জাতীয় সংসদের ভেতরে এ কারা বসে আছে?

যে সংসদ দেশের জন্য আইন প্রণয়ন করে, সেই সংসদে আইনপ্রণেতা হয়ে এ কারা বসে আছেন! উত্তর খুঁজতে গেলে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় হয়। বিএনপি ও জামায়াতের প্রায় তিন ডজন সংসদ সদস্য আদালতের রায়ে দন্ডপ্রাপ্ত, কঠোরতম সাজা বরাদ্দ হয়েছেও আইনমোতাবেক তাদের জন্য।

শুরু করা যাক তাহলে সবচেয়ে হেভিওয়েট নামগুলো দিয়েই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ঢাকা-১৭-এর এমপি। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর বাইরে অর্থপাচার মামলায় সাত বছর ও ২০ কোটি টাকা জরিমানা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ১০ বছর, অবৈধ সম্পদ মামলায় নয় বছর আর মানহানির মামলায় দুই বছরের দণ্ডও তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ওই একই গ্রেনেড মামলায় নেত্রকোনা-৪-এর লুৎফুজ্জামান বাবরের সাজা মৃত্যুদণ্ড। দশ ট্রাক অস্ত্রের মামলায় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন, বাসায় অবৈধ অস্ত্র রাখার মামলায় ১৭ বছর, দুর্নীতির মামলায় আট বছর। টাঙ্গাইল-২-এর আবদুস সালাম পিন্টুও ২০১৮ সালে ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন, আর কুমিল্লা-৩-এর কায়কোবাদ পেয়েছিলেন যাবজ্জীবন। একই মামলায় এতজন সংসদ সদস্য জড়িত, ভাবা যায়?

জামায়াতের দিকে তাকালে ছবিটা আরও গা শিউরে ওঠার মতো। রংপুর-২-এর এ টি এম আজহারুল ইসলাম ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পর যুদ্ধাপরাধের দণ্ডিত একজন আজ সংসদের সদস্য, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কষ্টকর। চট্টগ্রাম-১৫-এর শাহজাহান চৌধুরীর নামেও আছে ২০০৮ সালের ১২ এপ্রিলের রায়, শুল্কমুক্ত গাড়ি সংক্রান্ত দুর্নীতি ও সম্পদের তথ্য গোপনের দায়ে ১০ বছর কারাদণ্ড।

ঢাকা-২-এর আমানউল্লাহ আমানের নামে ২০০৭ সালে অবৈধ সম্পদ ও তথ্য গোপনের মামলায় ১৩ বছরের সাজা, এর সঙ্গে সাত বছরের চাঁদাবাজির দায়েও দণ্ড আছে। সিরাজগঞ্জ-২-এর ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সাজা নয় বছর, চট্টগ্রাম-৫-এর মীর হেলাল উদ্দিনের তিন বছর। কক্সবাজার-১-এর সালাহউদ্দিন আহমদের নামে ঘুষের মামলায় সাত বছর, আর আলাদা অবৈধ সম্পদ মামলায় ১৩ বছর, দুই কোটি টাকা জরিমানা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ।

ভোলা-২-এর হাফিজ ইব্রাহিম ২০০৮ সালে ১৩ বছর ও এক কোটি টাকা জরিমানার সাজা পেয়েছিলেন। খুলনা-৫-এর আলী আসগর লবির ঝুলিতেও ১৩ বছর ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা। জামালপুর-১-এর রশিদুজ্জামান মিল্লাত পেয়েছিলেন আট বছর, দিনাজপুর-৬-এর জাহিদ হোসেন ১৩ বছর ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা। খাগড়াছড়ির ওয়াদুদ ভূঁইয়ার সাজা তো পুরো ২০ বছর, সঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানা। মৌলভীবাজার-৩-এর নাসের রহমানের নামে চাঁদাবাজিতে নয় বছর আর আলাদা অবৈধ সম্পদ মামলায় ১৩ বছর ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা। সিলেট-৪-এর আরিফুল হক চৌধুরীর সাজা ১০ বছর।

