দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মানবিকতা ও আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জুলাই দাঙ্গার একটি মামলায় দেড় মাসের দুধের শিশুকে নিয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে যুব মহিলা লীগ কর্মী শিল্পী বেগমকে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) ঢাকার সিএমএম আদালত শিল্পী বেগমের জামিন আবেদন নাকচ করে দিলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়, যা দেখে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও আইনজীবীরাও স্তব্ধ হয়ে পড়েন।
মঙ্গলবার দুপুরে যখন শিল্পী বেগমকে এজলাসে তোলা হয়, তখন তার কোলে ছিল মাত্র ১ মাস ১৬ দিন বয়সী কন্যাসন্তান। শিল্পীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফারজানা ইয়াসমিন রাখি আদালতে জানান, গত মাসের ৪ তারিখে অস্ত্রোপচারের (সিজার) মাধ্যমে এই শিশুর জন্ম হয়েছে। শিল্পী বেগম নিজেও অসুস্থ; বাথরুমে পড়ে তার বাম হাত ভেঙে গেছে। এই অবস্থায় দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে তার পক্ষে জীবনযাপন করা অসম্ভব। কিন্তু ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ সব যুক্তি উপেক্ষা করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
জামিন নাকচের খবর শুনে আদালত কক্ষেই কান্নায় ভেঙে পড়েন শিল্পী বেগম। হাজতখানায় যাওয়ার সময় আর্তনাদ করে তিনি বলছিলেন, “সিজারের কাটা জায়গায় এখনো ব্যথা। হাতে সমস্যার কারণে বাচ্চাকে ঠিকমতো ধরতেই পারি না। জেলখানায় গরমে আমার বাচ্চাটা মরে যাবে। রাজনীতির কারণে আজ আমার এই অবস্থা।” নিজের অসহায়ত্ব দেখে তিনি একপর্যায়ে শিশুটিকে স্বজনদের কাছে রেখে যেতে চাইলেও পুলিশি বাধায় তা সম্ভব হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী ‘বাচ্চাসহ কাস্টডি’ লিখে মা ও শিশুকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
শিল্পীর স্বামী রহিম হোসেন সোহাগ জানান, তাদের ঘরে তিন ছেলের পর এই কন্যাসন্তানের জন্ম। কেবল মা ও নবজাতকই নয়, ঘরে থাকা বাকি সন্তানরাও এখন দিশেহারা। তাদের সাড়ে চার বছরের ছোট ছেলের হাতে গত শনিবারই অপারেশন হয়েছে। একদিকে অসুস্থ সন্তান, অন্যদিকে দেড় মাসের শিশুসহ স্ত্রীর কারাবাস—সব মিলিয়ে পরিবারটি এখন চরম সংকটে। শিল্পীর খালা সুমি খানম আক্ষেপ করে বলেন, “ডাক্তার ওকে চার মাস বিশ্রামে থাকতে বলেছিলেন। ও তো ঠিকমতো বসতেই পারে না, বাচ্চার যত্ন নেবে কীভাবে?”
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে একজন প্রসূতি মা ও দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কারাগারে পাঠানোর এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অপরাধের বিচার অবশ্যই হবে, কিন্তু দেড় মাসের শিশুর মৌলিক অধিকার ও মানবিক দিক বিবেচনায় জামিন না দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এই ঘটনা বর্তমান শাসনামলের এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

