জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান: আঞ্চলিক উগ্রবাদের নতুন কেন্দ্র বাংলাদেশ

রৌদ্র রুদ্র
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর কারাগার ভেঙে হাজারো বন্দির পলায়ন, আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)-এর পুনরুত্থান এবং উগ্রবাদী শক্তির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ফলে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা আজ গভীর উদ্বেগের মুখে।

প্রায় দুই দশকের অভিযানে কোণঠাসা উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক আবার সংগঠিত হচ্ছে। উগ্রবাদী আসামিদের কারামুক্তি, জামিনের হিড়িক এবং আন্তর্জাতিক সতর্কতা উপেক্ষা করে স্লিপার সেলের তৎপরতা জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

▪️ উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পরিসংখ্যানগত চিত্র

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী সময়ের পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে জঙ্গিবাদ কিভাবে মাথাচারা দিয়ে পুনরুত্থিত হচ্ছে।

  • গণ-পলায়ন: কারাগার ভেঙে মোট ২,২৪৭ জন বন্দি পালিয়ে যায় (সূত্র: কারা অধিদপ্তর)।
  • পলাতক বন্দি: এখনো ৬৯০ জন ধরাছোঁয়ার বাইরে (সূত্র: কারা অধিদপ্তর)।
  • এটিইউ (ATU)-এর হালনাগাদ তথ্য: এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের অন্তত ৩১১ জন সদস্য পলাতক। এর মধ্যে জেএমবি-১৮৫, আনসার আল ইসলাম-৮৩, হুজি-বি-১৬, নিও-জেএমবি-১৬, আল্লাহর দল-৯, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া-১ এবং ইমাম মাহমুদের কাফিলার-১ জন। হিযবুত তাহ্‌রীরের আরও ৫৯ জন পলাতক (প্রথম আলো, ১ জুলাই ২০২৬; SATP, ২ জুলাই ২০২৬)।
  • শীর্ষ জঙ্গি অধরা: পলায়নকারীদের একটি অংশ পুনরায় ধরা পড়লেও ৩ জন শীর্ষ জঙ্গি মামলার আসামি এখনো পলাতক (সূত্র: কারা অধিদপ্তর)।
  • জঙ্গিদের পলায়ন: কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পলাতকদের মধ্যে জঙ্গির সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৮ জন (The Financial Express)।
  • জামিন: ৫ আগস্টের পরবর্তী মাসগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গি জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে (The Financial Express)।
  • আন্তর্জাতিক সতর্কতা: EUAA-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ আগষ্ট ২০২৪ থেকে পরবর্তী কয়েক মাসে ১৭৪ জন জঙ্গি-সংশ্লিষ্ট বন্দি জামিন পেয়ে পুনরায় উগ্রবাদী কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে।

▪️ জাতীয় নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি: জঙ্গি পুনরুত্থান এবং স্লিপার সেলের বিস্তার

২,২৪৭ বন্দির পলায়ন এবং ৬৯০ জনের পলাতক থাকার সুযোগে জেএমবি, নিও-জেএমবি, আনসার আল ইসলাম ও হুজি-বির মতো সংগঠন আবার সক্রিয় হচ্ছে।

দেশীয় এই গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক AQIS-এর সংযোগে নিজেদের পুনর্গঠন করছে। পলাতক জঙ্গি ও জামিনপ্রাপ্ত আসামিরা দেশজুড়ে স্লিপার সেল সক্রিয় করেছে এবং এনক্রিপ্টেড অ্যাপ বা সাইবার প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তরুণদের উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করছে।

এই ঝুঁকির তিনটি স্তর আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সদস্যরা ধরা না পড়ায় সংগঠনগুলো নেতৃত্ব ও কৌশলগত দক্ষতা ধরে রাখতে পারছে। দ্বিতীয়ত, জামিনে মুক্ত আসামিদের ওপর কার্যকর নজরদারি না থাকলে তারা সহজেই পুরোনো যোগাযোগ ফিরিয়ে আনতে পারে।
তৃতীয়ত, অনলাইন প্রচারণায় তরুণদের নিয়োগ করা সহজ, কিন্তু তাদের শনাক্ত করা কঠিন।
এই তিনটি একসঙ্গে কাজ করলে একটি পুনর্গঠিত নেটওয়ার্ক দ্রুত দাঁড়াতে পারে। এতে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

