সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) জ্বালানি তেল বরাদ্দ ও ব্যবহারের নামে চলছে চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও হরিলুটের মহোৎসব। বিএনপি সরকারের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকের অধীনে এসে ডিএসসিসি আজ এক চরম অব্যবস্থা ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যেখানে জনগণের করের কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন নির্দ্বিধায় বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি স্পষ্ট নির্দেশনায় যেখানে কোনো কর্মকর্তার জন্য মাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ সীমা ২০০ থেকে ২৫০ লিটার নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের গাড়িতে মাসে অকাতরে ঢালা হচ্ছে ৬০০ লিটার পর্যন্ত তেল! বাসা থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরত্বে অফিস হলেও এক এক জন কর্মকর্তার তেলের পেছনেই মাসে খরচ দেখানো হচ্ছে ৮১ হাজার টাকার বেশি। এত পরিমাণ জ্বালানি পুড়তে হলে একটি গাড়িকে দৈনিক অন্তত ১০০ কিলোমিটার চালাতে হয়। বাস্তবে গাড়ি না চললেও কাগজপত্রে ভুয়া ভাউচার বানিয়ে বাড়তি তেল বিক্রি করে চলছে পকেট ভারী করার উৎসব। ক্ষমতার দাপট আর অদক্ষতার চাদরে ঢাকা এই বিএনপি সরকারের প্রশাসন সবকিছু জেনেও চোখ বুজে অলস বসে আছে।
সিটি কর্পোরেশনে এখন কোনো জনপ্রতিনিধি বা মেয়র নেই; পুরো দপ্তর পরিচালিত হচ্ছে বিএনপি সরকারের মনোনীত প্রশাসনের হাত ধরে। স্বয়ং প্রশাসক নীতিমালার অভাবের দোহাই দিয়ে নিজের ব্যর্থতা ঢাকার অপচেষ্টা করছেন। অথচ এতদিনেও কেন নিজস্ব নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি, কিংবা সরকারি নির্দেশ অনুসরণ করা হলো না—তার কোনো সদুত্তর তার কাছে নেই। এমনকি পরিবহন শাখার সচিব তেলের বরাদ্দের ভিত্তি জানতে ফাইল চেয়েও তা পাননি, কারণ কোনো সঠিক নথি বা হিসাবের অস্তিত্বই সেখানে নেই। আরো লজ্জাজনক বিষয় হলো, যে স্থানীয় সরকার বিভাগের কাজ এই অনিয়ম তদারকি করা, তাদেরই এক উপসচিবের গাড়িতে সিটি কর্পোরেশনের তহবিল থেকে ৬০০ লিটার অকটেন ও ৮৭ হাজার টাকা তোলার চিত্র উঠে এসেছে। অর্থাৎ, রক্ষকই এখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
সবচেয়ে পৈশাচিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন চিত্র দেখা গেছে জরুরি সেবা খাত অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের ক্ষেত্রে। মুমূর্ষু রোগী বহনের জন্য নির্দিষ্ট তিনটি অ্যাম্বুলেন্সে মাত্র এক মাসে খরচ দেখানো হয়েছে ১ হাজার ২৮ লিটার ডিজেল, যা বছরে প্রায় ১৪ লাখ টাকার বোঝা চাপায় দেশের জনগণের ওপর। নথিতে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবহার দেখানো হয়েছে “দাপ্তরিক কাজ”, অথচ বাস্তবে এই সরকারি জরুরি যানবাহনগুলোকে আমলা ও কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের বাসা থেকে অফিসে যাতায়াতের ব্যক্তিগত বাহন বানিয়ে ফেলেছেন। প্রধান নির্বাহীর দুটি গাড়ির পেছনেই কেবল তেলের বাবদ মাসে অপচয় হচ্ছে সোয়া লাখ টাকার বেশি। এর আগে অনিয়মের অনুসন্ধানের পর শুধুই তদন্ত কমিটির নাটক সাজানো হয়েছিল, অথচ বাস্তবে লুটপাটের এই পুরনো সংস্কৃতিকেই বহাল রাখা হয়েছে।
প্রশাসনের এমন মেরুদণ্ডহীন ও নির্লজ্জ অজুহাত আর কখনো দেখা যায়নি, যেখানে চালকরা ক্ষুব্ধ হতে পারে—এই কাল্পনিক ভয়ে অনিয়ম ও চুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে সাফাই গাওয়া হচ্ছে! কয়েকজন দুর্নীতিবাজ চালক ও কর্মচারীর ভয়ে বছরে আড়াই কোটি টাকার জাতীয় অর্থ গচ্চা দেওয়া এই বিএনপি পরিচালিত প্রশাসনের অদক্ষতা, নৈতিক দেউলিয়াত্ব ও চরম শাসনের চিত্রকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে। ডিএসসিসিকে একটি আধুনিক ও জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠানের বদলে লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করার পূর্ণ দায় বিএনপি সরকার ও তাদের ব্যর্থ প্রশাসনিক কাঠামোর ওপরই বর্তায়।

