বাংলাদেশের রাজনীতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ও অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো—“মব সন্ত্রাস” বা “মব জাস্টিস” নামের এক অদ্ভুত সামাজিক নৈরাজ্য। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে যখন জনতার একটি দল নিজেই বিচারক, জল্লাদ এবং আইন হয়ে ওঠে—তখন রাষ্ট্রের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এই মব সন্ত্রাস নতুন মাত্রা পায়। তখন অনেকেই অভিযোগ করেছিলেন, সরকার কার্যত চোখ বন্ধ করে ছিল। এমনকি ২০২৫ সালের ১২ জুলাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন—মব জাস্টিসের নামে যারা নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে, তারা কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না? তাদের প্রতি কি সরকারের কোনো প্রচ্ছন্ন মদদ আছে?
সেই প্রশ্ন এখন উল্টো হয়ে ফিরে এসেছে নতুন সরকারের দিকেই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান সরকারের বয়স এখন প্রায় এক মাসের কাছাকাছি। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কি মব সন্ত্রাস কমেছে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি দৃশ্যমানভাবে উন্নত হয়েছে? নাকি আগের মতোই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে জনতার এই বিক্ষুব্ধ সহিংসতা?
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য আশাবাদী বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ দাবি করেছেন—নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবের ঘটনাপ্রবাহ যেন অন্য গল্প বলছে।
যখন একদিকে পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করা হচ্ছে, তখন অন্যদিকে পুলিশের অস্ত্র ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। দুদকের মহাপরিচালকের ফোন ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। খুন, ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনা বেড়ে চলেছে। আর এরই সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকা মব সন্ত্রাস যেন এক নতুন সামাজিক মহামারীতে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মবকারীরা হামলা চালাচ্ছে কিন্তু গ্রেপ্তার হচ্ছেন ভুক্তভোগীরাই। এই প্রবণতা আইনের শাসনের জন্য শুধু বিপজ্জনকই নয়, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাকেও ভেঙে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের এক মন্ত্রীর বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন—দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই শুরু হতে পারে “অপারেশন ক্লিনহার্ট ২.০”।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “অপারেশন ক্লিনহার্ট” একটি অত্যন্ত বিতর্কিত অধ্যায়। অতীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সামরিক সহায়তায় পরিচালিত এই অভিযানের মাধ্যমে বহু অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও কম ওঠেনি। সেই স্মৃতি এখনো রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রশ্ন হলো—যদি সত্যিই “অপারেশন ক্লিনহার্ট ২.০” শুরু হয়, তাহলে তার লক্ষ্যবস্তু কে হবে? মব সন্ত্রাসীরা কি আইনের আওতায় আসবে, নাকি তারা আবারও অদৃশ্য থেকে যাবে? নাকি এই অভিযানও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যেমন “ডেভিল হান্ট” নামে অভিযানের কথা শোনা গিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে—তেমনি কি “ক্লিনহার্ট ২.০”ও শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে? রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, তখন জনতার হাতে আইন চলে যায়। আর যখন জনতার হাতে আইন চলে যায়—তখন সভ্যতার মুখোশ দ্রুত খুলে পড়ে।
বাংলাদেশ এখন সেই বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সরকার যদি সত্যিই আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। অন্যথায় “অপারেশন ক্লিনহার্ট ২.০” হয়তো কাগজে-কলমে থাকবে, কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় চলতেই থাকবে জনতার বিচারের নামে অরাজকতা।

