জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি এখন ৬৪ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। সংখ্যাটা শুনতে বড় মনে হয়, কিন্তু এর ভেতরে কী আছে সেটা বুঝলে গা শিরশির করে। ব্যাসেল-৩ নীতি অনুযায়ী ব্যাংকটার মাত্র ১২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকার মূলধন রাখার কথা, কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকটা এত গভীর গর্তে আছে যে সেই গর্তের তলা দেখা যাচ্ছে না। ২০২৫ সালে ব্যাংকটার নিট লোকসান ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকার বেশি। এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের মধ্যে পঞ্চাশ হাজার পাঁচশো ত্রিশ কোটি টাকা আটকে আছে মাত্র পাঁচটা ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কাছে। পুরোটাই খেলাপি। ব্যাংকটা এখন কোনোমতে বেঁচে আছে সরকারি ট্রেজারি বিল আর বন্ডের সুদ খেয়ে।
এই অবস্থা হঠাৎ হয়নি। ক্ষমতা দখল করেই রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়া হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় পর্ষদে লোক বসানো হয়েছে, আর জবাবদিহির জায়গাটা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না। এটা পরিকল্পিতভাবে একটা প্রতিষ্ঠানকে শেষ করে দেওয়ার গল্প।
এখন প্রশ্ন হলো, এই সংকটের সামনে যে সরকার দাঁড়িয়ে আছে, সেই সরকার কি আদৌ এর সমাধান করার যোগ্যতা রাখে? ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে নির্বাচন হয়েছে, সেটাকে নির্বাচন বলতে লজ্জা করে। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ছিল না, জনগণ ভোটকেন্দ্রে যায়নি, আর যা হয়েছে সেটা মূলত নিজেরা নিজেরা ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার একটা আনুষ্ঠানিকতা। জিয়াউর রহমান যে দল তৈরি করেছিলেন সেনানিবাসের ছায়ায়, সেই বিএনপি আজকে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সব জায়গায় মন্ত্রী বসিয়ে দেশ চালাচ্ছে। কিন্তু চালানো আর লুটপাট করার মধ্যে পার্থক্যটা ক্রমশ ঘুচে যাচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছেন ব্যাংক নিয়ে কিছু অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এই কথাটা শুনতে ভালো। কিন্তু বিএনপির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস এই দলের কখনো ছিল না। বেসিক ব্যাংককে বাঁচাতে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ঢালা হয়েছে, ব্যাংকটা তারপরও আট হাজার কোটির খেলাপি ঋণ নিয়ে কোনোমতে টিকে আছে। পদ্মা ব্যাংকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ৭১৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, ফলাফল শূন্য। শরিয়াভিত্তিক দুর্বল ব্যাংকগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। প্রতিবারই একই ফর্মুলা, একই ব্যর্থতা। কিন্তু টাকাটা কার, সেটা কেউ ভাবে না। এটা জনগণের করের টাকা।
বিএনপির এই মন্ত্রিসভা এখন যদি জনতা ব্যাংকেও একই পথে হাঁটে, মানে কাঠামোগত সংস্কার না করে শুধু টাকা ঢেলে দেয়, তাহলে সেটা হবে রাষ্ট্রীয় অর্থের সবচেয়ে বড় অপচয়গুলোর একটা। কারণ সমস্যাটা টাকার না, সমস্যাটা কাঠামোর। যে পর্ষদ রাজনৈতিক বিবেচনায় চলে, যে ব্যাংকে জবাবদিহি নেই, সেখানে যত টাকাই দেওয়া হোক, সেটা একই গর্তে পড়বে।
দেশের ৬১টা ব্যাংকের মধ্যে ২৪টাই এখন ন্যূনতম মূলধন ধরে রাখতে পারছে না। বিশ্বব্যাংক বলছে পুরো ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে জিডিপির কমপক্ষে দশ শতাংশ পুনর্মূলধনীকরণ দরকার। সেটা কোথা থেকে আসবে? যে সরকার একটা বৈধ নির্বাচন করার নৈতিক সাহস রাখে না, সে সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারের রাজনৈতিক সাহস দেখাবে এটা আশা করা কঠিন। ব্যাংকগুলোর সুদের হার, কর কাঠামো, খেলাপি ঋণ আদায়ের আইনি কাঠামো, জামানত নিবন্ধন ব্যবস্থা, সবকিছুতেই সংস্কার দরকার। কিন্তু এই সংস্কারগুলো করতে গেলে বিএনপির নিজের স্বার্থেই আঘাত লাগে, কারণ তারা যে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর সাথে দশকের পর দশক সম্পর্ক রেখে চলেছে, সেই গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই এই খেলাপি ঋণের পেছনে।
এই সরকারের অর্থমন্ত্রী যখন সংসদে কথা বলেন, তখন তার কথায় পরিচিত একটা আওয়াজ থাকে। যে আওয়াজ বলে, আমরা জানি সমস্যাটা কী, আমরা জানি কী করতে হবে, কিন্তু করব কিনা সেটা পরে দেখা যাবে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এই পরে দেখা যাবে সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিকার। বছরের পর বছর একই কথা বলা হয়েছে, একই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কখনো সত্যিকারের স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। যে সরকার ভোটের দিন ভোটকেন্দ্র ফাঁকা রেখে ক্ষমতায় বসে, সে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনতা দেবে, এই ভরসা কোথা থেকে আসবে?
জনতা ব্যাংকের ৬৪ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি শুধু একটা ব্যাংকের সমস্যা না। এটা একটা ব্যবস্থার দেউলিয়াত্বের প্রমাণ। সেই ব্যবস্থাকে ঠিক করার দায়িত্ব যাদের হাতে পড়েছে, তারা নিজেরাই সেই ব্যবস্থার একটা অংশ। এটাই আসল সমস্যা।

