৩৪৩টি শিশু মারা গেছে। শুধু হামে। শুধু এই বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত। প্রতিদিন গড়ে কয়েকটা করে শিশু মরছে এমন একটা রোগে, যেটা ঠেকানো যেত। টিকা দিলে ঠেকানো যেত। ভিটামিন এ দিলে ঠেকানো যেত। মায়ের দুধ খাওয়ানোর সুযোগ নিশ্চিত করলে ঠেকানো যেত। কৃমিনাশক ঠিকমতো খাওয়ালে ঠেকানো যেত। কিছুই হয়নি। আর এই না- হওয়ার দায় যার কাঁধে সবচেয়ে বেশি, সেই মুহাম্মদ ইউনূস এখনো জবাবদিহির বাইরে। আর যারা এখন ক্ষমতায় বসে আছে, সেই বিএনপি এই প্রশ্নটাই তুলছে না।
বিষয়টা একটু ভেবে দেখা দরকার। ইউনূস সরকারের আমলে হামের টিকা ক্যাম্পেইন বারবার পিছিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। সেপ্টেম্বরে নেওয়া হয়েছিল, সেটাও হয়নি। ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন নভেম্বর-ডিসেম্বরে হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। কৃমিনাশক বড়ি কেনা ছিল গুদামে, কিন্তু ২০২৫ সালে জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহই পালন করা হয়নি। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ২০১৮ সালে ছিল ৬৫ শতাংশ, সেটা ২০২২ সালে নেমে এসেছে ৫৩ শতাংশে। এই পুরো সময়টায় শিশু স্বাস্থ্যের ভিত একটু একটু করে ভেঙে পড়েছে, আর ইউনূসের সরকার সেটা দেখেও না দেখার ভান করে বসে থেকেছে।
এখন প্রশ্নটা হলো, বিএনপি কোথায়?
১২ ফেব্রুয়ারির যে নির্বাচনের কথা বলে বিএনপি এখন মন্ত্রিসভায় বসে আছে, সেটা নির্বাচন ছিল কিনা সেটা নিয়েই তো গণতন্ত্রমনা মানুষের প্রশ্ন ছিল। দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বাইরে রেখে, জনগণের বিরাট একটা অংশ যে ভোট বয়কট করেছিল, সেটা ছিল মূলত নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার একটা আয়োজন। সেই আয়োজনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপির কাছে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই একটা জবাবদিহি আশা করেছিল, অন্তত সন্তান হারানো মায়েদের পাশে দাঁড়ানোর মতো একটা ন্যূনতম মানবিক দায়িত্ব তো আশা করেছিল।
বিএনপির জন্ম সেনানিবাসে। জিয়াউর রহমান যে দলটা বানিয়েছিলেন, সেটার শুরু থেকেই গণতন্ত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল কেতাবি। ক্ষমতায় থাকলে জবাবদিহি নেই, বিরোধীতে থাকলে সব দোষ সরকারের। এই রাজনীতির ধারাটা বিএনপি বহু বছর ধরে চর্চা করে আসছে। দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া দণ্ডিত, তারেক রহমান দেশের বাইরে থেকে দল চালান, দলের ভেতরে চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এই দলটাই এখন মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছে।
কিন্তু মন্ত্রণালয় সামলানো মানে শুধু চেয়ারে বসে থাকা না। মন্ত্রণালয় সামলানো মানে ইউনূস সরকারের সময়কার ব্যর্থতার জন্য জবাব চাওয়া। কোনো তদন্ত হলো না কেন টিকা কার্যক্রম এত দেরিতে হলো? কার অবহেলায় ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বাতিল হলো? স্বাস্থ্য বাজেটের টাকা কোথায় গেল? এই প্রশ্নগুলো বিএনপি তুলছে না, কারণ ইউনূসকে বিব্রত করতে গেলে হয়তো নিজেদেরও কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি। ৮৫ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। এরা কেউ রাজনীতি বোঝে না। এরা জানে না ইউনূস কে, বিএনপি কী, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মানে কী। এরা শুধু জানে জ্বর আর গায়ে র্যাশ। আর এরপর অনেকে আর কিছুই জানে না।
এই শিশুগুলোর মৃত্যু নিয়ে কেউ ঠিকমতো কথা বলছে না। প্রশাসন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে, সংখ্যা জানাচ্ছে, কিন্তু দায়িত্ব নিচ্ছে না। বিএনপি ক্ষমতায় থেকে ইউনূস আমলের এই স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের জবাব চাইছে না, কারণ সেটা চাইলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তার চেয়ে চুপ থাকা সহজ।
কিন্তু চুপ থাকার একটা দাম আছে। সেই দাম তিনশোর বেশি শিশু ইতিমধ্যে দিয়ে গেছে। আরো কতজন দেবে?

