আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক প্রথা ও বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে কতটা আইনসিদ্ধ?

আয়েশা সোনিয়া
মূলত মানুষের মানবাধিকার দুরকম। একটা অবিচ্ছেদ্য যা কখনো কেড়ে নেওয়া যায় না ও আর একটা বিচ্ছেদ্য আইনগত বিধি নিষেধ সাপেক্ষে যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তদ্রূপ একজন মানুষের রাজনৈতিক অধিকারগুলোও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবিচ্ছেদ্য (Inalienable) মানবাধিকারের অংশ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মূল ভিত্তি হলো যে, এই অধিকারগুলো মানুষের মর্যাদা ও অস্তিত্বের সাথে জন্মগতভাবে জড়িত এবং এগুলো কোনো রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষ কখনো কেড়ে নিতে পারে না।

এই বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃত দলীলে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার কে জাতিসংঘের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিলে রাজনৈতিক অধিকারকে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR) ১৯৪৮ সালে গৃহীত এই দলিলে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, “প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক মত প্রকাশের এবং সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে” এবং এর প্রস্তাবনায় মানবাধিকারকে “অবিচ্ছেদ্য” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইসিসিপিআর (ICCPR) মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে (International Covenant on Civil and Political Rights) ভোটদান, সংগঠন করা এবং জনহিতকর কাজে অংশ নেওয়ার অধিকারকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

আইন অনুযায়ী একজন মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যে মূলত নিচের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত: প্রথমত, ভোটদানের অধিকার সহ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে নিজের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ; দ্বিতীয়ত, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অবিচ্ছেদ্য অধিকার প্রয়োগে মাধ্যমে যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি পদে লড়াই করার অধিকার।

তৃতীয়ত, সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতা হিসেবে প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক দল বা সংগঠন গঠন করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ করার অধিকার। চতুর্থত, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষ ভয়হীনভাবে নিজের রাজনৈতিক মতামত প্রচারের সুযোগ লাভ করার অধিকার।

এই অবিচ্ছেদ্য জন্মগত অধিকারের ও আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদিও এগুলো অবিচ্ছেদ্য অধিকার, তবুও আইন অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে এগুলোর ওপর যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। অনেক সময় জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বা জনস্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে আইন দ্বারা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অধিকার সীমিত করা সম্ভব।

আবার অপরাধের কারণে আদালতের রায়ে কারো নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিতও হতে পারে যেমন নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা ও অযোগ্যতার সুস্পষ্ট আইনী কাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা আইন ও সামাজিক চুক্তিগুলো কখনো মানুষের রাজনৈতিক সত্তা বিকাশের জন্য জন্মগত অধিকারগুলোকে কোন ভাবেই খর্ব করাকে প্রশ্রয় দেয় না এবং যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থীও বটে।

বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নাগরিকের রাজনৈতিক অবিচ্ছেদ্য অধিকার নিয়ে সংবিধানও বেশ সুরক্ষা দিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিষয়টি সাংবিধানিক ভাবে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে আলাপ আসলে প্রথমত যে প্রশ্নটি আসে তা হলো ‘সংবিধান কি রাস্ট্র কে তার নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করার অনুমতি দেয়’? উত্তর হ্যাঁ, তবে তা অনিয়ন্ত্রিত নয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাজনৈতিক অধিকারগুলো নিরঙ্কুশ নয়, বরং “যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ” সাপেক্ষে।

সংগঠনের স্বাধীনতা উল্লেখে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৮ নাগরিকের সমিতি বা সংঘ গঠন করার অধিকার কে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে আবার একি সাথে জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইন দ্বারা এই অধিকারের ওপর কিছু বাধানিষেধ আরোপ করা যায় বলেও সংবিধান বলে দিয়েছে।

অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১ অনুযায়ী বাংলাদেশকে একটি গণতন্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়ে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা এবং মানুষের মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে। মূলত গণতন্ত্র কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাস্ট্রের ভিত্তি ও চর্চা’র মূলকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সংবিধান বারবার রাস্ট্রকে উৎসাহিত করার পাশাপশি দায়বদ্ধও করেছে।

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ (যেমন UDHR) এবং বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত ১৮টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে রাজনৈতিক অধিকারগুলো (যেমন সমাবেশ, সংগঠন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা) অন্তর্ভুক্ত করে নাগরিকের মানবাধিকারের প্রতি সবচেয়ে গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশের সংবিধান। পাশাপাশি অনুচ্ছেদ ১০২ এর মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কে নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতাও দিয়েছে।

