দুর্যোগে-সংকটে ত্রাতা হয়ে ফিরে আসা

এম নজরুল ইসলাম
১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসে বর্বর নির্যাতন। হত্যা, গুম-খুন, জেল-জুলুম হয় নিত্যসঙ্গী। দেশব্যাপী এমন এক ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করা হয়, যেখানে কেউ বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করার সাহস পেত না।

বঙ্গবন্ধুর খুনি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সব ধরনের অপচেষ্টাই চালিয়ে যায়। নেতাকর্মীরা ছিল হতাশ এবং দিশাহীন। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৮১ সালের ১৭ মে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসেছিলেন। শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নয়, বাঙালি জাতিসত্তায় বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষ সেদিন নতুন প্রেরণা খুঁজে পেয়েছিলেন। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই বাঙালি জাতির ইতিহাসে এই দিনটি স্মরণীয় হয়ে আছে এবং থাকবে।

১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু স্বাধীনতার পর পরাজিত শক্তি ও বিশ্বাসঘাতকেরা মিলে গোপন ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। দেশি-বিদেশি সেই ষড়যন্ত্রের কারণে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জীবন দিতে হয়। হত্যা করা হয় সেদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে উপস্থিত পরিবারের সব সদস্যকে। সে রাতে হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগের আরো অনেক নেতাকে। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির আস্ফালন শুরু হয় চতুর্দিকে। সান্ধ্য আইন আর ট্যাংক-কামানের টহল দেখে মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কথা বলতেও ভয় পেত মানুষ। সেই অবরুদ্ধ দিনের অর্গল খুলে যায় ১৯৮১ সালের ১৭ মে।

এ যেন অনেকটাই গ্রিক পুরাণের বীর প্রমিথিউসের গল্প নতুন করে ফিরে আসা। সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। অলিম্পাসের চ‚ড়ায় জিউসসহ যেসব দেবতার বাস ছিল, তাদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল টাইটানরা। কিন্তু দেবতাদের মতো অত ক্ষমতা না থাকায় যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতে হয়েছিল তাদের। পরাজিত টাইটানদের বন্দি করা হয়েছিল এমন এক জায়গায়, যেন তারা আর ফিরে আসতে না পারে। প্রমিথিউস ছিলেন এ রকম এক টাইটানের ছেলে। প্রমিথিউস আর তাঁর ভাই এপিমিথিউসকে বন্দি না করে জিউস তাঁর সঙ্গেই রেখেছিলেন। কিন্তু প্রমিথিউসের কোনো ইচ্ছা ছিল না অলিম্পাসে থাকার। তিনি তাঁর ভাইকে নিয়ে পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন।

তখন মানুষ সুখে ছিল না। প্রমিথিউসের মন খারাপ হলো। তিনি চিন্তা করে দেখলেন যে মানুষের কাছে যদি আগুন থাকত, তাহলে তো এ রকম করে জীবন কাটাতে হতো না। অনেক চিন্তা করে প্রমিথিউস জিউসের কাছে গিয়ে মানুষের জন্য আগুন চাইলেন। কিন্তু জিউস স্রেফ না করে দিলেন। কারণ দেখালেন যে আগুন পেলে মানুষ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং একসময় তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়াবে। প্রমিথিউস দুঃখ পেলেও আর কিছু না বলে চলে এলেন। কিন্তু মনে মনে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন, মানুষকে তিনি আগুন এনে দেবেনই। এই ভেবে প্রমিথিউস একদিন রওনা হলেন পূর্ব দিকে, যেদিক দিয়ে সূর্য ওঠে। পূর্ব দিকের সর্বশেষ প্রান্তে পৌঁছে তিনি দেখলেন যে সূর্য তার সারা দিনের পথপরিক্রমার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তখনো পুরো তেজ নিয়ে জ্বলা শুরু করেনি। সুযোগ বুঝে প্রমিথিউস সূর্যের এক কোনা ভেঙে নিয়ে চলে এলেন।

