বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একদিনের হিসেবে সবচেয়ে বড় গণহত্যা ছিল ২০ মে চুকনগর গণহত্যা। এই দিন মাত্র এক প্লাটুন পাকিস্তানি সেনা ৪ ঘণ্টায় ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে অন্তত ২০ হাজার নিরীহ মানুষকে।
চুকনগর ছিলো সাতক্ষীরা হয়ে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাওয়ার পরিচিত পথ। ভারতের শরনার্থী শিবিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে খুলনা, যশোর, পিরোজপুর, বাগেরহাটসহ কয়েকটি জেলার মানুষ ২০ মে চুকনগরে উপস্থি হয়েছিলেন। এর আগে এপ্রিল মাসের শেষদিক থেকে এই অঞ্চলের বিভিন্ন জেলার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।
সেই নৃশংসতা থেকে যারা বাঁচতে পেরেছিলেন তারাই নিরাপদ আশ্রয়ের আসায় চুকনগর হয়ে ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে আর থাকার স্থান না থাকায় বাজারে, দোকানে, স্কুলের বারান্দায় যে যেখানে পেরেছে রাত কাটিয়েছে। প্রায় ৩০ হাজারের মত মানুষ সেদিন চুকনগরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই সুযোগটাই পাকিস্তান সেনারা লুফে নেয়।
২০ মে দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রায় ১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় নিরবিচ্ছিন্ন ও বাধাহীনভাবে গুলিবর্ষণ করে এক প্লাটুন পাকিস্তানি সৈন্য। দেশীয় রাজাকারদের সহায়তায় তারা গ্রামের ভেতরে ঢুকে হত্যাযজ্ঞ চালায়। নদীর পাড়ে দাঁড় করিয়ে, পুকুরে লুকানো অবস্থায়, নদী সাঁতরে পালানোর সময়, গাছের ডালে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় যেভাবে পেয়েছে সেভাবেই মেরেছে পাকিস্তানিরা। নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ কেউই রেহাই পায়নি।
চুকনগরের গণহত্যার একটি বর্ণনা পাওয়া যায় পাশের গ্রাম রুস্তমপুরের শিক্ষক সরদার মুহাম্মদ নূর আলীর কাছে। তিনি বলেন, ‘সে এক নারকীয় দৃশ্য! ভোলা যায় না। আমাদের এলাকায় প্রায় ৪ মাইলব্যাপী এই হত্যাযজ্ঞ চলে। কিছু লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। দুর্গন্ধ এড়াতে কিছু লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়। এলাকার লোক ২ মাস পর্যন্ত ওই নদীর মাছ খায়নি। ভয়ে লোকজন ৫-৬মাস পর্যন্ত বাজারেও আসেনি।’
পাকিস্তানি বাহিনী চলে যাওয়ার পর একটি ছয় মাসের শিশুকে পাওয়া যায়, মৃত মায়ের স্তন্যপান করছিলো সে। গনহত্যার নীরব সাক্ষী সেই শিশু, রাজকুমারি সুন্দরি, আজও বেঁচে আছে।