▪️ অতীতের ছায়া: উগ্রবাদের রক্তস্নাত অভয়ারণ্য (২০০১–২০০৬)

২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য হামলা:

  • ২১ আগস্ট ২০০৪: বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, অন্তত ২৪ জন নিহত ও প্রায় ৩০০ আহত।
  • ২৭ জানুয়ারি ২০০৫: হবিগঞ্জে সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়াসহ ৫ জনের প্রাণহানি।
  • ১৭ আগস্ট ২০০৫: ৬৩ জেলায় একযোগে ৪৫৯টি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় জেএমবি।
  • ১৪ নভেম্বর ২০০৫: ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা।
  • ২৯ নভেম্বর ২০০৫: আদালত প্রাঙ্গণে আত্মঘাতী হামলা।
  • ৮ ডিসেম্বর ২০০৫: নেত্রকোনায় উদীচী কার্যালয়ের সামনে আত্মঘাতী হামলায় ৬ জন নিহত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)-এর তথ্যমতে, এ সময়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হামলায় ১৮১ জন নিহত ও ১,১৭০-এর অধিক আহত হন। এই ইতিহাস দেখায়, রাজনৈতিক সহনশীলতা বা শৈথিল্যের পরিবেশে জঙ্গিবাদ দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং একসঙ্গে দেশজুড়ে হামলার সক্ষমতা অর্জন করে।

▪️ অতীতে জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সাফল্য

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রায় ভেঙে দেওয়া হয়।

এ সময় বাংলাদেশের ভূখণ্ড আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। ফলে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সীমান্ত সন্ত্রাসের ঝুঁকি অনেকটা কমে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, জঙ্গিবাদ দমনে ধারাবাহিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ই সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

▪️ AQIS-এর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার দীর্ঘ অন্তর্ধান: নেতৃত্বের পুনর্গঠন ও প্রকাশ্য হুমকি

AQIS-এর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা মাওলানা ইকরামুল হক ওরফে আবু তালহার বিরুদ্ধে ভারতে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে এবং তিনি সেখানে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ (CTTC-এর তথ্য; The Economic Times)।

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর জামিনে বের হওয়ার পর এখন পর্যন্ত তাঁর সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।
তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার এবং ভিন্ন পরিচয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

এমন একজন শীর্ষ জঙ্গি নেতার দীর্ঘ সময় ধরে অধরা থাকা দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থার জন্য সতর্কসংকেত। জাল পরিচয় ও পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগ আরও দেখায়, সীমান্ত ও পরিচয়-যাচাই ব্যবস্থার দুর্বলতা এই নেটওয়ার্ককে আন্তর্দেশীয় চলাচলের সুযোগ দিতে পারে।

▪️ AQIS, আন্তঃসীমান্ত হুমকি ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন: আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং টিম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিবেদনে AQIS-এর পুনরুত্থান ও নিরাপদ আশ্রয় তৈরির চেষ্টা নিয়ে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

৫ আগস্টের পর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা আরও জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ উগ্রবাদীদের ট্রানজিট করিডোরে পরিণত হওয়ায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসহ সীমান্তজুড়ে স্লিপার সেলের তৎপরতা বেড়েছে।

৩১ মার্চ ২০২৫-এ দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল ও কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযানে লস্কর-ই-তৈয়বার একটি চক্রের ৮ সদস্য গ্রেপ্তার হয়, যাদের ৭ জনই বাংলাদেশি নাগরিক (এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া)।

চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী কাশ্মীরের শাব্বির আহমেদ লোন দীর্ঘদিন বাংলাদেশে পালিয়ে থেকে ঢাকার কাছের আস্তানা থেকে সেলটি পরিচালনা করছিলেন।

