বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা এখন অনেকটা পুরনো গানের মতো। সুর চেনা, কথা মুখস্থ, কিন্তু গাওয়ার লোক দিন দিন কমে আসছে। যারা এই গান একসময় গাইতেন, তারাও অনেকে এখন গলা নামিয়ে ফেলেছেন। কেউ সুবিধার হিসাব কষে, কেউ ভয়ে, কেউবা বিশ্বাস হারিয়ে।
২০২৪ সালের আগস্টে একটা নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলে দেয়ার পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, সেটি পূরণ হয়েছে মূলত দুটি শক্তির সমন্বয়ে। একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে ইসলামপন্থী দলগুলো। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই দুটি শক্তির সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এই সম্পর্কের ফলাফল হচ্ছে যে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র দিন দিন আরও ক্ষীণ হয়ে আসছে।
বিএনপির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, দলটির জন্ম এবং বেড়ে ওঠা সামরিক শাসনের ছায়ায়। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যে রাজনৈতিক দল গড়ে তোলেন, সেটির আদর্শগত ভিত্তি কখনোই স্পষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে “বিসমিল্লাহ” যুক্ত করার কাজটি তাঁর আমলেই হয়। এরপর থেকে বিএনপি বারবার ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধেছে, তাদের রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছে এবং ক্ষমতার প্রশ্নে তাদের সঙ্গে আপোষ করেছে। জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দলকে, যাদের নেতারা একাত্তরে গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল, বিএনপি কেবল জোটসঙ্গী হিসেবে নয়, মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছে। এটি কোনো রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা নয়, এটি মূল্যবোধের প্রশ্ন।
আর ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে বিদেশী রাষ্ট্রের টাকায়, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় আর সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ২০২৪ সালে দেশব্যাপী জুলাই দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেশের নির্বাচিত সরকারকে ক্যু করে ফেলে দিয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা সুদী মহাজন ইউনুসের শাসনামলে বাংলাদেশে যা ঘটেছে সেটি আরও সরাসরি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, মন্দির ভাঙচুর, হিন্দু পরিবারের সম্পত্তি দখল, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু যখন রাষ্ট্র এসব ঘটনার বিচার না করে, যখন দায়ীদের আড়াল করা হয়, যখন ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতার কথা বলেও প্রতিকার পান না, তখন এটিকে আর শুধু “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলার উপায় থাকে না। দিপু দাস হত্যার ঘটনা এই প্রসঙ্গে একটি নাম মাত্র। এর বাইরে অসংখ্য ঘটনা আছে যেগুলো মিডিয়ায় আসেনি বা এলেও দ্রুত চাপা পড়ে গেছে।
ধর্মীয় বাজার তত্ত্বের ভাষায় বলতে গেলে, বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির এই উত্থান হঠাৎ ঘটেনি। বছরের পর বছর ধরে মানুষের অর্থনৈতিক হতাশা, দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস এবং প্রগতিশীল রাজনীতির কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যস্থানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রবেশ করেছে একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী বয়ান নিয়ে। বয়ানটি হলো, সব সমস্যার সমাধান ধর্মীয় পরিচয় সুরক্ষায়, আর সেই সুরক্ষার দায়িত্ব তারাই নিতে পারবে।
এই বয়ানের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এটি পরীক্ষাযোগ্য নয়। যখন কেউ প্রতিশ্রুতি দেয় যে অমুক নীতি মানলে জিডিপি বাড়বে, তখন সেটি যাচাই করা যায়। কিন্তু যখন বলা হয় আল্লাহর আইন কায়েম হলে সব ঠিক হয়ে যাবে, তখন সেটি যাচাইয়ের সুযোগ নেই। ব্যর্থতা হলে দায় দেওয়া হয় বাইরের শত্রুকে। এই কাঠামোয় জবাবদিহিতার কোনো জায়গা নেই।
বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক বক্তব্যে এই প্যাটার্ন স্পষ্ট। ভারতভীতি এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে “অন্য” হিসেবে চিহ্নিত করার যে প্রবণতা এদের মধ্যে দেখা যায়, সেটি কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়। এটি একটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল। “বাইরের শত্রু” তৈরি করলে ভেতরের ব্যর্থতা থেকে মনোযোগ সরানো সহজ হয়। এবং সেই শত্রুকে একটি ধর্মীয় পরিচয় দিলে সমর্থক জোগাড় করতে আরও কম পরিশ্রম লাগে।
ইউনূস সরকারের দিকে তাকালে একটি বিশেষ অস্বস্তি তৈরি হয়। ব্যক্তি ইউনূস আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উদারনৈতিক, সংস্কারমুখী মানুষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার যখন ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে নীরব সমঝোতায় থাকে, যখন সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিচারে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা দেখা যায়, তখন ব্যক্তিপরিচয় আর রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়। সেই ফাঁকটি উপেক্ষা করে যাওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো বিদেশি আমদানি নয়। এটি এই ভূখণ্ডের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ফলাফল। ১৯৭১ সালে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেটির একটি বড় ভিত্তিই ছিল ধর্মের নামে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। সেই ইতিহাস আজ যখন ধীরে ধীরে পুনর্লিখিত হচ্ছে, যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে “একটি দলের রাজনৈতিক সম্পদ” বলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন বুঝতে হবে এটি নিছক ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন নয়। এটি একটি মূল্যবোধের বিরুদ্ধে সচেতন আক্রমণ।
যে সমাজে ধর্মের নামে ভিন্নমতকে দমন করা যায়, সংখ্যালঘুকে অপর করে দেখানো যায়, এবং সেই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র নীরব থাকে বা সহায়তা করে, সেই সমাজে শেষ পর্যন্ত কেবল সংখ্যালঘুরা একা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে যারা ভিন্নমত পোষণ করেন, যারা প্রশ্ন করেন, যারা একটু আলাদাভাবে বাঁচতে চান, তারাও একে একে ঠেলে বেরিয়ে যায় সেই বৃত্তের বাইরে।
বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটছে কিনা সেটি এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।

