বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জেলখাটা এখন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে প্রকট, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস এর বরাতে সেই চিত্রই স্পষ্ট। আর সেই আঁধার ঘনীভূত হচ্ছে একাত্তর টিভির মোজাম্মেল হক বাবুর মতো মুখপাত্রদের জামিন নামঞ্জুরের মধ্য দিয়ে। মঙ্গলবার হাইকোর্টের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও জামিন পাননি তিনি, যে মামলার সূত্রপাত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, অথচ তথাকথিত অভিযোগের শেকড় প্রোথিত ২০০৭ সালে! সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক সমন্বয়ক কুনাল মজুমদারের ভাষ্য, এই অঞ্চলে বাংলাদেশ এখন সবার ওপরে।
মোজাম্মেল বাবুর নামে এখন পাঁচটি মামলার ভিড়। তার চারটিই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ক্যুয়ের প্রেক্ষাপটে দায়ের করা হত্যা মামলা। তার সঙ্গে কারাবন্দি আছেন শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ, ফারজানা রুপা; সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে আছেন সাংবাদিক শওকত মাহমুদও। ২০২৫ সালের প্রিজন সেনসাসে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে তিন শর বেশি সাংবাদিক কারাগারে, তাদের এক তৃতীয়াংশই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বন্দি। প্রায় অর্ধেকের বিরুদ্ধেই এখনো রায় আসেনি, ২৬ শতাংশ আছেন বিনা রায়ে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে। সিপিজে এই দীর্ঘসূত্রিতাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলেই মনে করে।
কারাবন্দি সাংবাদিকের তালিকায় বিশ্বে শীর্ষে চীন, তাদের পঞ্চাশ জন আটক ছিলেন ডিসেম্বর পর্যন্ত। তারপরই মায়ানমার ত্রিশ জন নিয়ে, ইসরায়েল ঊনত্রিশ জন নিয়ে। বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্দশ, কিন্তু এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমরা এখন সবার চেয়ে এগিয়ে। কুনাল মজুমদার বলছেন, চার সাংবাদিককে ছয়শো দিন আটক রাখা হয়েছে অথচ চার্জশিটই দাখিল হয়নি। বিচার শুরু না হতেই দণ্ডভোগের এই পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে জামিন নয়, হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রম। সিপিজের ভাষায়, “জীবিতদের কবরস্থান” হয়ে উঠেছে এই আটকের পরিস্থিতি।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই যে এই গ্রেপ্তারের মোড়কে ভূমিকা রাখছে, সে সন্দেহ প্রবল হয়ে উঠছে। কুনাল মজুমদারের বক্তব্য স্পষ্ট, হত্যা মামলার মতো স্পর্শকাতর এবং কঠোর অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এ ক্ষেত্রে অস্পষ্টই রয়ে গেছে। এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই সিপিজের ধারণা। সাংবাদিকতা পক্ষপাতদুষ্ট বা বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু সেটা কখনোই ফৌজদারি অপরাধ হয়ে উঠতে পারে না। “গ্রহণযোগ্য সাংবাদিকতা কি, তার চূড়ান্ত নির্ধারক সরকার হতে পারে না,” বলেছেন কুনাল। হত্যা মামলা আর পক্ষপাতদুষ্ট সাংবাদিকতার প্রশ্ন যে সম্পূর্ণ আলাদা, তা বোঝার মতো আইনি ন্যূনতম বিচক্ষণতা এই সরকার রাখছে কিনা সে প্রশ্ন তিনি জোর দিয়েই তুলেছেন।
নেত্র নিউজের নির্বাহী সম্পাদক নাজমুল আহসান এই পরিস্থিতিকে দেখছেন বৃহত্তর রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রতিফলন হিসেবে। ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ দল যখন রাষ্ট্রীয়ভাবেই অপরাধী প্রতিপাদিত হচ্ছে, তখন আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকদের ওপর সেই রেশ এসে পড়াটা অমোঘ বলেই তিনি মনে করেন। আর এই অবস্থান থেকে সাংবাদিকদের বিভক্তি আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে অধিকার আদায়ের প্রশ্নে মতাদর্শের দেয়াল টপকানো যাচ্ছে না, পারস্পরিক সংহতির জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কুনাল মজুমদারও এই ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, মনে করিয়ে দিয়েছেন মতাদর্শগত ভিন্নতার ঊর্ধ্বে উঠে আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি দায়।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রতি আস্থা রাখার মতো ভিত সাংবাদিক সমাজের কাছে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। কুনাল মজুমদার গত এপ্রিলের শেষে আইনমন্ত্রী বরাবর যে চিঠি দিয়েছেন, তার জবাব মেলেনি। অথচ বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে একগাদা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দমনমূলক আইন বাতিল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার, সাংবাদিকদের সুরক্ষা জোরদার করার কথা তারা লিখে রেখেছিল। এখন, ২০২৬ সালের মে মাসে দাঁড়িয়ে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো কেবলই কাগজের ওপর কালির আঁচড় হয়ে আছে। সাংবাদিক সাহেদ আলম তথ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ টাস্ক ফোর্স গঠনের কথা বলেছেন, যেখানে স্থানীয় পর্যায়ের পুলিশের রাজনৈতিক মতাদর্শনির্ভর “ওভার রিঅ্যাক্ট”-এর বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি হতে পারে। কিন্তু কাজের কাজ তো কিছুই হচ্ছে না।
সিপিজের বক্তব্য পরিষ্কার, সাংবাদিকরা আইনের ঊর্ধ্বে নয়, বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে তদন্ত ও বিচার হতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই প্রমাণের মানদণ্ড এখন কারা ঠিক করছে? চারজন সাংবাদিক প্রায় দুই বছর ধরে জেলে, চার্জশিট পর্যন্ত নেই, অথচ সরকারের কোনো মহল থেকে এই স্বেচ্ছাচারিতার ব্যাখ্যা বা প্রতিকার নিয়ে একটি বাক্যও শোনা যায়নি। এটা কি তবে ২০০১-০৬ সালের সেই অন্ধকার সময়ের প্রত্যাবর্তন? সেই কুশাসনের রেশ আবারো কি থাবা বসিয়েছে সাংবাদিকতার ঘাড়ে?
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নীরবতাও প্রকট। মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলো কি তবে চা আর মুড়ির আড্ডায় মগ্ন? তাদের বিবৃতি, জরুরি আহ্বান, নিন্দাপ্রস্তাব সব যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে। যে স্বেচ্ছাচারিতা, বিনা বিচারে আটকের যে সংস্কৃতি ফিলিস্তিনের বন্দির ভাষায় “জীবিতদের কবরস্থান” হয়ে উঠেছে, তার বিরুদ্ধে সরব হওয়া তো দূরের কথা। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দিয়েছেন কুনাল। আর সে পথ যে মোটেও সহজ নয়, সেটাই তো এই নীরবতার মোড়কে ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠছে।