মানুষের কাছে এসে তিনি আগুন ধরিয়ে দেখালেন। আগুন কিভাবে জ্বালাতে হয়, কিভাবে আগুন দিয়ে রান্না করে খেতে হয়, তা শেখালেন। এর পাশাপাশি চাষাবাদ, হাতিয়ার তৈরি থেকে আরো অনেক কিছু শিখিয়ে দিলেন। মানুষ স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার গুহা ছেড়ে বাইরে থাকা শুরু করল, ঘরবাড়ি বানানো শিখল। মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াল।

এই গল্পেরই পুনরাবৃত্তি যেন আমরা দেখতে পাই ১৯৮১ সালের ১৭ মে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে এ দেশের একদল মানুষ যেন নিজেদের দেবতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। যা কিছু ভালো, সব তাদের অবদান, এটাই ছিল একমাত্র প্রচার। গণতন্ত্রের আকাশ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল সামরিকতন্ত্রের কালো মেঘ দিয়ে। সমাজের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দেশ ও জাতিকে গ্রাস করেছিল একরাশ অন্ধকার। সে এক অবরুদ্ধ, বাকরুদ্ধ, শ্বাসরুদ্ধের অবস্থা। জাতির পিতা নেই। জাতীয় চার নেতা নেই। দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ নেই। সেই দিকভ্রান্ত দিনে আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে তিনি পা রাখলেন সেই মাটিতে, যেখানে মিশে আছে তাঁর স্বজনদের রক্ত। ১৭ মে ১৯৮১। সর্বস্বহারা এক নারী এই দিনে খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর পথের সাথী ও স্বজনদের। দীর্ঘ ছয় বছরের প্রবাসজীবন শেষ করে জাতির দুর্যোগময় দিনে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

সেদিন ঢাকার সব পথ মিশে গিয়েছিল বিমানবন্দর ও মানিক মিয়া এভিনিউয়ে। আসলে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি চাইছিল যে মানুষ। তারা বুঝেছিল তাদের ত্রাতা আসছেন। আসছেন সেই দিকনির্দেশক, যিনি মুক্তির অগ্রযাত্রায় আসন্ন বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবেন। মানুষের অধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে নতুন গতি যে তাঁরই যোগ্য নেতৃত্বে সূচিত হবে, তা বুঝতে এ দেশের মানুষের একটুও সময় লাগেনি। বঙ্গবন্ধুর মতো উদারপ্রাণ, মহৎ মানুষকে হারিয়ে এ দেশের মানুষ তখন এমন কাউকে খুঁজছে, যাঁর ওপর শতভাগ নির্ভর করা যায়। মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবেই তাঁর ফিরে আসা এই মাটিতে।

বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রতি আস্থা রেখে মানুষ ভুল করেনি। মানুষকে নিরাশ হতে হয়নি। পিতার মতোই শক্ত হাতে তিনি হাল ধরেছিলেন। তবে তিনি সতর্ক ছিলেন। পিতার মতোই তাঁকেও হত্যার অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। গ্রেনেড-বন্দুক হামলাও হয়েছে। শ্রষ্টার অশেষ কৃপায় তিনি রক্ষা পেয়েছেন। দলের নেতাকর্মীরা মানববর্ম সাজিয়ে এবং নিজেদের জীবন দিয়ে প্রিয় নেত্রীকে রক্ষা করেছেন। নেত্রীও তার প্রতিদান দিয়েছেন। নিজের সর্বস্ব দিয়ে তিনি দেশ ও জাতির জন্য কাজ করেছেন। ফলে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাঁরই যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পায়।

