বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা আজ এক জটিল ও দুঃখজনক সংকটের মুখোমুখি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই দাঙ্গার সেই অস্থির দিনে মেহেরপুরের মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্রসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ ও স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। অথচ এই স্থাপনাগুলো শুধু ইট-পাথরের নির্মাণ নয়, বরং এক জাতির আত্মত্যাগ ও মুক্তির গৌরবময় ইতিহাসের প্রতীক। প্রায় দেড় বছর পরও সেই ভাঙা হাত, গুঁড়িয়ে দেওয়া রাইফেল, আঘাতের চিহ্ন বহনকারী ভাস্কর্যগুলো পড়ে আছে অমেরামত অবস্থায়। প্রশ্ন জাগে, যারা এই ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ আজ ক্ষমতার আসনে বসে থেকে কেন মুক্তিযুদ্ধের এসব স্মারক পুনঃস্থাপনে উদাসীন?
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ১১৩টি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভাঙচুরের শিকার হয়েছে, যার সংস্কারে প্রয়োজন প্রায় ২০ কোটি টাকার বেশি। অথচ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ বরাদ্দের উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি সবকিছু জেনে বুঝে পরে বলবেন। কিন্তু এই ‘পরে’ বলতে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে, সেটা আজও অনিশ্চিত।
যশোরের বাঘারপাড়ায় স্বাধীনতা চত্বর ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুরের পর সেখানে দোকান উঠেছিল স্থানীয় বিএনপি নেতাদের উদ্যোগে। পরে তা সরিয়ে নেওয়া হলেও এখনো সেখানে ইজিবাইক ও পণ্যসামগ্রী রাখার স্থান হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। শহীদ পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ সেখানে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস উদযাপন করতেন সেই জায়গাটি আজ স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন এক বাণিজ্যিক স্থানে পরিণত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হোসেন বিশ্বাসের ভাষায়, এই ধ্বংস দেখে তিনি হতবাক ও কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর এ কষ্টের প্রতিকার কে করবে?
এক সময় আওয়ামী লীগ সরকার দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স গড়ে তোলে, যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা মিলিত হতেন, গল্প করতেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতেন। আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করে না, এটি আজ প্রমাণিত সত্য। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, মুজিবনগর সরকার, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ – এই সবকিছুর ধারক ও বাহক আওয়ামী লীগ। যারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভাঙচুর চালিয়েছে, তারাই আজ সরকার ও বিরোধী দল। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা বিএনপি কেন মুক্তিযুদ্ধের এসব স্মারক সংস্কার করছে না? তারা কি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চায়?
মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো ভাঙার ঘটনা শুধু কিছু স্থাপনা ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও দেশের স্বাধীনতা অর্জনের সেই চেতনার ওপর সরাসরি আঘাত। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে কাটাকাটি, ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধের সত্যকে ঢাকা দেওয়ার যে প্রবণতা গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে এসব কিছুই পরিকল্পিত। যারা এই পরিকল্পনার অংশ, তারা আজ অথবা কালকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আসবে অবধারিতভাবেই।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। এ দেশের মানুষ রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে অর্জন করেছে এই স্বাধীনতা। ভাস্কর্যগুলো ইতিহাসের সাক্ষী। আজ যদি আমরা সেই সাক্ষ্যগুলোকে উপেক্ষা করি, যদি ভাঙা ভাস্কর্য মেরামত না করি, যদি ভাঙচুরকারীদের বিচার না করি, তাহলে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে নিজেদের দাবি করা দলগুলোর উচিত ছিল প্রথম দিনেই এসব ভাস্কর্য সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া। কিন্তু তা হয়নি। এখনও হয়নি।