তালিকা এখানেই শেষ নয়। ঢাকা-৮-এর মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের নামে ২০০৮ সালের ১১ মে কর ফাঁকি ও আয়কর রিটার্নে ভুল তথ্য দেওয়ার দায়ে আট বছরের কারাদণ্ডের রায় আছে। রাজশাহী-২-এর মিজানুর রহমান মিনু চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় ১৩ বছর এক মাসের সাজা পেয়েছিলেন। নাটোর-২-এর রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নামে বিস্ফোরক আইনে ১২ বছর ও আলাদা মামলায় সাত বছরের দণ্ড। বরগুনা-২-এর নূরুল ইসলাম মনির নামে ২০০৭ সালের দুর্নীতি মামলায় ১৪ বছরের সাজার কথা আছে। ভোলা-৩-এর হাফিজ উদ্দিন আহমদ, যিনি এখন সংসদের স্পিকার, তাঁর নামেও ২০০৮ সালের ১৯ জুন অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের মামলায় ১৩ বছর কারাদণ্ডের রেকর্ড আছে। যিনি সংসদ চালান, তাঁর নামের পাশেই এই রায়।

এর বাইরে ঢাকা-২০-এর তামিজ উদ্দিনের নামে চারটি মামলা বিচারাধীন, নরসিংদী-১-এর খাইরুল কবির খোকনের নামে ২০১১ সালের খুনের মামলা ও ২০১৬-১৭ সালের অগ্নিসংযোগের মামলার ইতিহাস, ঢাকা-১৯-এর দেওয়ান সালাউদ্দিনের নামে ২০১৫ সালের নাশকতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের রেকর্ড, কক্সবাজার-২-এর আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদের নামে ২০০৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত দুদক ও র‍্যাব সংক্রান্ত ফৌজদারি রেকর্ড, আর লক্ষ্মীপুর-২-এর আবুল খায়ের ভূঁইয়ার নামে ২০০৮ সালের চাল আত্মসাতের মামলার তথ্য।

ভাবছেন এইগুলো সব পুরোনো আমলের কাহিনি? মোটেও না। ২০২৩ সালের রাজপথের আন্দোলনের মামলাগুলোতেও এই নামগুলো ঘুরে ঘুরে আসে। ভোলা-৩-এর হাফিজ উদ্দিন আর পটুয়াখালী-১-এর আলতাফ হোসেন চৌধুরী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পুলিশের কাজে বাধার মামলায় ২১ মাসের সাজা পান। টাঙ্গাইল-৫-এর সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর সাজা ছিল পল্টন থানার মামলায় দুই বছর, অন্য সূত্রমতে ৩ বছর। খুলনা-৪-এর আজিজুল বারী হেলালের পল্টনের মামলায় দুই বছর, নিউমার্কেটের আলাদা মামলায় দেড় বছর।

ঢাকা-৯-এর হাবিবুর রশিদ হাবিবের তিনটি মামলায় সাজা দুই বছর, তিন বছর ও আড়াই বছর। বরিশাল-৪-এর রাজিব আহসানের সাজা পল্টনে দুই বছর, রমনায় দুই বছর তিন মাস। ঢাকা-১০-এর শেখ রবিউল আলমের কলাবাগানের মামলায় আড়াই বছর, ধানমন্ডির মামলায় তিন বছর। ঢাকা-১৮-এর এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের উত্তরা পূর্ব থানার মামলায় আড়াই বছর। ফরিদপুর-৪-এর শহিদুল ইসলাম বাবুল পল্টনের মামলায় আড়াই বছর ও এক বছরের সাজা পেয়েছিলেন। পটুয়াখালী-২-এর শফিকুল ইসলাম মাসুদের ধানমন্ডিতে বাসে অগ্নিসংযোগের মামলায় তিন বছর।

নোয়াখালী-৪-এর মোহাম্মদ শাহজাহান ভাটারা থানার অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের কাজে বাধার মামলায় চার বছর ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার দণ্ড পেয়েছিলেন। চট্টগ্রাম-৬-এর গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী শেখ হাসিনাকে নিয়ে হুমকিমূলক বক্তব্যের মামলায় তিন বছর ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা পান। সিরাজগঞ্জ-৪-এর রফিকুল ইসলাম খান আদালত অবমাননায় তিন মাসের সাজা আর রাজশাহী-৬-এর আবু সাঈদ চাঁদ চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের মামলায় তিন বছরের সাজা পেয়েছিলেন।

