্নয়ন অর্থনীতি বিশ্লেষক স্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করেছেন— যে প্রকল্পের ৮৭% অর্থই আমলা ও কনসালটেন্টদের পেটে যায়, তাকে উন্নয়ন প্রকল্প বলা চলে না—এটি সহায়তার মোড়কে রাষ্ট্রীয় কোষাগার ডাকাতি। এই ধরনের সিন্ডিকেটভিত্তিক অপচয় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে।”
একই সুর মিলিয়ে একজন সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী গবেষক তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বা কমিশন বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যেসব প্রকল্প পাস করানো হয়, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”
এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভিটেমাটি হারানো দুস্থ মানুষের ভাগ্য বদলাবে না; পরিবর্তন আসবে কেবল একদল সুযোগসন্ধানী আমলা, ক্ষমতার অলিন্দে থাকা রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও পরামর্শকের ব্যাংক ব্যালেন্সে।

