২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিদেশি অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সংস্থার প্রকাশিত তথ্য, কংগ্রেসে সাক্ষ্য এবং অনুদান ডাটাবেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক দশকে বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন, যুব উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএসবি নিউজ ইউএসএর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ৩২৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করেছে।
আমেরিকার সরকারি ওয়েবসাইট ForeignAssistance.gov-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে রেকর্ড ৫২৭.৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদান করেছে, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছে শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে। জিহান জেনিফার হাসান নামক এক গবেষকের সংকলিত নথি অনুসারে, গত এক দশকে বাংলাদেশে ‘গভর্ন্যান্স ইন্টারভেনশন’ বা শাসনব্যবস্থায় হস্তক্ষেপমূলক কার্যক্রমে অন্তত ৩২.৫ কোটি ডলার (প্রায় ৩,৮০০ কোটি টাকা) ব্যয় করা হয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, এই তহবিলের বড় একটি অংশ ব্যবহার করেছে ‘ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল’ এবং ‘কনসোর্টিয়াম ফর ইলেকশনস অ্যান্ড পলিটিক্যাল প্রসেস স্ট্রেংথেনিং’ CEPPS)-এর মতো সংস্থাগুলো।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল: ‘স্ট্রেনদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ’ (SPL) প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ডলার বরাদ্দ পায়। এই অর্থের মাধ্যমে স্থানীয় এনজিও, সংবাদপত্র এবং বিভিন্ন সামাজিক সংস্থাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হয়।
CEPPS: ‘আমার ভোট আমার’ কার্যক্রমের আওতায় ২.১ কোটি ডলার ব্যয় করে, যার মাধ্যমে আইআরআই (IRI) এবং এনডিআই (NDI)-এর মতো সংস্থাগুলো বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব বিস্তার করেছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো মার্কিন নৌবাহিনীর সংশ্লিষ্টতা। সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি ‘নাভসাপ’ (NAVSUP) আমেরিকার নৌবাহিনীকে সরঞ্জমা সরবরাহ করে। প্রায় এক দশকের ব্যবধানে, NAVSUP বাংলাদেশে এমন কিছু প্রোগ্রামের জন্য চুক্তি বা কন্ট্রাক্ট প্রদান করেছে যেগুলোর শিরোনাম ছিল— “মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাম্য প্রচার,” “ছাত্র নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মশালা,” “বাংলাদেশ সহিংসতা বিরোধী কর্মসূচি,” “বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র উগ্রবাদ বিরোধী কর্মসূচি” এবং “বাংলাদেশের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্স”।
এই অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস (BCCP), বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার, আনন্দধারা কনসালট্যান্ট, এক্সপ্রেশনস লিমিটেড এবং মেসার্স বিটনিক—সব মিলিয়ে প্রায় ২৭ লাখ ৭৯ হাজার ৯০৩ ডলার পেয়েছে। স্বতন্ত্রভাবে অংকগুলো খুব বড় না হলেও, এই চুক্তিগুলো একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ধরন তৈরি করে: মার্কিন সামরিক বাহিনী বাংলাদেশে যুব সংহতি, উগ্রবাদ বিরোধী বার্তা প্রদান, ছাত্র কর্মশালা এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্সে অর্থায়ন করছিল। এই সবকিছুই বেসামরিক সহায়তা চ্যানেলের পরিবর্তে সিঙ্গাপুরভিত্তিক সরবরাহ প্রতিষ্ঠান NAVSUP-এর মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
মেসার্স বিটনিকের “সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্স ফর বাংলাদেশ” (মে ২০২১ থেকে জুলাই ২০২২ পর্যন্ত ৯৯,৪০০ ডলার) চুক্তিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি কোনো খাদ্য সহায়তা নয়। এটি কোনো সেতু নির্মাণ প্রকল্পও নয়। এটি মূলত গোয়েন্দা কার্যক্রমের কাছাকাছি পর্যায়ের সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষণ, যা মার্কিন নৌবাহিনী এমন একটি দেশে পরিচালনা করেছে যেখানে পরবর্তীতে একটি নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটে।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা মাইক বেঞ্জ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেছেন যে, কৌশলগত কারণে (যেমন: বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বিস্তার বা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন) যখন কোনো দেশের সরকার বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেখানে ‘কালার রেভল্যুশন’ বা সরকার পরিবর্তনের ছক আঁকা হয়। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে প্রতিবাদী গান (যেমন: র্যাপ মিউজিক) তৈরি এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় যুবসমাজকে সংগঠিত করতে মার্কিন করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে।
নথিতে দেখা যায়, যুবসম্পৃক্ত বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অর্থায়ন করা হয়েছে। বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের ইয়ুথ রাইজ কর্মসূচির জন্য প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে। ‘আমেরিকান ভয়েসেস’ নামক একটি সংস্থাকে ৬৬ হাজার ৬০০ ডলার দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশি যুবকদের হিপ-হপ সংগীতে প্রশিক্ষণ দিতে। এছাড়া টেক-ক্যাম্প ও সোশ্যাল মিডিয়া লিটারেসির নামে বিভিন্ন যুব নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে মাঠ পর্যায়ের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি গ্লোবাল ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার ডিসইনফরমেশন মোকাবিলা” বিষয়ক কার্যক্রমের জন্য অনুদান পেয়েছে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, যুক্তরাজ্যও তাদের ‘স্ট্রেনদেনিং পলিটিক্যাল পার্টিসিপেশন’ (SPP2) প্রোগ্রামের মাধ্যমে ১.৬ কোটি পাউন্ড ব্যয় করেছে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘দেয়াল ভেঙে দেওয়া’ এবং সিভিল সোসাইটিকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখে পরিচালিত করা।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন এনজিও ন্যাশনাল এন্ডোমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির প্রেসিডেন্ট ড্যামন উইলসন মার্কিন কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে তাদের সহায়তা “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া জোরদার এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে উত্তরণে সহায়ক”।
অন্যদিকে, সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা মাইক বেঞ্জ এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কৌশলগত স্বার্থের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে নাগরিক সমাজভিত্তিক কর্মসূচি ব্যবহৃত হতে পারে।
ForeignAssistance.gov-এর গ্রাফ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্কিন সহায়তার এই জোয়ার শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের দিকে, যা ২০২৪ সালে এসে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা একে একটি ‘প্রজেক্ট লাইফসাইকেল’ বা প্রকল্পের জীবনচক্র হিসেবে দেখছেন—অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর অর্থায়ন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য, প্রভাব এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভূমিকা নিয়ে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রয়োজন।
মানবিক সহায়তা বা উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে এই বিশাল রাজনৈতিক বিনিয়োগ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। নথিপত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ হয়তো কেবল দেশের ভেতরে নির্ধারিত হয়নি, বরং এর একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে বিদেশি অর্থায়ন ও কৌশলী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।