এই তালিকা পড়তে গেলে দম আটকে আসে। অথচ এঁরাই এখন সংসদে, এরাই ঠিক করছেন দেশ কোন পথে চলবে! যাঁদের নামে খুন, অস্ত্র, অর্থপাচার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি আর অগ্নিসংযোগের রায়, তাঁদের হাতে আইন বানানোর ভার! সংসদই যদি এমন হয়, তাহলে থানার ওসি, মাঠের ক্যাডার আর বাজারের চাঁদাবাজের কাছে আইনের কী মূল্য? ২০০১-০৬ সালে দেশ দেখেছিল ক্ষমতার ছায়ায় কীভাবে সন্ত্রাস আর লুটপাট ডালপালা মেলে। আবারও আরম্ভ হয়েছে এই পুরোনো সার্কাস।

আর দলের শীর্ষে যাঁরা, তাঁদের কথাও বাদ যায় না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন রাষ্ট্রপতি, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতো দণ্ডপ্রাপ্ত লোক এখন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। এই অপনেতৃত্বের ছায়াতেই পুরো কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে মামলা আর দণ্ডের ইতিহাস প্রায় যোগ্যতার মতো ঘুরে বেড়ায়।

ক্ষমতায় এসে বিএনপি ও জামায়াত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিচারব্যবস্থাকে নিজেদের অনুকূলে নিয়েছে, নিজেদের নেতাদের বিরুদ্ধের অভিযোগ ধামাচাপা দিয়েছে। প্রশ্নটা তাই শুধু কার সাজা হয়েছিল, তা নয়। প্রশ্ন হলো, যে দেশে এমন অপরাধীদের মিছিল সংসদে ঢোকে, সেখানে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা আর ন্যায়বিচার কোথায় খুঁজবে?

যে সংসদ দেশের জন্য আইন প্রণয়ন করে, সেই সংসদে আইনপ্রণেতা হয়ে এ কারা বসে আছেন! উত্তর খুঁজতে গেলে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় হয়। বিএনপি ও জামায়াতের প্রায় তিন ডজন সংসদ সদস্য আদালতের রায়ে দন্ডপ্রাপ্ত, কঠোরতম সাজা বরাদ্দ হয়েছেও আইনমোতাবেক তাদের জন্য।

শুরু করা যাক তাহলে সবচেয়ে হেভিওয়েট নামগুলো দিয়েই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ঢাকা-১৭-এর এমপি। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর বাইরে অর্থপাচার মামলায় সাত বছর ও ২০ কোটি টাকা জরিমানা, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ১০ বছর, অবৈধ সম্পদ মামলায় নয় বছর আর মানহানির মামলায় দুই বছরের দণ্ডও তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ওই একই গ্রেনেড মামলায় নেত্রকোনা-৪-এর লুৎফুজ্জামান বাবরের সাজা মৃত্যুদণ্ড। দশ ট্রাক অস্ত্রের মামলায় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন, বাসায় অবৈধ অস্ত্র রাখার মামলায় ১৭ বছর, দুর্নীতির মামলায় আট বছর। টাঙ্গাইল-২-এর আবদুস সালাম পিন্টুও ২০১৮ সালে ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন, আর কুমিল্লা-৩-এর কায়কোবাদ পেয়েছিলেন যাবজ্জীবন। একই মামলায় এতজন সংসদ সদস্য জড়িত, ভাবা যায়?