কিন্তু ষড়যন্ত্র পিছু ছাড়েনি। আবারও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা তৎপর হয়। মেটিকুলাস ডিজাইনের ষড়যন্ত্র দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। বিশেষ বিমানে করে তাঁকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বাংলাদেশের সব অর্জনকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে তাণ্ডব চালাতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধীরা। তাদের সঙ্গে হাত মেলায় বিএনপির একটি অংশ। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতার বাড়ি, পরবর্তীকালে যেটিকে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর করা হয়, তা রাষ্ট্রীয় বুলডোজার ব্যবহার করে ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। মুজিবনগরসহ সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাষ্কর্য ভেঙে দেওয়া হয়। ইউনূস ঘোষণা দেয়, রিসেট বাটন টিপে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে দেওয়া হবে। বাহাত্তরের সংবিধান তাদের গায়ে জ্বালা ধরায়। তাই বাহাত্তরের সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিয়ে তারা নতুন সংবিধান লিখতে চায়।

রাজাকার-আলবদরের উত্তরসূরীরা একাত্তরের মতোই আবার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুদের হত্যায় মেতে উঠেছে। দেশব্যাপী রক্তের হোলি খেলা শুরু করেছে। কিন্তু কোনো ষড়যন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একাত্তরে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। এবার তারচেয়েও শোচনীয় পরাজয় হবে তাদের। প্রতিরোধ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এই বাংলায় বাঙালির জয় অবশ্যম্ভাবী। জয় বাংলা আর বাংলার জয় মিলেমিশে একাকার হবে।

জাতির চরম দুর্যোগের সময় ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা যেভাবে ফিরে এসেছিলেন, একইভাবে তিনি আবার ফিরে আসবেন। এবং ফিরে আসবেন খুব শিগগিরই। এরই মধ্যে তিনি সেই ঘোষণাও দিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর এবারের প্রত্যাবর্তন হবে অনেক বেশি তেজোদীপ্ত, অনেক বেশি গৌরবময়। আমরা প্রত্যাশা করি, এবারের প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশ থেকে সব ষড়যন্ত্রের চিরসমাপ্তি ঘটবে।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, কলামিষ্ট ও সাংবাদিক।

এম নজরুল ইসলাম
১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসে বর্বর নির্যাতন। হত্যা, গুম-খুন, জেল-জুলুম হয় নিত্যসঙ্গী। দেশব্যাপী এমন এক ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করা হয়, যেখানে কেউ বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করার সাহস পেত না।

বঙ্গবন্ধুর খুনি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সব ধরনের অপচেষ্টাই চালিয়ে যায়। নেতাকর্মীরা ছিল হতাশ এবং দিশাহীন। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৮১ সালের ১৭ মে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসেছিলেন। শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নয়, বাঙালি জাতিসত্তায় বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষ সেদিন নতুন প্রেরণা খুঁজে পেয়েছিলেন। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই বাঙালি জাতির ইতিহাসে এই দিনটি স্মরণীয় হয়ে আছে এবং থাকবে।

১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এই দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু স্বাধীনতার পর পরাজিত শক্তি ও বিশ্বাসঘাতকেরা মিলে গোপন ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। দেশি-বিদেশি সেই ষড়যন্ত্রের কারণে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জীবন দিতে হয়। হত্যা করা হয় সেদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে উপস্থিত পরিবারের সব সদস্যকে। সে রাতে হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগের আরো অনেক নেতাকে। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির আস্ফালন শুরু হয় চতুর্দিকে। সান্ধ্য আইন আর ট্যাংক-কামানের টহল দেখে মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কথা বলতেও ভয় পেত মানুষ। সেই অবরুদ্ধ দিনের অর্গল খুলে যায় ১৯৮১ সালের ১৭ মে।