আইনের চোখে সকল নাগরিকের সমান অধিকার অনুচ্ছেদ ২৭ ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার অনুচ্ছেদ ৩১ এ উল্লেখিত আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভকে নাগরিকের “অবিচ্ছেদ্য অধিকার” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করতে হলেও তা অবশ্যই প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে এবং নাগরিক দের রাজনৈতিক অধিকার বিভাজন না করে আইনের চোখে সবাই সমান নীতিতে অটল থেকে সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা নৈতিকতার স্বার্থে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সাধারণত আদালত বা উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, যা ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয় বিপরীতে নির্বাহী আদেশে কোন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা কোন ভাবেই আইনসিদ্ধ নয়। যা জুডিশিয়াল রিভিউ এর আওতায় যে কোন সময় আদালত কতৃক বাতিল যোগ্য বলেও গণ্য হবে।

তবে কোনো দল যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, বৈষম্য সৃষ্টি করে অথবা রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসী বা উগ্র জঙ্গি কার্যকলাপে লিপ্ত হয় এবং যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যার মতো জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত হয় তবে সেই সংগঠনের অধিকার খর্ব বা নিষিদ্ধ করার সুযোগ সংবিধানে রাখা হয়েছে।

সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ পরবর্তীতে সংসদ কতৃক অনুমোদিত আইনটির মাধ্যমে সরকার কোনো সত্তার (যেমন রাজনৈতিক দল) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে, বিশেষ করে যদি তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে।

এখন প্রশ্ন হলো এই আইনের আওতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত সরকারি নির্বাহী বিভাগে সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, ঘোষণা, চুক্তি ও বাংলাদেশের সংবিধান আলোকে আইনসিদ্ধ কিনা-আদালতের আদেশ ছাড়া মূলত কারো অধিকার খর্ব করা যায় না। বিচারবিভাগ একমাত্র মাধ্যম যা দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন মানুষের জন্মগত অবিচ্ছেদ্য অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে। এটা শুধু মাত্র বিচার বিভাগের অধিক্ষেত্র। নির্বাহী বিভাগের এমন বেআইনি সিন্ধান্ত অবশ্যই জুডিশিয়াল রিভিউ এর আওতায় বাতিল যোগ্য।

অতএব এই সিন্ধান্তে চূড়ান্ত ভাবে আসা যায় যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে কোন ভাবেই আইনসিদ্ধ না। নির্বাহী বিভাগের এই আদেশ অবশ্যই বাতিল যোগ্য। যার কোন আইনগত দায় নেই, ভিত্তি নেই। ভবিষ্যতে নাগরিকদের অধিকার খর্ব করা নির্বাহী বিভাগের এমন বেআইনি আদেশ ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কি-না সেই প্রশ্নও উঠছে নাগরিক অধিকার সচেতন মহলে।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট, সোস্যাল একটিভিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী।

আয়েশা সোনিয়া
মূলত মানুষের মানবাধিকার দুরকম। একটা অবিচ্ছেদ্য যা কখনো কেড়ে নেওয়া যায় না ও আর একটা বিচ্ছেদ্য আইনগত বিধি নিষেধ সাপেক্ষে যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তদ্রূপ একজন মানুষের রাজনৈতিক অধিকারগুলোও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবিচ্ছেদ্য (Inalienable) মানবাধিকারের অংশ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মূল ভিত্তি হলো যে, এই অধিকারগুলো মানুষের মর্যাদা ও অস্তিত্বের সাথে জন্মগতভাবে জড়িত এবং এগুলো কোনো রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষ কখনো কেড়ে নিতে পারে না।

এই বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃত দলীলে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার কে জাতিসংঘের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিলে রাজনৈতিক অধিকারকে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR) ১৯৪৮ সালে গৃহীত এই দলিলে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, “প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক মত প্রকাশের এবং সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে” এবং এর প্রস্তাবনায় মানবাধিকারকে “অবিচ্ছেদ্য” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইসিসিপিআর (ICCPR) মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক এই আন্তর্জাতিক চুক্তিতে (International Covenant on Civil and Political Rights) ভোটদান, সংগঠন করা এবং জনহিতকর কাজে অংশ নেওয়ার অধিকারকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

আইন অনুযায়ী একজন মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যে মূলত নিচের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত: প্রথমত, ভোটদানের অধিকার সহ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে নিজের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ; দ্বিতীয়ত, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অবিচ্ছেদ্য অধিকার প্রয়োগে মাধ্যমে যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি পদে লড়াই করার অধিকার।

তৃতীয়ত, সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতা হিসেবে প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক দল বা সংগঠন গঠন করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ করার অধিকার। চতুর্থত, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষ ভয়হীনভাবে নিজের রাজনৈতিক মতামত প্রচারের সুযোগ লাভ করার অধিকার।

এই অবিচ্ছেদ্য জন্মগত অধিকারের ও আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদিও এগুলো অবিচ্ছেদ্য অধিকার, তবুও আইন অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে এগুলোর ওপর যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। অনেক সময় জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বা জনস্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে আইন দ্বারা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অধিকার সীমিত করা সম্ভব।

