আবারো সংকটে জাতি, আবারো তিনিই প্রেরণা

এম. নজরুল ইসলাম :
কিছু নাম আছে, অবিনশ্বর, যা মুছে ফেলা অসম্ভব। কিছু অবয়ব আছে, ভালোবাসায় হদয়ে ঠাঁই হয়, ফ্রেমে আটকানোর প্রয়োজন হয় না। কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা সাহসের প্রতীক, কোটি মানুষকে উজ্জীবিত করতে পারেন। কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জন্মই হয় দেশ ও জাতির জন্য, নিঃশেষে তাঁরা নিজেকে উৎসর্গ করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তেমন একটি নাম, তেমন একজন মানুষ। সে কারণেই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় আমরা পাই, ‘…মানুষ হয়ে জন্মলাভ করে আরাম চাইবে কে, বিশ্রাম পাব কোথায়। মুক্তি পেতে হবে, মুক্তি দিতে হবে, এই-যে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য’- এ কথাগুলো যে মহান বাঙালির জীবনে ধ্রুব সত্য হয়ে দেখা দিয়েছিল, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর উপমা কেবলই তিনি নিজে।

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ ১৭ মার্চ, তাঁর ১০৬তম জন্মদিন। একটি দেশ, একটি জাতি, একটি পতাকা- এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯২০ সালের এই দিনে তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার নিভৃত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম।

গ্রামবাংলার সবুজ শ্যামল ও নিবিড় প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা শেখ মুজিব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন রাজনীতি ও সমাজ সচেতন- তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও বিশ্লেষকদের লেখায় এর প্রমাণ আমরা পাই।

বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা। তাঁর নামে পরিচালিত হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধ তো এক দিনের ব্যাপার নয়। হাজার বছরের পরাধীন জাতিকে একটি যুদ্ধের জন্য, একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য, একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তার জন্য তিল তিল করে তৈরি করতে হয়েছে। প্রয়োজন হয়েছে রাজনৈতিক প্রস্তুতির। জাতিকে তৈরি করতে হয়েছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে। দীর্ঘ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে এই স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি ছিলেন সেই সংগ্রামের মহানায়ক।

বাঙালি জাতি শোষিত হয়েছে, বঞ্চিত হয়েছে, নিপীড়িত হয়েছে, জীবন দিয়েছে, তবু হার মানেনি। নিজের পরিচয় বিসর্জন দেয়নি। বারবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আঘাত এসেছে। দমন করা হয়েছে। তবু, তারা স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বাকে ত্যাগ করেনি। বাঙালি জাতিসত্ত্বা বজায় রাখার জন্য বারবার তারা সংগ্রামী হয়েছে।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের কাছে পাকিস্তানের শাসক দল মুসলিম লীগের চরম ভরাডুবি ঘটে। বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির এই বিজয়কে মেনে নিতে না পেরে ৯২-ক ধারা জারি করে এবং যুক্তফ্রন্টের সরকার ভেঙে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলের একটি কনভেনশনে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তিসনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। ওই ছয় দফা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত কাঁপিয়ে দেয়। শেখ মুজিবের কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে জেনারেল আইয়ুব খান একটির পর একটি মামলা দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে থাকেন। পূর্ব পাকিস্তানে ছয় দফার পক্ষে ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। সেই সময় রাজনীতির প্রধান আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে ছয় দফা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সঙ্গীদের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে একটি মিথ্যা মামলা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। জেনারেল আইয়ুবের এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় গোটা বাঙালি জাতি। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালি তাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্ত করে আনে। বাঙালি জাতি তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করে।

এরপর যে ইতিহাস রচিত হলো, সে ইতিহাস সবারই জানা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা, ‘এবারের সংগ্রাম,স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অতঃপর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

