টেকনাফের ঘটনাটা পড়ে প্রথমে মনে হলো, এটা কি ২০০২-২০০৬ সালের কোনো পুরনো খবর? র্যাব একজন তিনটি হত্যা মামলার পলাতক আসামিকে ধরতে গেছে, আর তাকে ছিনিয়ে নিতে দলীয় ক্যাডাররা মব বানিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। না, এটা পুরনো খবর না। এটা ২০২৬ সালের মার্চ মাসের বাংলাদেশ। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে যা দেখছি, তাতে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের দুঃস্বপ্নটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
ফরিদুল আলম টেকনাফ সদর ইউনিয়ন বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি। দশটি মামলার আসামি। তিনটি হত্যা মামলায় পলাতক। এই লোককে যখন র্যাব ধরতে গেল, তার দলের লোকজন রাস্তায় নেমে আইনের হাত থেকে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করল। এটাই বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দলের স্বেচ্ছাসেবা, বুঝলেন? দেশের সেবা না, দলের খুনি-সন্ত্রাসীদের সেবা।
বিএনপি দলটার জন্মই হয়েছিল সেনানিবাসে। জিয়াউর রহমান গণতন্ত্রের পথে আসেননি, তিনি ক্ষমতায় বসেছিলেন বন্দুকের নলের জোরে। এরপর নিজের ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে একটা দল বানালেন, একটা নির্বাচন সাজালেন যেখানে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো ছিল না, আর নিজেই জিতে গেলেন। সেই ধারাটা দলের ডিএনএতে এতটাই গেঁথে গেছে যে আজও বিএনপি ক্ষমতায় এলেই একই ছবি দেখা যায়। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে তারা কী করেছিল সেটা এই দেশের মানুষ ভুলে যায়নি। সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন, নারীদের উপর নির্যাতন, বিরোধী দলের কর্মীদের হত্যা। হাওয়া ভবন বানিয়ে দেশের অর্থনীতি আর রাজনীতি দুটোকেই এক জায়গা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা।
১২ ফেব্রুয়ারির যে নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে, সেটাকে নির্বাচন বলতেই লজ্জা লাগছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বাইরে, জনগণ ভোটকেন্দ্রে যায়নি, আর সেই শূন্য মাঠে গোল দিয়ে নিজেদের জয়ী ঘোষণা করা হলো। এই প্রক্রিয়াটা জিয়ার সেই পুরনো কৌশলেরই আধুনিক সংস্করণ। গণতন্ত্রের মুখোশ পরে কর্তৃত্বের খেলা। কিন্তু মুখোশটা খুব পাতলা হয়ে গেছে, টেকনাফের ঘটনার মতো প্রতিটা ঘটনায় সেটা আরেকটু খসে পড়ছে।
এখন ভাবুন, র্যাবকে যদি একটা হত্যা মামলার আসামি ধরতে গিয়ে মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়ার মুখে পড়তে হয়, তাহলে একজন সাধারণ মানুষ যদি বিএনপির কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে থানায় যায়, তার কী হবে? এলাকার স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি যদি তিনটি হত্যা মামলা মাথায় নিয়ে দলীয় পরিচয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন, তাহলে সেই এলাকার সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?
২০০১ থেকে ২০০৬, এই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে কী হয়েছিল সেটা এই দেশের ইতিহাসের একটা কালো অধ্যায়। সেই সময়টার কথা মনে পড়লে এখনও গা শিউরে ওঠে। বিএনপির ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের নামে যে সন্ত্রাস চলেছিল, চাঁদাবাজি চলেছিল, সেটা দেখতে দেখতে একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে এই আতঙ্কের মধ্যে। সেই প্রজন্ম আজও বেঁচে আছে, তাদের স্মৃতি এখনও তাজা। টেকনাফের ঘটনাটা সেই পুরনো ক্ষতের উপরেই লবন ছিটালো।
বিএনপি এই ঘটনায় কী বলেছে? কোনো নিন্দা? কোনো বিবৃতি? খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ এটাই তাদের রাজনীতির স্বাভাবিক চেহারা। দলীয় ক্যাডারদের আইনের বাইরে রাখাটা তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় নীতির মতোই কাজ করে। আর যতদিন এই সংস্কৃতি চলবে, ততদিন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কাগজেই থাকবে, বাস্তবে না।