জামায়াতের দিকে তাকালে ছবিটা আরও গা শিউরে ওঠার মতো। রংপুর-২-এর এ টি এম আজহারুল ইসলাম ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পর যুদ্ধাপরাধের দণ্ডিত একজন আজ সংসদের সদস্য, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কষ্টকর। চট্টগ্রাম-১৫-এর শাহজাহান চৌধুরীর নামেও আছে ২০০৮ সালের ১২ এপ্রিলের রায়, শুল্কমুক্ত গাড়ি সংক্রান্ত দুর্নীতি ও সম্পদের তথ্য গোপনের দায়ে ১০ বছর কারাদণ্ড।

ঢাকা-২-এর আমানউল্লাহ আমানের নামে ২০০৭ সালে অবৈধ সম্পদ ও তথ্য গোপনের মামলায় ১৩ বছরের সাজা, এর সঙ্গে সাত বছরের চাঁদাবাজির দায়েও দণ্ড আছে। সিরাজগঞ্জ-২-এর ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সাজা নয় বছর, চট্টগ্রাম-৫-এর মীর হেলাল উদ্দিনের তিন বছর। কক্সবাজার-১-এর সালাহউদ্দিন আহমদের নামে ঘুষের মামলায় সাত বছর, আর আলাদা অবৈধ সম্পদ মামলায় ১৩ বছর, দুই কোটি টাকা জরিমানা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ।

ভোলা-২-এর হাফিজ ইব্রাহিম ২০০৮ সালে ১৩ বছর ও এক কোটি টাকা জরিমানার সাজা পেয়েছিলেন। খুলনা-৫-এর আলী আসগর লবির ঝুলিতেও ১৩ বছর ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা। জামালপুর-১-এর রশিদুজ্জামান মিল্লাত পেয়েছিলেন আট বছর, দিনাজপুর-৬-এর জাহিদ হোসেন ১৩ বছর ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা। খাগড়াছড়ির ওয়াদুদ ভূঁইয়ার সাজা তো পুরো ২০ বছর, সঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানা। মৌলভীবাজার-৩-এর নাসের রহমানের নামে চাঁদাবাজিতে নয় বছর আর আলাদা অবৈধ সম্পদ মামলায় ১৩ বছর ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা। সিলেট-৪-এর আরিফুল হক চৌধুরীর সাজা ১০ বছর।

তালিকা এখানেই শেষ নয়। ঢাকা-৮-এর মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের নামে ২০০৮ সালের ১১ মে কর ফাঁকি ও আয়কর রিটার্নে ভুল তথ্য দেওয়ার দায়ে আট বছরের কারাদণ্ডের রায় আছে। রাজশাহী-২-এর মিজানুর রহমান মিনু চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় ১৩ বছর এক মাসের সাজা পেয়েছিলেন। নাটোর-২-এর রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নামে বিস্ফোরক আইনে ১২ বছর ও আলাদা মামলায় সাত বছরের দণ্ড। বরগুনা-২-এর নূরুল ইসলাম মনির নামে ২০০৭ সালের দুর্নীতি মামলায় ১৪ বছরের সাজার কথা আছে। ভোলা-৩-এর হাফিজ উদ্দিন আহমদ, যিনি এখন সংসদের স্পিকার, তাঁর নামেও ২০০৮ সালের ১৯ জুন অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের মামলায় ১৩ বছর কারাদণ্ডের রেকর্ড আছে। যিনি সংসদ চালান, তাঁর নামের পাশেই এই রায়।

এর বাইরে ঢাকা-২০-এর তামিজ উদ্দিনের নামে চারটি মামলা বিচারাধীন, নরসিংদী-১-এর খাইরুল কবির খোকনের নামে ২০১১ সালের খুনের মামলা ও ২০১৬-১৭ সালের অগ্নিসংযোগের মামলার ইতিহাস, ঢাকা-১৯-এর দেওয়ান সালাউদ্দিনের নামে ২০১৫ সালের নাশকতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের রেকর্ড, কক্সবাজার-২-এর আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদের নামে ২০০৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত দুদক ও র‍্যাব সংক্রান্ত ফৌজদারি রেকর্ড, আর লক্ষ্মীপুর-২-এর আবুল খায়ের ভূঁইয়ার নামে ২০০৮ সালের চাল আত্মসাতের মামলার তথ্য।

