ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিদায়ী প্রশাসক এজাজ মোহাম্মদ শেষ অফিসের দিন ৩৪টা ফাইলে সই করে গেছেন। কথাটা পড়তে যতটা সহজ লাগছে, ঘটনাটা ততটা সহজ না। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি, যেদিন তার চেয়ার ছেড়ে দেওয়ার কথা সেদিনও এই লোক ৩৪টা ফাইলে সই দিয়ে গেছেন। এই ৩৪টা ফাইলে ঠিক কী ছিল, কোন কোন প্রকল্পের অনুমোদন ছিল, কার কার পকেটে টাকা যাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল, সেটা এখনো পরিষ্কার না। কিন্তু নতুন প্রশাসক এসে যা দেখলেন সেটা পরিষ্কার। কর্পোরেশনের ঘরে মাত্র ২৫ কোটি টাকা, আর মাসের বেতনেই যায় ১৩ কোটি।
১৪৭০ কোটি টাকার টেন্ডার আর ওয়ার্ক অর্ডার দিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ কর্পোরেশনের তহবিলে টাকা নেই। এই দুটো তথ্য পাশাপাশি রাখলে একটাই প্রশ্ন মাথায় আসে, এই ওয়ার্ক অর্ডারগুলো কি সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের জন্য দেওয়া হয়েছিল, নাকি বিদায়ের আগে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল?
এজাজ মোহাম্মদ কে ছিলেন সেটা জানা দরকার। তিনি ইউনুস সরকারের আমলে আসিফ মাহমুদের পছন্দের লোক হিসেবে এই পদে বসেছিলেন। আসিফ মাহমুদ তখন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। অর্থাৎ প্রশাসকের নিয়োগ থেকে শুরু করে তার কাজের তদারকি, পুরোটাই আসিফ মাহমুদের নজরদারিতে হওয়ার কথা। এখন যখন দেখা যাচ্ছে কর্পোরেশনের তহবিল তলানিতে ঠেকেছে আর হাজার কোটি টাকার কাজ বিলি হয়ে গেছে, তখন কেবল এজাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেই হবে না। যার ছায়ায় এই লোক বসেছিলেন, যার আশীর্বাদে কাজ করেছেন, সেই আসিফ মাহমুদকেও জবাব দিতে হবে।
দুদকের তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় একজন ব্যক্তি কীভাবে ঢাকার মতো একটা বড় সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক পদে বহাল থাকেন, এই প্রশ্নের উত্তর ইউনুস সরকার কখনো দেয়নি। জবাবদিহির কোনো সংস্কৃতিই ছিল না সেই সরকারে। সংস্কারের কথা বলতে বলতে যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন, তারা নিজেরা কোন ধরনের সংস্কার করেছেন সেটার প্রমাণ এখন সামনে আসছে একটু একটু করে।
ঢাকা উত্তরের মানুষ ট্যাক্স দেয়, হোল্ডিং ট্যাক্স দেয়, নানা ফি দেয়। এই টাকা কোথায় গেল? রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোনো কিছুর হাল ভালো না। অথচ তহবিল শূন্য। হিসাবটা কিছুতেই মেলে না। এই না মেলা হিসাবের পেছনে কী আছে, সেটা বের করার জন্য পূর্ণ তদন্ত দরকার। শুধু এজাজ না, পুরো প্রশাসনের আমলে কোন খাতে কত টাকা গেছে, কোন ঠিকাদার কত কাজ পেয়েছেন, আর সেই ঠিকাদারদের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের কার কার যোগাযোগ ছিল, পুরো চিত্রটা বেরিয়ে আসা দরকার।
বিএনপি সরকার এখন ক্ষমতায়। এই তদন্তটা হবে কি না সেটা দেখার বিষয়। কারন দুর্নীতির ব্যাপারে তাদের ট্র্যাক রেকর্ডও তো মাশআল্লাহ! কিন্তু তদন্ত না হলে এই ধারা চলতেই থাকবে। প্রতিটা সরকার বিদায়ের আগে শেষবেলায় যা পারে নিয়ে যাবে, আর নতুন সরকার এসে বলবে আগেরজন সব শেষ করে গেছে। এই গল্প ঢাকার মানুষ বহুবার শুনেছে।