হুন্ডি বা বেনামি চ্যানেলে জঙ্গিদের অর্থ জোগানের খবরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও কূটনৈতিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অর্থের এই অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ ট্র্যাক করা কঠিন, ফলে এটি নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখার অন্যতম বড় ভিত্তি।

▪️ ২০২৬ সালের ধারাবাহিক চরমপন্থী তৎপরতা ও নাশকতার বিস্তার

২০২৬ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটা উল্লেখযোগ্য ঘটনাঃ

  • ২১ ফেব্রুয়ারি: যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে পুলিশ চেকপোস্টে হামলা।
  • ৭ মার্চ: কুমিল্লায় মন্দিরে বোমা হামলা।
  • ১২ মার্চ: ফেনীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক সদস্যকে হত্যা।
  • ২৫ মার্চ: যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে পাইপবোমা বিস্ফোরণ।
  • ২২ জুন: দক্ষিণখানে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে বোমা হামলা।
  • ২৪ জুলাই: মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমা উদ্ধার।
  • ৩০ জুলাই: আশুলিয়ায় প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধার।
  • ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫: কেরানীগঞ্জে মাদ্রাসা বিস্ফোরণ।
  • ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: যশোরে অস্ত্র ও গ্রেনেড উদ্ধার ।
    (তথ্য সূত্র: প্রথম আলো)

এসব ঘটনার লক্ষ্যবস্তু পুলিশ, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও গণপরিবহন। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, তিন ক্ষেত্রেই আঘাত হানার প্রবণতা স্পষ্ট।

▪️ বিএনপি সরকারের তোষণ নীতি ও উগ্রবাদের আশঙ্কাজনক পুনরুত্থান

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির মধ্যেই উগ্রবাদীরা পুনর্বাসিত হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও দেশবাসীর সামনে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে:

▫️কারাগার থেকে পালানো জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের ধরতে দৃশ্যমান কোনো বড় অভিযান হয়নি কেন?

▫️জঙ্গি মামলার আসামিরা একের পর এক জামিন পেলেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নীরব কেন?

▫️জামিনপ্রাপ্ত উগ্রপন্থীদের ওপর ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ফিজিক্যাল নজরদারি ভেঙে পড়ল কেন?

▫️বিএনপি-জামায়াত বলয়ের রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ধর্মীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রশাসনের ভূমিকার সম্পর্ক কী?

▪️ শেষকথা : জাতীয় নিরাপত্তার চরম বিপর্যয় এবং আঞ্চলিক উগ্রবাদের নতুন কেন্দ্র হয়ে ওঠার অবধারিত শঙ্কা

২,২৪৭ বন্দির পলায়ন, ৬৯০ জনের পলাতক থাকা, স্লিপার সেলের বিস্তার এবং AQIS নেতার অন্তর্ধানের ঘটনাগুলো ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরের গভীর নিরাপত্তা শূন্যতা উন্মোচন করেছে। জামিন প্রক্রিয়ায় বিচারিক তত্ত্বাবধান এবং পুনরায় সক্রিয় হওয়া সাংগঠনিক কার্যক্রম শনাক্তে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে।

রাষ্ট্রযন্ত্রের উদাসীনতা এবং বিএনপি-জামায়াত চক্রের সরাসরি তোষণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্রবাদীদের এই পুনর্বাসন দেশকে মহাবিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই বিস্তার রোধের কোনো সদিচ্ছা সরকারের নেই; বরং প্রশাসনিক নীরবতার সুযোগে উগ্রবাদীদের শেকড় সমাজের প্রতি স্তরে প্রোথিত হচ্ছে।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের কোনো স্থায়ী বিস্তার দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার ওপর বৃহত্তর প্রভাব ফেলবে।

বড় রক্তপাত ঘটার আগেই এই আত্মঘাতী পথ থেকে ফিরতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পুরোপুরি হারাবে এবং উগ্রবাদের স্থায়ী কেন্দ্রস্থলে পরিণত হবে। এটি ভারতসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।