ভাবছেন এইগুলো সব পুরোনো আমলের কাহিনি? মোটেও না। ২০২৩ সালের রাজপথের আন্দোলনের মামলাগুলোতেও এই নামগুলো ঘুরে ঘুরে আসে। ভোলা-৩-এর হাফিজ উদ্দিন আর পটুয়াখালী-১-এর আলতাফ হোসেন চৌধুরী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পুলিশের কাজে বাধার মামলায় ২১ মাসের সাজা পান। টাঙ্গাইল-৫-এর সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর সাজা ছিল পল্টন থানার মামলায় দুই বছর, অন্য সূত্রমতে ৩ বছর। খুলনা-৪-এর আজিজুল বারী হেলালের পল্টনের মামলায় দুই বছর, নিউমার্কেটের আলাদা মামলায় দেড় বছর।

ঢাকা-৯-এর হাবিবুর রশিদ হাবিবের তিনটি মামলায় সাজা দুই বছর, তিন বছর ও আড়াই বছর। বরিশাল-৪-এর রাজিব আহসানের সাজা পল্টনে দুই বছর, রমনায় দুই বছর তিন মাস। ঢাকা-১০-এর শেখ রবিউল আলমের কলাবাগানের মামলায় আড়াই বছর, ধানমন্ডির মামলায় তিন বছর। ঢাকা-১৮-এর এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের উত্তরা পূর্ব থানার মামলায় আড়াই বছর। ফরিদপুর-৪-এর শহিদুল ইসলাম বাবুল পল্টনের মামলায় আড়াই বছর ও এক বছরের সাজা পেয়েছিলেন। পটুয়াখালী-২-এর শফিকুল ইসলাম মাসুদের ধানমন্ডিতে বাসে অগ্নিসংযোগের মামলায় তিন বছর।

নোয়াখালী-৪-এর মোহাম্মদ শাহজাহান ভাটারা থানার অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের কাজে বাধার মামলায় চার বছর ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার দণ্ড পেয়েছিলেন। চট্টগ্রাম-৬-এর গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী শেখ হাসিনাকে নিয়ে হুমকিমূলক বক্তব্যের মামলায় তিন বছর ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা পান। সিরাজগঞ্জ-৪-এর রফিকুল ইসলাম খান আদালত অবমাননায় তিন মাসের সাজা আর রাজশাহী-৬-এর আবু সাঈদ চাঁদ চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের মামলায় তিন বছরের সাজা পেয়েছিলেন।

এই তালিকা পড়তে গেলে দম আটকে আসে। অথচ এঁরাই এখন সংসদে, এরাই ঠিক করছেন দেশ কোন পথে চলবে! যাঁদের নামে খুন, অস্ত্র, অর্থপাচার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি আর অগ্নিসংযোগের রায়, তাঁদের হাতে আইন বানানোর ভার! সংসদই যদি এমন হয়, তাহলে থানার ওসি, মাঠের ক্যাডার আর বাজারের চাঁদাবাজের কাছে আইনের কী মূল্য? ২০০১-০৬ সালে দেশ দেখেছিল ক্ষমতার ছায়ায় কীভাবে সন্ত্রাস আর লুটপাট ডালপালা মেলে। আবারও আরম্ভ হয়েছে এই পুরোনো সার্কাস।

আর দলের শীর্ষে যাঁরা, তাঁদের কথাও বাদ যায় না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন রাষ্ট্রপতি, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতো দণ্ডপ্রাপ্ত লোক এখন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। এই অপনেতৃত্বের ছায়াতেই পুরো কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে মামলা আর দণ্ডের ইতিহাস প্রায় যোগ্যতার মতো ঘুরে বেড়ায়।

ক্ষমতায় এসে বিএনপি ও জামায়াত রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিচারব্যবস্থাকে নিজেদের অনুকূলে নিয়েছে, নিজেদের নেতাদের বিরুদ্ধের অভিযোগ ধামাচাপা দিয়েছে। প্রশ্নটা তাই শুধু কার সাজা হয়েছিল, তা নয়। প্রশ্ন হলো, যে দেশে এমন অপরাধীদের মিছিল সংসদে ঢোকে, সেখানে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা আর ন্যায়বিচার কোথায় খুঁজবে?

আরো পড়ুন

সর্বশেষ