দিন নেই, রাত নেই, এই বাংলার শ্যামল প্রান্তরে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর কথায় আশ্চর্য এক জাদু ছিল। আকৃষ্ট করতে পারতেন মানুষকে। ভালোবাসতেন দেশের মানুষকে। তাঁর চিন্তা ও চেতনা জুড়ে ছিল বাংলা ও বাঙালি। আজীবন বাঙালির কল্যাণ চিন্তা করেছেন। বাঙালিকে বিশ্বের একটি মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। জাতিকে তিনি সেই মর্যাদার স্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তিনি বাঙালি জাতিকে একটি অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সর্বজনীন ও সর্বকালীন বাঙালি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘যাঁর আকর্ষণে মানুষের চিন্তায় ভাবে কর্মে সর্বজনীনতার আবির্ভাব’- তিনি ছিলেন তেমনই একজন।

মৃত্যুকে পরোয়া না করে নির্ভয়ে পথ চলার উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সত্যকে ধারণ করেছিলেন বুকে। আমরা কী করে ভুলে যাই, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে তাঁর সেই উচ্চারণ, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’ আজ এতদিন পরও প্রাসঙ্গিক সেই বাক্যটি। সত্যিই তো বাংলার মানুষ আজও মুক্তি চায়।

নানা ছলে রাজাকার-আলবদরদের ফিরে আসা, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকে কোনঠাঁসা করে রাখা, অবিরাম চোখ রাঙানি ও নিষ্ঠুরতা থেকে মানুষ আবারো মুক্তি চায়। মব ভায়োলেন্স থেকে মুক্তি চায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরে চায়। ধ্বংসের মুখে চলে যাওয়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধার চায়।

সাতই মার্চের ভাষণের শেষার্ধে তাঁর উচ্চারণ ছিল, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।’ আজকের এই সংকটকালে আবারও আমাদের একইভাবে প্রস্তুত হতে হবে। প্রস্তুত থাকতে হবে। আমাদের নতুন করে শুরু করতে হবে ‘মুক্তির সংগ্রাম।’

স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করি পরম শ্রদ্ধায়। সব সংকটে তিনিই তো প্রেরণা আমাদের।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক।

এম. নজরুল ইসলাম :
কিছু নাম আছে, অবিনশ্বর, যা মুছে ফেলা অসম্ভব। কিছু অবয়ব আছে, ভালোবাসায় হদয়ে ঠাঁই হয়, ফ্রেমে আটকানোর প্রয়োজন হয় না। কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা সাহসের প্রতীক, কোটি মানুষকে উজ্জীবিত করতে পারেন। কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জন্মই হয় দেশ ও জাতির জন্য, নিঃশেষে তাঁরা নিজেকে উৎসর্গ করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তেমন একটি নাম, তেমন একজন মানুষ। সে কারণেই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় আমরা পাই, ‘…মানুষ হয়ে জন্মলাভ করে আরাম চাইবে কে, বিশ্রাম পাব কোথায়। মুক্তি পেতে হবে, মুক্তি দিতে হবে, এই-যে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য’- এ কথাগুলো যে মহান বাঙালির জীবনে ধ্রুব সত্য হয়ে দেখা দিয়েছিল, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর উপমা কেবলই তিনি নিজে।

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ ১৭ মার্চ, তাঁর ১০৬তম জন্মদিন। একটি দেশ, একটি জাতি, একটি পতাকা- এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯২০ সালের এই দিনে তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার নিভৃত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম।

গ্রামবাংলার সবুজ শ্যামল ও নিবিড় প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা শেখ মুজিব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন রাজনীতি ও সমাজ সচেতন- তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও বিশ্লেষকদের লেখায় এর প্রমাণ আমরা পাই।

বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা। তাঁর নামে পরিচালিত হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধ তো এক দিনের ব্যাপার নয়। হাজার বছরের পরাধীন জাতিকে একটি যুদ্ধের জন্য, একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্য, একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তার জন্য তিল তিল করে তৈরি করতে হয়েছে। প্রয়োজন হয়েছে রাজনৈতিক প্রস্তুতির। জাতিকে তৈরি করতে হয়েছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে। দীর্ঘ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে এই স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি ছিলেন সেই সংগ্রামের মহানায়ক।