আবার অপরাধের কারণে আদালতের রায়ে কারো নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিতও হতে পারে যেমন নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা ও অযোগ্যতার সুস্পষ্ট আইনী কাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা আইন ও সামাজিক চুক্তিগুলো কখনো মানুষের রাজনৈতিক সত্তা বিকাশের জন্য জন্মগত অধিকারগুলোকে কোন ভাবেই খর্ব করাকে প্রশ্রয় দেয় না এবং যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থীও বটে।

বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নাগরিকের রাজনৈতিক অবিচ্ছেদ্য অধিকার নিয়ে সংবিধানও বেশ সুরক্ষা দিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিষয়টি সাংবিধানিক ভাবে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে আলাপ আসলে প্রথমত যে প্রশ্নটি আসে তা হলো ‘সংবিধান কি রাস্ট্র কে তার নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করার অনুমতি দেয়’? উত্তর হ্যাঁ, তবে তা অনিয়ন্ত্রিত নয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাজনৈতিক অধিকারগুলো নিরঙ্কুশ নয়, বরং “যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ” সাপেক্ষে।

সংগঠনের স্বাধীনতা উল্লেখে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৮ নাগরিকের সমিতি বা সংঘ গঠন করার অধিকার কে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে আবার একি সাথে জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইন দ্বারা এই অধিকারের ওপর কিছু বাধানিষেধ আরোপ করা যায় বলেও সংবিধান বলে দিয়েছে।

অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১ অনুযায়ী বাংলাদেশকে একটি গণতন্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়ে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা এবং মানুষের মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে। মূলত গণতন্ত্র কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাস্ট্রের ভিত্তি ও চর্চা’র মূলকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সংবিধান বারবার রাস্ট্রকে উৎসাহিত করার পাশাপশি দায়বদ্ধও করেছে।

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ (যেমন UDHR) এবং বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত ১৮টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে রাজনৈতিক অধিকারগুলো (যেমন সমাবেশ, সংগঠন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা) অন্তর্ভুক্ত করে নাগরিকের মানবাধিকারের প্রতি সবচেয়ে গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশের সংবিধান। পাশাপাশি অনুচ্ছেদ ১০২ এর মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কে নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতাও দিয়েছে।

আইনের চোখে সকল নাগরিকের সমান অধিকার অনুচ্ছেদ ২৭ ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার অনুচ্ছেদ ৩১ এ উল্লেখিত আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভকে নাগরিকের “অবিচ্ছেদ্য অধিকার” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করতে হলেও তা অবশ্যই প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে এবং নাগরিক দের রাজনৈতিক অধিকার বিভাজন না করে আইনের চোখে সবাই সমান নীতিতে অটল থেকে সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা নৈতিকতার স্বার্থে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সাধারণত আদালত বা উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, যা ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয় বিপরীতে নির্বাহী আদেশে কোন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা কোন ভাবেই আইনসিদ্ধ নয়। যা জুডিশিয়াল রিভিউ এর আওতায় যে কোন সময় আদালত কতৃক বাতিল যোগ্য বলেও গণ্য হবে।

তবে কোনো দল যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, বৈষম্য সৃষ্টি করে অথবা রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসী বা উগ্র জঙ্গি কার্যকলাপে লিপ্ত হয় এবং যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যার মতো জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত হয় তবে সেই সংগঠনের অধিকার খর্ব বা নিষিদ্ধ করার সুযোগ সংবিধানে রাখা হয়েছে।

সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ পরবর্তীতে সংসদ কতৃক অনুমোদিত আইনটির মাধ্যমে সরকার কোনো সত্তার (যেমন রাজনৈতিক দল) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে, বিশেষ করে যদি তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে।

এখন প্রশ্ন হলো এই আইনের আওতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত সরকারি নির্বাহী বিভাগে সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, ঘোষণা, চুক্তি ও বাংলাদেশের সংবিধান আলোকে আইনসিদ্ধ কিনা-আদালতের আদেশ ছাড়া মূলত কারো অধিকার খর্ব করা যায় না। বিচারবিভাগ একমাত্র মাধ্যম যা দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন মানুষের জন্মগত অবিচ্ছেদ্য অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে। এটা শুধু মাত্র বিচার বিভাগের অধিক্ষেত্র। নির্বাহী বিভাগের এমন বেআইনি সিন্ধান্ত অবশ্যই জুডিশিয়াল রিভিউ এর আওতায় বাতিল যোগ্য।

অতএব এই সিন্ধান্তে চূড়ান্ত ভাবে আসা যায় যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে কোন ভাবেই আইনসিদ্ধ না। নির্বাহী বিভাগের এই আদেশ অবশ্যই বাতিল যোগ্য। যার কোন আইনগত দায় নেই, ভিত্তি নেই। ভবিষ্যতে নাগরিকদের অধিকার খর্ব করা নির্বাহী বিভাগের এমন বেআইনি আদেশ ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কি-না সেই প্রশ্নও উঠছে নাগরিক অধিকার সচেতন মহলে।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট, সোস্যাল একটিভিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