এ যেন অনেকটাই গ্রিক পুরাণের বীর প্রমিথিউসের গল্প নতুন করে ফিরে আসা। সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। অলিম্পাসের চ‚ড়ায় জিউসসহ যেসব দেবতার বাস ছিল, তাদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল টাইটানরা। কিন্তু দেবতাদের মতো অত ক্ষমতা না থাকায় যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতে হয়েছিল তাদের। পরাজিত টাইটানদের বন্দি করা হয়েছিল এমন এক জায়গায়, যেন তারা আর ফিরে আসতে না পারে। প্রমিথিউস ছিলেন এ রকম এক টাইটানের ছেলে। প্রমিথিউস আর তাঁর ভাই এপিমিথিউসকে বন্দি না করে জিউস তাঁর সঙ্গেই রেখেছিলেন। কিন্তু প্রমিথিউসের কোনো ইচ্ছা ছিল না অলিম্পাসে থাকার। তিনি তাঁর ভাইকে নিয়ে পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন।

তখন মানুষ সুখে ছিল না। প্রমিথিউসের মন খারাপ হলো। তিনি চিন্তা করে দেখলেন যে মানুষের কাছে যদি আগুন থাকত, তাহলে তো এ রকম করে জীবন কাটাতে হতো না। অনেক চিন্তা করে প্রমিথিউস জিউসের কাছে গিয়ে মানুষের জন্য আগুন চাইলেন। কিন্তু জিউস স্রেফ না করে দিলেন। কারণ দেখালেন যে আগুন পেলে মানুষ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং একসময় তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে দাঁড়াবে। প্রমিথিউস দুঃখ পেলেও আর কিছু না বলে চলে এলেন। কিন্তু মনে মনে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন, মানুষকে তিনি আগুন এনে দেবেনই। এই ভেবে প্রমিথিউস একদিন রওনা হলেন পূর্ব দিকে, যেদিক দিয়ে সূর্য ওঠে। পূর্ব দিকের সর্বশেষ প্রান্তে পৌঁছে তিনি দেখলেন যে সূর্য তার সারা দিনের পথপরিক্রমার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তখনো পুরো তেজ নিয়ে জ্বলা শুরু করেনি। সুযোগ বুঝে প্রমিথিউস সূর্যের এক কোনা ভেঙে নিয়ে চলে এলেন।

মানুষের কাছে এসে তিনি আগুন ধরিয়ে দেখালেন। আগুন কিভাবে জ্বালাতে হয়, কিভাবে আগুন দিয়ে রান্না করে খেতে হয়, তা শেখালেন। এর পাশাপাশি চাষাবাদ, হাতিয়ার তৈরি থেকে আরো অনেক কিছু শিখিয়ে দিলেন। মানুষ স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার গুহা ছেড়ে বাইরে থাকা শুরু করল, ঘরবাড়ি বানানো শিখল। মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াল।

এই গল্পেরই পুনরাবৃত্তি যেন আমরা দেখতে পাই ১৯৮১ সালের ১৭ মে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে এ দেশের একদল মানুষ যেন নিজেদের দেবতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। যা কিছু ভালো, সব তাদের অবদান, এটাই ছিল একমাত্র প্রচার। গণতন্ত্রের আকাশ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল সামরিকতন্ত্রের কালো মেঘ দিয়ে। সমাজের আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দেশ ও জাতিকে গ্রাস করেছিল একরাশ অন্ধকার। সে এক অবরুদ্ধ, বাকরুদ্ধ, শ্বাসরুদ্ধের অবস্থা। জাতির পিতা নেই। জাতীয় চার নেতা নেই। দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ নেই। সেই দিকভ্রান্ত দিনে আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে তিনি পা রাখলেন সেই মাটিতে, যেখানে মিশে আছে তাঁর স্বজনদের রক্ত। ১৭ মে ১৯৮১। সর্বস্বহারা এক নারী এই দিনে খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর পথের সাথী ও স্বজনদের। দীর্ঘ ছয় বছরের প্রবাসজীবন শেষ করে জাতির দুর্যোগময় দিনে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

