দেশের এক কোটি ৮১ লাখ মানুষ আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সবেমাত্র প্রকাশিত রিপোর্টে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। অথচ ক্ষমতায় বসে থাকা বিএনপি সরকারের কাছে মনে হয় এই সংখ্যাটা বোধহয় শুধুই একটা পরিসংখ্যান। মানুষের পেটে ভাত নেই, ঘরে চুলা জ্বলে না, কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে উৎসব আর হাসিমুখের কোনো কমতি নেই।
খাদ্য নিরাপত্তার এই সংকট আসলে হঠাৎ করে আসেনি। এফএও স্পষ্ট বলেছে, ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াই এর মূল কারণ। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, পরিবহন খরচ বাড়ছে, বাজারের চাল-ডাল-তেল-নুন সবকিছুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অথচ সরকারের গোষ্ঠীপতিদের গুদামে খাদ্য মজুত হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ একবেলা খেয়ে আরেকবেলা অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের যে বীভৎস অপশাসন দেশের মানুষ ভুলতে পারেনি, ২০২৬ সালে এসে মনে হচ্ছে সেই ইতিহাস আবারও ফিরে এসেছে। তখনও দুর্নীতি, লুটপাট আর খাদ্য সংকটে মানুষকে পিষ্ট করা হয়েছিল। ভুলে যাওয়া মানুষের হয়েছিল, ঠকানো হয়েছিল বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ক্ষমতায় এসে সেই একই কায়দায় মানুষকে ঠকানোর কাজ চলছে।
দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলের জেলা সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরিশাল, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, নোয়াখালী। এছাড়া পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং কক্সবাজারও তালিকায় আছে। উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জেও একই অবস্থা। অর্থাৎ সীমান্ত থেকে উপকূল, পাহাড় থেকে হাওর, কোথাও কেউ রেহাই পাচ্ছে না। বিএনপির শাসনামলে দেশের প্রতিটি প্রান্তে সংকট ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে উদ্বেগের বিষয় হলো কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর কথা। তাদের ৩৫ শতাংশ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে, যার মধ্যে ১০ শতাংশ চরম পরিস্থিতিতে। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিএনপি নেতাদের বড় বড় বক্তব্য শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবে তাদের পেটে ভাত দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই। আন্তর্জাতিক সহায়তার টাকাও যথাযথভাবে কাজে লাগছে না, কারণ তদারকির অভাবে দুর্নীতির ফুলঝুড়ি ফুটেছে।
মজার বিষয় হলো, সরকার দাবি করছে দেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে। এফএও বলছে ২০২৬ সালে ধানের মোট উৎপাদন হবে ৬ কোটি ১৯ লাখ টন, যা গত চার বছরের গড়ের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। বোরো ধানের উৎপাদন ৩ কোটি ১৯ লাখ টন হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, উৎপাদন বাড়লে মানুষ কেন না খেয়ে থাকবে? উত্তরটা সহজ। উৎপাদন যতই বাড়ুক, তা সাধারণ মানুষের প্লেটে পৌঁছাচ্ছে না। মজুতদার, চক্রান্তকারী আর ক্ষমতার সুবিধাভোগীরা সিন্ডিকেট করে বাজারে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকার হয় চোখ বন্ধ করে আছে, নয়তো নিজেই এই সিন্ডিকেটের অংশ।
বিদেশ থেকে চাল আমদানির পরিমাণও কমছে। এফএও বলছে ২০২৫ সালে ১৯ লাখ টন চাল আমদানি হলেও ২০২৬ সালে তা কমে ৮ লাখ টনে দাঁড়াবে। এর মানে হলো সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল কেনা কমিয়ে দিয়েছে। অথচ দেশের অভ্যন্তরে বাজার আগুন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কী স্বার্থ লুকিয়ে আছে, সেই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুর্নীতির মহোৎসব শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বড় লুটপাট চলে খাদ্য ও ভর্তুকির টাকায়। ত্রাণের চাল গুদাম থেকে গায়েব, ওএমএসের আটা কালোবাজারে, আর লালিত সংগঠনের নেতাকর্মীরা হয়ে উঠেছেন মধ্যস্বত্বভোগী। যে টাকা বিদেশ থেকে সহায়তা হিসেবে আসে, তা সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছে জমা হয় ক্ষমতাসীনদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
অথচ এই দেশেই একসময় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গর্ব করা হতো। কৃষক রাত-দিন পরিশ্রম করে ফসল ফলান, আর সেই ফসলের ন্যায্য মূল্য তাঁরা পান না। সরকার কৃষকের ধানের দাম ঠিকভাবে না দিয়ে বরং আমদানিকারক ও মজুতদারদের পকেট ভরাতে ব্যস্ত। এ কারণেই খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও খাদ্য সংকট বাড়ছে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১০.১৩ শতাংশে, যা ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের আগস্টে এসে তা কিছুটা কমে ৮.২৬ শতাংশে দাঁড়ালেও ১২ মাসের গড় এখনো ৮.৬৬ শতাংশ। এর মানে বাজার আগের মতোই চড়া। রোজা-ঈদ-পূজা-পার্বণ যতই আসুক, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য থালা ভরা ভাতের স্বপ্ন দিন দিন দূরের হয়ে যাচ্ছে।
যে বাংলাদেশকে ২০০১-০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট শেষ করে দিয়েছিল, সেই দেশটাকে আবারও একই অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তখন ছিল হাওয়া ভবনের রাজত্ব, এখন সেটি আরও আধুনিক রূপে ফিরেছে। সাধারণ মানুষ শুধু টিকিট কাটার মেশিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোট দিলে কিছুই বদলায় না, ক্ষমতা বদলালেও ক্ষমতার স্বরূপ একই থাকে।
দেশের খাদ্য সংকটের দায় পুরোপুরি এই সরকারের। তবে এই সংকট কাটাতে হবে নাগরিক দায়বদ্ধতা থেকে। প্রশ্ন করতে হবে, খাদ্য উৎপাদন বেড়ে গেলেও মানুষ কেন অভুক্ত থাকবে? কেন মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? কেন ওএমএসে খাদ্যসামগ্রী কম, আর দুর্নীতিতে ফাস্ট? কেন জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে বোঝা চাপানো হচ্ছে?