লেখাঃ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

রৌদ্র রুদ্র
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর কারাগার ভেঙে হাজারো বন্দির পলায়ন, আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)-এর পুনরুত্থান এবং উগ্রবাদী শক্তির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ফলে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা আজ গভীর উদ্বেগের মুখে।

প্রায় দুই দশকের অভিযানে কোণঠাসা উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক আবার সংগঠিত হচ্ছে। উগ্রবাদী আসামিদের কারামুক্তি, জামিনের হিড়িক এবং আন্তর্জাতিক সতর্কতা উপেক্ষা করে স্লিপার সেলের তৎপরতা জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

▪️ উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পরিসংখ্যানগত চিত্র

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী সময়ের পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে জঙ্গিবাদ কিভাবে মাথাচারা দিয়ে পুনরুত্থিত হচ্ছে।

  • গণ-পলায়ন: কারাগার ভেঙে মোট ২,২৪৭ জন বন্দি পালিয়ে যায় (সূত্র: কারা অধিদপ্তর)।
  • পলাতক বন্দি: এখনো ৬৯০ জন ধরাছোঁয়ার বাইরে (সূত্র: কারা অধিদপ্তর)।
  • এটিইউ (ATU)-এর হালনাগাদ তথ্য: এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের অন্তত ৩১১ জন সদস্য পলাতক। এর মধ্যে জেএমবি-১৮৫, আনসার আল ইসলাম-৮৩, হুজি-বি-১৬, নিও-জেএমবি-১৬, আল্লাহর দল-৯, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া-১ এবং ইমাম মাহমুদের কাফিলার-১ জন। হিযবুত তাহ্‌রীরের আরও ৫৯ জন পলাতক (প্রথম আলো, ১ জুলাই ২০২৬; SATP, ২ জুলাই ২০২৬)।
  • শীর্ষ জঙ্গি অধরা: পলায়নকারীদের একটি অংশ পুনরায় ধরা পড়লেও ৩ জন শীর্ষ জঙ্গি মামলার আসামি এখনো পলাতক (সূত্র: কারা অধিদপ্তর)।
  • জঙ্গিদের পলায়ন: কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পলাতকদের মধ্যে জঙ্গির সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৮ জন (The Financial Express)।
  • জামিন: ৫ আগস্টের পরবর্তী মাসগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গি জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে (The Financial Express)।
  • আন্তর্জাতিক সতর্কতা: EUAA-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ আগষ্ট ২০২৪ থেকে পরবর্তী কয়েক মাসে ১৭৪ জন জঙ্গি-সংশ্লিষ্ট বন্দি জামিন পেয়ে পুনরায় উগ্রবাদী কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে।

▪️ জাতীয় নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি: জঙ্গি পুনরুত্থান এবং স্লিপার সেলের বিস্তার

২,২৪৭ বন্দির পলায়ন এবং ৬৯০ জনের পলাতক থাকার সুযোগে জেএমবি, নিও-জেএমবি, আনসার আল ইসলাম ও হুজি-বির মতো সংগঠন আবার সক্রিয় হচ্ছে।

দেশীয় এই গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক AQIS-এর সংযোগে নিজেদের পুনর্গঠন করছে। পলাতক জঙ্গি ও জামিনপ্রাপ্ত আসামিরা দেশজুড়ে স্লিপার সেল সক্রিয় করেছে এবং এনক্রিপ্টেড অ্যাপ বা সাইবার প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তরুণদের উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করছে।

এই ঝুঁকির তিনটি স্তর আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সদস্যরা ধরা না পড়ায় সংগঠনগুলো নেতৃত্ব ও কৌশলগত দক্ষতা ধরে রাখতে পারছে। দ্বিতীয়ত, জামিনে মুক্ত আসামিদের ওপর কার্যকর নজরদারি না থাকলে তারা সহজেই পুরোনো যোগাযোগ ফিরিয়ে আনতে পারে।
তৃতীয়ত, অনলাইন প্রচারণায় তরুণদের নিয়োগ করা সহজ, কিন্তু তাদের শনাক্ত করা কঠিন।
এই তিনটি একসঙ্গে কাজ করলে একটি পুনর্গঠিত নেটওয়ার্ক দ্রুত দাঁড়াতে পারে। এতে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