সেদিন ঢাকার সব পথ মিশে গিয়েছিল বিমানবন্দর ও মানিক মিয়া এভিনিউয়ে। আসলে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি চাইছিল যে মানুষ। তারা বুঝেছিল তাদের ত্রাতা আসছেন। আসছেন সেই দিকনির্দেশক, যিনি মুক্তির অগ্রযাত্রায় আসন্ন বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবেন। মানুষের অধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে নতুন গতি যে তাঁরই যোগ্য নেতৃত্বে সূচিত হবে, তা বুঝতে এ দেশের মানুষের একটুও সময় লাগেনি। বঙ্গবন্ধুর মতো উদারপ্রাণ, মহৎ মানুষকে হারিয়ে এ দেশের মানুষ তখন এমন কাউকে খুঁজছে, যাঁর ওপর শতভাগ নির্ভর করা যায়। মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবেই তাঁর ফিরে আসা এই মাটিতে।

বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রতি আস্থা রেখে মানুষ ভুল করেনি। মানুষকে নিরাশ হতে হয়নি। পিতার মতোই শক্ত হাতে তিনি হাল ধরেছিলেন। তবে তিনি সতর্ক ছিলেন। পিতার মতোই তাঁকেও হত্যার অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। গ্রেনেড-বন্দুক হামলাও হয়েছে। শ্রষ্টার অশেষ কৃপায় তিনি রক্ষা পেয়েছেন। দলের নেতাকর্মীরা মানববর্ম সাজিয়ে এবং নিজেদের জীবন দিয়ে প্রিয় নেত্রীকে রক্ষা করেছেন। নেত্রীও তার প্রতিদান দিয়েছেন। নিজের সর্বস্ব দিয়ে তিনি দেশ ও জাতির জন্য কাজ করেছেন। ফলে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাঁরই যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পায়।

কিন্তু ষড়যন্ত্র পিছু ছাড়েনি। আবারও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা তৎপর হয়। মেটিকুলাস ডিজাইনের ষড়যন্ত্র দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। বিশেষ বিমানে করে তাঁকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বাংলাদেশের সব অর্জনকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে তাণ্ডব চালাতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধীরা। তাদের সঙ্গে হাত মেলায় বিএনপির একটি অংশ। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতার বাড়ি, পরবর্তীকালে যেটিকে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর করা হয়, তা রাষ্ট্রীয় বুলডোজার ব্যবহার করে ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। মুজিবনগরসহ সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাষ্কর্য ভেঙে দেওয়া হয়। ইউনূস ঘোষণা দেয়, রিসেট বাটন টিপে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে দেওয়া হবে। বাহাত্তরের সংবিধান তাদের গায়ে জ্বালা ধরায়। তাই বাহাত্তরের সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিয়ে তারা নতুন সংবিধান লিখতে চায়।

রাজাকার-আলবদরের উত্তরসূরীরা একাত্তরের মতোই আবার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুদের হত্যায় মেতে উঠেছে। দেশব্যাপী রক্তের হোলি খেলা শুরু করেছে। কিন্তু কোনো ষড়যন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একাত্তরে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। এবার তারচেয়েও শোচনীয় পরাজয় হবে তাদের। প্রতিরোধ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এই বাংলায় বাঙালির জয় অবশ্যম্ভাবী। জয় বাংলা আর বাংলার জয় মিলেমিশে একাকার হবে।

জাতির চরম দুর্যোগের সময় ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা যেভাবে ফিরে এসেছিলেন, একইভাবে তিনি আবার ফিরে আসবেন। এবং ফিরে আসবেন খুব শিগগিরই। এরই মধ্যে তিনি সেই ঘোষণাও দিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর এবারের প্রত্যাবর্তন হবে অনেক বেশি তেজোদীপ্ত, অনেক বেশি গৌরবময়। আমরা প্রত্যাশা করি, এবারের প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশ থেকে সব ষড়যন্ত্রের চিরসমাপ্তি ঘটবে।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, কলামিষ্ট ও সাংবাদিক।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