ময়মনসিংহের ভালুকায় পাঁচ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি গায়েব হয়ে গেছে। গায়েব মানে কেউ চুরি করে পালিয়ে যায়নি। বরং একেবারে দিনের আলোয়, বন বিভাগের নাকের ডগায়, সরকারি নথিতে নাম রেখেই পারটেক্স, স্কয়ার, এনভয়, রানার, ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বনের ভেতরে কারখানা বসিয়েছে। আর এই পুরো তালিকার সবচেয়ে উপরে বসে আছেন বনমন্ত্রী নিজে। আব্দুল আওয়াল মিন্টুর লাল তীর কোম্পানির দখলে আছে ৮০ একর সংরক্ষিত বনভূমি।
এই একটা তথ্যই যথেষ্ট। বাকি সব বিশ্লেষণ আসলে অপ্রয়োজনীয়।
যে লোক বন দখল করে বসে আছেন, তাঁকে বনমন্ত্রী বানানো হয়েছে। এটা অজ্ঞতা থেকে হয়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এই ধরনের নিয়োগ একটা বার্তা দেয়, যাদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে তাদেরই দায়িত্বে বসাও। ফলে বন বিভাগ কেন নীরব, কেন ৯৫৫টি উচ্ছেদ প্রস্তাব পাঠানোর পরেও একটা মামলাও রুজু হয়নি, কেন ময়মনসিংহের এই রেঞ্জ অফিসে পোস্টিং পেতে টাকা লাগে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আসলে আর খুঁজতে হয় না।
বন বিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক বলেছেন, আদালতে মামলা আছে, তাই সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এই যুক্তিটা শুনতে খুব সুবিধাজনক। কিন্তু মামলাগুলো কে করেছে? অনেক ক্ষেত্রে দখলদাররা নিজেরাই উচ্চ আদালতে রিট করে স্থিতাবস্থা আদেশ এনেছেন, যাতে উচ্ছেদ না করা যায়। তারপর সেই স্থিতাবস্থার পেছনে লুকিয়ে বন বিভাগ বলছে, আমরা কিছু করতে পারছি না। এটা ব্যর্থতা নয়, এটা একটা সাজানো গোছানো শোষনের স্থায়ী ব্যবস্থা।
স্কয়ার, পারটেক্স বা এনভয়ের মতো গ্রুপগুলোকে নিয়ে এই দেশে একটা ভক্তিমূলক গদগদে আলোচনা চলে। তারা রপ্তানি আয় করে, কর্মসংস্থান দেয়, দেশের উন্নয়নের অংশীদার। কিন্তু যে জমিতে তাদের কারখানা দাঁড়িয়ে, সেই জমি তারা কিনেছেন না, দখল করেছেন। রাষ্ট্রের সম্পদ, মানে সবার সম্পদ, জবরদখল করে কারখানা চালানো আসলে ব্যবসা নয়, এটা লুট। কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার বিজ্ঞাপন দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সংরক্ষিত বনভূমিত দখল করে বসে থাকে, তখন সেই বিজ্ঞাপনগুলো আসলে কতোটা ফাঁপা আলাপে পরিপূর্ণ, সেটা বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স লাগে না।
টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, এই দখলদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, কারণ এই দখলের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে এটা কোনো একটা সরকারের আমলে হয়নি। কিন্তু এখন যে সরকার আছে, তারা পুরনো দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এসেছে বলে দাবি করে। সেই সরকার যদি এখন বনমন্ত্রীকে পদে রেখে, উচ্ছেদ না করে, মামলার পেছনে লুকিয়ে বসে থাকে, তাহলে পুরনো সরকারের সঙ্গে তাদের তফাতটা আসলে কোথায়?
দশ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের জমি এখন ব্যক্তির হাতে। সেই জমিতে একসময় গাছ ছিল, পাখি ছিল, জীববৈচিত্র্য ছিল। সেই বন ফেরত আসবে না সহজে। কিন্তু অন্তত যারা এই কাজ করেছেন, তাদের জবাবদিহিটুকু হওয়া দরকার ছিল। সেটাও হচ্ছে না। কারণ বনমন্ত্রী নিজেই দখল কান্ডের হোতা।