▪️ অতীতের ছায়া: উগ্রবাদের রক্তস্নাত অভয়ারণ্য (২০০১–২০০৬)

২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য হামলা:

  • ২১ আগস্ট ২০০৪: বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, অন্তত ২৪ জন নিহত ও প্রায় ৩০০ আহত।
  • ২৭ জানুয়ারি ২০০৫: হবিগঞ্জে সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়াসহ ৫ জনের প্রাণহানি।
  • ১৭ আগস্ট ২০০৫: ৬৩ জেলায় একযোগে ৪৫৯টি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় জেএমবি।
  • ১৪ নভেম্বর ২০০৫: ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা।
  • ২৯ নভেম্বর ২০০৫: আদালত প্রাঙ্গণে আত্মঘাতী হামলা।
  • ৮ ডিসেম্বর ২০০৫: নেত্রকোনায় উদীচী কার্যালয়ের সামনে আত্মঘাতী হামলায় ৬ জন নিহত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)-এর তথ্যমতে, এ সময়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হামলায় ১৮১ জন নিহত ও ১,১৭০-এর অধিক আহত হন। এই ইতিহাস দেখায়, রাজনৈতিক সহনশীলতা বা শৈথিল্যের পরিবেশে জঙ্গিবাদ দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং একসঙ্গে দেশজুড়ে হামলার সক্ষমতা অর্জন করে।

▪️ অতীতে জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সাফল্য

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রায় ভেঙে দেওয়া হয়।

এ সময় বাংলাদেশের ভূখণ্ড আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। ফলে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সীমান্ত সন্ত্রাসের ঝুঁকি অনেকটা কমে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, জঙ্গিবাদ দমনে ধারাবাহিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ই সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

▪️ AQIS-এর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতার দীর্ঘ অন্তর্ধান: নেতৃত্বের পুনর্গঠন ও প্রকাশ্য হুমকি

AQIS-এর দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা মাওলানা ইকরামুল হক ওরফে আবু তালহার বিরুদ্ধে ভারতে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে এবং তিনি সেখানে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ (CTTC-এর তথ্য; The Economic Times)।

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর জামিনে বের হওয়ার পর এখন পর্যন্ত তাঁর সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।
তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার এবং ভিন্ন পরিচয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

এমন একজন শীর্ষ জঙ্গি নেতার দীর্ঘ সময় ধরে অধরা থাকা দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থার জন্য সতর্কসংকেত। জাল পরিচয় ও পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগ আরও দেখায়, সীমান্ত ও পরিচয়-যাচাই ব্যবস্থার দুর্বলতা এই নেটওয়ার্ককে আন্তর্দেশীয় চলাচলের সুযোগ দিতে পারে।

▪️ AQIS, আন্তঃসীমান্ত হুমকি ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন: আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মনিটরিং টিম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিবেদনে AQIS-এর পুনরুত্থান ও নিরাপদ আশ্রয় তৈরির চেষ্টা নিয়ে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

৫ আগস্টের পর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা আরও জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ উগ্রবাদীদের ট্রানজিট করিডোরে পরিণত হওয়ায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসহ সীমান্তজুড়ে স্লিপার সেলের তৎপরতা বেড়েছে।

৩১ মার্চ ২০২৫-এ দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল ও কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযানে লস্কর-ই-তৈয়বার একটি চক্রের ৮ সদস্য গ্রেপ্তার হয়, যাদের ৭ জনই বাংলাদেশি নাগরিক (এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া)।

চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী কাশ্মীরের শাব্বির আহমেদ লোন দীর্ঘদিন বাংলাদেশে পালিয়ে থেকে ঢাকার কাছের আস্তানা থেকে সেলটি পরিচালনা করছিলেন।

