সচিব সাহেব বলছেন ১৪ জুন থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সময়ে চুরি হয়েছে। মানে টানা ৩৯ দিন ধরে ২২টা কম্পিউটার খালি করা হয়েছে। একটা না দুটো, বাইশটা। অথচ এই পুরো সময়টায় কেউ কিছু দেখেনি, শোনেনি, টের পায়নি। অফিস তো আর পরিত্যক্ত গুদাম না। ১৭ তলায় সরকারি কর্মকর্তারা বসেন, ফাইল টেবিলে সারাক্ষণ আসা-যাওয়া, পিওনের যাতায়াত লেগেই আছে। তারপরেও ২২টা সিপিইউ খুলে হার্ডডিস্ক, র্যাম, প্রসেসর, কুলার এক এক করে বের করা হয়েছে। এত সময় নিয়ে, এত নিখুঁতভাবে কেউ চুরি করলো আর অফিসের পুরো চেইন অফ কমান্ড বেঘোরে ঘুমিয়ে কাটালো? এটা নির্লিপ্ততা না পরিকল্পিত সহায়তা?
সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চুরি ধরা পড়েছে শুনেই হাসি পেয়েছে আমার। ফুটেজ যদি শুরুতেই দেখা হতো তাহলে ২৩ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো না। প্রতি সপ্তাহে ফুটেজ কেউ মনিটরিং করছে না। তাহলে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে লাভ কী, শোপিস হিসেবে রেখেছেন? নাকি চুরির আগেই ফুটেজ ডিলিট করার সুবিধা দরকার ছিল।
হার্ডডিস্ক চুরি মামলা হালকাভাবে নেওয়ার কিছু নেই। মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার মানেই সংবেদনশীল ডাটা। নীতিমালার খসড়া, আন্তঃমন্ত্রণালয় চিঠিপত্র, বাজেট বরাদ্দের হিসাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তদন্ত রিপোর্ট, গোপনীয় সার্কুলার। এইসব ডাটা এখন কার হাতে গেল সেটাই আসল প্রশ্ন। অফিস সহায়কের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে পুরো ঘটনা হাস্যকরভাবে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। একজন অফিস সহায়ক একা এত বড় চুরি করতে পারে না, পারলেও তাকে প্রশ্রয় দিয়েছে কারা?
ভবনের নিচে নিরাপত্তাকর্মী বসে কী করে? কার্যদিবস শেষে কেউ অফিস ছাড়ার সময় ব্যাগ চেকিং হয় না। তাহলে হার্ডডিস্ক, প্রসেসর, র্যাম বের করে কীভাবে বাইরে গেল? মন্ত্রণালয়ের ভবন বলতে কী বোঝায়, সেটাই বুঝতে চায় না বিএনপি-জামাত জোট সরকার। মন্ত্রণালয় তাদের কাছে আবাসিক হোটেল, আর সরকারি সম্পদ পরিবারের ব্যক্তিগত ইনভেন্টরি। ৪ লাখ টাকার জিনিসপত্র চুরি মামলার খাতায় জমা পড়ে থাকবে, হার্ডডিস্কের ভেতরের তথ্য চলে যাবে হাতেবদলে। কিন্তু কোনো তদন্ত কমিটি বসবে না, কেউ জবাবদিহি চাইবে না। দায়সারা থানায় জিডি করে পার পেয়ে যাবে সবাই।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের বক্তব্যও দেখার মতো। সিসিটিভি ফুটেজে চুরির সত্যতা পাওয়া গেছে কিন্তু সেটা কীভাবে ঘটলো, নিরাপত্তার গাফিলতি কোথায়, ভবিষ্যতে কী প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এসব নিয়ে এক লাইনও নাই। শুধু থানায় অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে সাংবাদিকদের চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বিদায় করে দিয়েছেন। তার বক্তব্য না নিরাপত্তাহীনতার স্বীকৃতি, না কোনো জবাবদিহির অঙ্গীকার।
কাপ-পিরিচ চুরি গেছে শুনে ব্যাপারটা কৌতুক লাগতে পারে কিন্তু ভেবে দেখুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস মানে কে কখন আসে যায় তার ঠিক নেই। চা পানের ছুতায় বহিরাগতদের যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়া হয় রুটিন করে। ভেতরের মানুষের সুবিধামতো জিনিসপত্র সরানোর পথও ওই চায়ের কাপের নিচ দিয়ে চলে গেছে। হার্ডডিস্ক চোরাই হোক বা উধাও করা হোক, আসল সত্যটা এভাবেই চাপা পড়ে থাকে।
সরকারি দপ্তরে যখন এমন চুরি হয় তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র কতটা দুর্বল হয়ে গেছে। বিএনপি-জামাত জোট বারবার বলে রাষ্ট্র মেরামতের কথা। কিন্তু এদের আমলেই মন্ত্রণালয়ের অফিস থেকে ডাটা উধাও হওয়া, সম্পদ লুটপাট হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
২০০১-০৬ মেয়াদেও একই চিত্র ছিল, জামাতের মন্ত্রণালয়গুলো ছিল দুর্নীতির হাব আর এখনো তাই। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে অবস্থা বরং আরও সঙ্গীন। কারণ তখন রাতারাতি হার্ডডিস্ক চুরি হতো, এখন সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চুরি হয় আর কেউ টের পায় না। সিকিউরিটি সিস্টেমের দুরবস্থা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এরা শাসন করতে এসেছে না লুট করতে এসেছে।

