২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ইউনূসের নেতৃত্বে যে নজিরবিহীন ‘মবোৎসব’ শুরু হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন দেশের মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক এই মব-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা শিক্ষার্থীদের উসকে দিয়ে শিক্ষকদের ওপর যে বর্বরতা চালিয়েছে, তাকে শিক্ষক সমাজ ‘মবগুরু’ ইউনূস সরকারের প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী মাত্র তিন মাসে অন্তত তিন হাজার শিক্ষক সরাসরি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৭০০ শিক্ষকের বেতন-ভাতা এখনো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। জীবনের নিরাপত্তার অভাবে এবং স্থানীয় চাপের মুখে দুই হাজারেরও বেশি শিক্ষক আজও নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।
শিক্ষক নিগ্রহের সবচেয়ে ভয়ংকর চিত্র দেখা গেছে বরিশালের গৌরনদীতে। সেখানে ‘মাহিলাড়া এএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীকে সপরিবারে অবরুদ্ধ করে হত্যার চেষ্টা চালায় শতাধিক ব্যক্তি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই বীভৎসতা সরাসরি প্রচার হওয়ায় সেনাবাহিনী গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। অন্যদিকে, নোয়াখালীর নরোত্তমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইউনুস নবীর গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলে মারধর করে স্থানীয় মব বাহিনী।
রাজধানীর উত্তর কাফরুল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাম্মী আক্তারের হাত ও ওড়না ধরে টানাটানি করে ছাত্র ও বহিরাগতরা তাকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে। ঐতিহবাহী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজেও একই চিত্র দেখা গেছে। অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী এবং সহকারী অধ্যাপক ফারহানা খানমকে ৫ ঘণ্টা আটকে রেখে লাঞ্ছিত করার পর পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ধামরাইয়ের শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম এবং বরিশালের কণিকা মুখার্জীদের মতো অসংখ্য শিক্ষককে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে অপমানজনকভাবে বিদায় করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পদ দখলের নেশায় মত্ত কতিপয় শিক্ষক এবং স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে এই ‘মব’ তৈরি করেছিল। প্রশাসনিক পদ দখল আর দুর্নীতির অভিযোগের দোহাই দিয়ে নিরপরাধ শিক্ষকদের করা হয়েছে সামাজিকভাবে অপদস্থ।
তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এই পরিস্থিতিকে ‘চর দখলের মতো প্রতিষ্ঠান দখল’ বলে স্বীকার করলেও, বাস্তবে শিক্ষকদের রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ইউনূস প্রশাসন। প্রশাসনের এই নীরবতা এবং নিষ্ক্রিয়তার ফলেই মবকারীরা আরও উগ্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ফলে সম্মান ও জীবিকা হারিয়ে আজ কয়েক হাজার শিক্ষক অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

