১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর-রাজাকাররা বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার যে চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছিল, তার ক্ষতচিহ্ন আজও বয়ে বেড়াচ্ছে ঢাকার রায়েরবাজার ও মিরপুরের বধ্যভূমিগুলো। তবে এই বধ্যভূমিগুলোর ব্যবহার কেবল ডিসেম্বরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ২৫শে মার্চের পর থেকেই ঢাকার এই নির্জন স্থানগুলোকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল গণহত্যার ভাগাড় হিসেবে।
ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরের উপকণ্ঠে অবস্থিত রায়েরবাজারের ইটখোলাটি ছিল একাত্তরের সবচেয়ে ভয়ংকর বধ্যভূমি। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে যখন চারদিকে বিজয়ের ঘ্রাণ, তখন তালিকা ধরে ধরে ধরে আনা হয়েছিল দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের—শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের। ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের পর সেখানে পাওয়া যায় ড. আলিম চৌধুরী, ড. ফজলে রাব্বি, সাংবাদিক সেলিনা পারভীনসহ অসংখ্য বর্ধিষ্ণু মানুষের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ। তাঁদের চোখ বেঁধে, হাত পেছনে বেঁধে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
মিরপুর ছিল তখনকার সময়ে এক আতঙ্কের জনপদ। এখানকার ‘জল্লাদখানা’ বধ্যভূমি এবং শিয়ালবাড়ী এলাকাটি হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানি ঘাতকদের প্রধান কসাইখানা। বিহারি ও রাজাকারদের সহযোগিতায় প্রতিদিন ট্রাক বোঝাই করে বাঙালিদের এখানে আনা হতো। মিরপুরের অগণিত কুয়া এবং পরিত্যক্ত পানির ট্যাংকে পাওয়া গেছে শত শত মানুষের মাথার খুলি ও কঙ্কাল। বিশেষ করে মিরপুর ১২ নম্বর এবং ১০ নম্বর সেকশনের জলাভূমিগুলো ছিল রক্তের সাগরে নিমজ্জিত।
মিরপুরের মুসলিম বাজার বধ্যভূমিটি আবিষ্কৃত হয়েছিল অনেক পরে, ১৯৯৯ সালে একটি মসজিদের সংস্কার কাজের সময়। সেখানে মাটির নিচ থেকে শত শত মানুষের হাড় ও খুলি বেরিয়ে আসে, যা প্রমাণ করে একাত্তরে এখানে কী পরিমাণ গণহত্যা চালানো হয়েছিল। এছাড়া মিরপুরের কালশীতে হারুন মোল্লা ঈদগাহ মাঠ ছিল আরেকটি বধ্যভূমি, যেখানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল।
ঢাকার এই বধ্যভূমিগুলো কেবল হত্যার স্থান ছিল না, এগুলো ছিল বাঙালির পরিচয় মুছে ফেলার এক জঘন্য প্রচেষ্টা। রায়েরবাজারের সেই কাদা আর মিরপুরের সেই ঝোপঝাড় আজও সাক্ষ্য দেয়—কীভাবে একটি জাতিকে পঙ্গু করে দিতে দেশের মস্তিষ্ক বা বুদ্ধিজীবীদের টার্গেট করা হয়েছিল।

