১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল বাঙালি জাতির সহস্র বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তাল এবং মহিমান্বিত সময়। ৭ মার্চের সেই কালজয়ী ভাষণের পর থেকে গোটা পূর্ব পাকিস্তান চলত কেবল একটি নাম এবং একটি তর্জুনির ইশারায়—তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ ১৪ মার্চ; ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালির অসহযোগ আন্দোলন এমন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি সেদিন একাত্ম হয়ে বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছিল যে, জনসমর্থন থাকলে কীভাবে একটি নিরস্ত্র জাতি রাষ্ট্রক্ষমতার সমান্তরাল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
১৪ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের চতুর্দশ দিন। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক নতুন নির্দেশনামা জারি করেন। ৩৫ দফা সংবলিত এই নির্দেশনাবলি ছিল মূলত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা। খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ রাখা থেকে শুরু করে ব্যাংক, অফিস-আদালত এবং শিল্প-কারখানা কীভাবে চলবে—তার স্পষ্ট ঘোষণা ছিল সেখানে। পাকিস্তান সরকারের কোনো আদেশ সেদিন কার্যকর ছিল না; বরং সরকারি সচিব থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মচারী—সবাই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে আসা নির্দেশের অপেক্ষায় থাকতেন। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি সেদিন প্রমাণ করেছিল, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কেবল অস্ত্রের জোরে নয়, বরং জনগণের ভালোবাসার জোরেই সম্ভব।
১৪ মার্চের আকাশ-বাতাস ছিল “জয় বাংলা” স্লোগানে মুখরিত। বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে এদিন বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং ছাত্রসমাজ ঢাকার রাজপথে মিছিল বের করেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার প্রতিবাদে এবং স্বাধীনতার দাবিতে বাঙালির এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল মূলত একটি স্বাধীন দেশের আগাম ঘোষণা। পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টো এদিন ঢাকায় আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেও বাঙালি জাতি তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাঙালির ভাগ্য এখন আর রাওয়ালপিন্ডি বা করাচিতে নির্ধারিত হবে না, হবে এই পল্টনের মাটিতে।
১৪ মার্চের সেই গোধূলি বেলায় প্রতিটি বাঙালি পরিবার ছিল একেকটি দুর্গ। বঙ্গবন্ধু তাঁর নির্দেশনায় দেশবাসীকে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। ছাত্রনেতারা রাজপথে কুচকাওয়াজের মাধ্যমে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতির এই যে অভূতপূর্ব মেলবন্ধন, তা আসন্ন ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।
আজ ২০২৬ সালের ১৪ মার্চে দাঁড়িয়ে আমরা যখন একটি উন্নয়নশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক, তখন পেছনে ফিরে তাকালে সেই অবিনাশী দিনগুলো আমাদের শিহরিত করে। বঙ্গবন্ধু যে ‘সোনার বাংলা’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সেই উত্তাল মার্চে, আজ তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতি এক ও অভিন্ন সত্তা। ১৪ মার্চের সেই দৃপ্ত শপথ আমাদের চিরকাল মনে করিয়ে দেবে যে, ঐক্যবদ্ধ বাঙালিকে দমানোর ক্ষমতা কোনো শক্তির নেই। সেই ত্যাগের মহিমা বুকে ধারণ করে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়াই হোক আজকের দিনে আমাদের পরম অঙ্গীকার।