হুন্ডি বা বেনামি চ্যানেলে জঙ্গিদের অর্থ জোগানের খবরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও কূটনৈতিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অর্থের এই অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ ট্র্যাক করা কঠিন, ফলে এটি নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখার অন্যতম বড় ভিত্তি।

▪️ ২০২৬ সালের ধারাবাহিক চরমপন্থী তৎপরতা ও নাশকতার বিস্তার

২০২৬ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটা উল্লেখযোগ্য ঘটনাঃ

  • ২১ ফেব্রুয়ারি: যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে পুলিশ চেকপোস্টে হামলা।
  • ৭ মার্চ: কুমিল্লায় মন্দিরে বোমা হামলা।
  • ১২ মার্চ: ফেনীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক সদস্যকে হত্যা।
  • ২৫ মার্চ: যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে পাইপবোমা বিস্ফোরণ।
  • ২২ জুন: দক্ষিণখানে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে বোমা হামলা।
  • ২৪ জুলাই: মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমা উদ্ধার।
  • ৩০ জুলাই: আশুলিয়ায় প্রেসার কুকার বোমা উদ্ধার।
  • ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫: কেরানীগঞ্জে মাদ্রাসা বিস্ফোরণ।
  • ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: যশোরে অস্ত্র ও গ্রেনেড উদ্ধার ।
    (তথ্য সূত্র: প্রথম আলো)

এসব ঘটনার লক্ষ্যবস্তু পুলিশ, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও গণপরিবহন। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, তিন ক্ষেত্রেই আঘাত হানার প্রবণতা স্পষ্ট।

▪️ বিএনপি সরকারের তোষণ নীতি ও উগ্রবাদের আশঙ্কাজনক পুনরুত্থান

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির মধ্যেই উগ্রবাদীরা পুনর্বাসিত হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও দেশবাসীর সামনে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে:

▫️কারাগার থেকে পালানো জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের ধরতে দৃশ্যমান কোনো বড় অভিযান হয়নি কেন?

▫️জঙ্গি মামলার আসামিরা একের পর এক জামিন পেলেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নীরব কেন?

▫️জামিনপ্রাপ্ত উগ্রপন্থীদের ওপর ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ফিজিক্যাল নজরদারি ভেঙে পড়ল কেন?

▫️বিএনপি-জামায়াত বলয়ের রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ধর্মীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রশাসনের ভূমিকার সম্পর্ক কী?

▪️ শেষকথা : জাতীয় নিরাপত্তার চরম বিপর্যয় এবং আঞ্চলিক উগ্রবাদের নতুন কেন্দ্র হয়ে ওঠার অবধারিত শঙ্কা

২,২৪৭ বন্দির পলায়ন, ৬৯০ জনের পলাতক থাকা, স্লিপার সেলের বিস্তার এবং AQIS নেতার অন্তর্ধানের ঘটনাগুলো ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরের গভীর নিরাপত্তা শূন্যতা উন্মোচন করেছে। জামিন প্রক্রিয়ায় বিচারিক তত্ত্বাবধান এবং পুনরায় সক্রিয় হওয়া সাংগঠনিক কার্যক্রম শনাক্তে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে।

রাষ্ট্রযন্ত্রের উদাসীনতা এবং বিএনপি-জামায়াত চক্রের সরাসরি তোষণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় উগ্রবাদীদের এই পুনর্বাসন দেশকে মহাবিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই বিস্তার রোধের কোনো সদিচ্ছা সরকারের নেই; বরং প্রশাসনিক নীরবতার সুযোগে উগ্রবাদীদের শেকড় সমাজের প্রতি স্তরে প্রোথিত হচ্ছে।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের কোনো স্থায়ী বিস্তার দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার ওপর বৃহত্তর প্রভাব ফেলবে।

বড় রক্তপাত ঘটার আগেই এই আত্মঘাতী পথ থেকে ফিরতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পুরোপুরি হারাবে এবং উগ্রবাদের স্থায়ী কেন্দ্রস্থলে পরিণত হবে। এটি ভারতসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।

লেখাঃ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

আরো পড়ুন

সর্বশেষ