বাঙালি জাতি শোষিত হয়েছে, বঞ্চিত হয়েছে, নিপীড়িত হয়েছে, জীবন দিয়েছে, তবু হার মানেনি। নিজের পরিচয় বিসর্জন দেয়নি। বারবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আঘাত এসেছে। দমন করা হয়েছে। তবু, তারা স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বাকে ত্যাগ করেনি। বাঙালি জাতিসত্ত্বা বজায় রাখার জন্য বারবার তারা সংগ্রামী হয়েছে।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের কাছে পাকিস্তানের শাসক দল মুসলিম লীগের চরম ভরাডুবি ঘটে। বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির এই বিজয়কে মেনে নিতে না পেরে ৯২-ক ধারা জারি করে এবং যুক্তফ্রন্টের সরকার ভেঙে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলের একটি কনভেনশনে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তিসনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। ওই ছয় দফা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত কাঁপিয়ে দেয়। শেখ মুজিবের কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে জেনারেল আইয়ুব খান একটির পর একটি মামলা দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে থাকেন। পূর্ব পাকিস্তানে ছয় দফার পক্ষে ব্যাপক গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। সেই সময় রাজনীতির প্রধান আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে ছয় দফা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সঙ্গীদের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে একটি মিথ্যা মামলা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। জেনারেল আইয়ুবের এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় গোটা বাঙালি জাতি। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালি তাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্ত করে আনে। বাঙালি জাতি তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করে।

এরপর যে ইতিহাস রচিত হলো, সে ইতিহাস সবারই জানা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা, ‘এবারের সংগ্রাম,স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অতঃপর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

দিন নেই, রাত নেই, এই বাংলার শ্যামল প্রান্তরে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর কথায় আশ্চর্য এক জাদু ছিল। আকৃষ্ট করতে পারতেন মানুষকে। ভালোবাসতেন দেশের মানুষকে। তাঁর চিন্তা ও চেতনা জুড়ে ছিল বাংলা ও বাঙালি। আজীবন বাঙালির কল্যাণ চিন্তা করেছেন। বাঙালিকে বিশ্বের একটি মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। জাতিকে তিনি সেই মর্যাদার স্থানে অধিষ্ঠিত করেছেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তিনি বাঙালি জাতিকে একটি অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সর্বজনীন ও সর্বকালীন বাঙালি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘যাঁর আকর্ষণে মানুষের চিন্তায় ভাবে কর্মে সর্বজনীনতার আবির্ভাব’- তিনি ছিলেন তেমনই একজন।

মৃত্যুকে পরোয়া না করে নির্ভয়ে পথ চলার উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সত্যকে ধারণ করেছিলেন বুকে। আমরা কী করে ভুলে যাই, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে তাঁর সেই উচ্চারণ, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়।’ আজ এতদিন পরও প্রাসঙ্গিক সেই বাক্যটি। সত্যিই তো বাংলার মানুষ আজও মুক্তি চায়।

নানা ছলে রাজাকার-আলবদরদের ফিরে আসা, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকে কোনঠাঁসা করে রাখা, অবিরাম চোখ রাঙানি ও নিষ্ঠুরতা থেকে মানুষ আবারো মুক্তি চায়। মব ভায়োলেন্স থেকে মুক্তি চায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরে চায়। ধ্বংসের মুখে চলে যাওয়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধার চায়।

সাতই মার্চের ভাষণের শেষার্ধে তাঁর উচ্চারণ ছিল, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।’ আজকের এই সংকটকালে আবারও আমাদের একইভাবে প্রস্তুত হতে হবে। প্রস্তুত থাকতে হবে। আমাদের নতুন করে শুরু করতে হবে ‘মুক্তির সংগ্রাম।’

স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করি পরম শ্রদ্ধায়। সব সংকটে তিনিই তো প্রেরণা আমাদের।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