বাংলাদেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা কী? বিএনপির ইতিহাস দেখলে মনে হয় একটাই শর্ত, মানুষটাকে এমন হতে হবে যাতে দেশের মানুষ তার নাম শুনলে আগে হাসে, পরে যেনো নিজেদের পোড়া কপালের কথা ভেবে কাঁদে!
আলতাফ হোসেন চৌধুরী। এই মহান মানুষটি আবিষ্কার করেছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অমোঘ সত্য, খুন হলো প্রাকৃতিক ঘটনা, অপরাধ একটু আলাদা জিনিস। তার আমলে কেউ খুন হলে সেটা যেন বন্যা বা ঝড়ের মতো, আল্লাহর ইচ্ছা, রাষ্ট্রের কিছু করার নেই। শিশু নওশীন মরে গেলে তিনি পরিবারকে বুঝিয়েছিলেন আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে।
অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি দেশের নাগরিকদের সরকারি সম্পদ না ভেবে ঈশ্বরের সম্পদ ভেবেছেন। সরকারের দায় নেই, ঈশ্বরই মালিক, ঈশ্বরই নেবেন। এই দার্শনিক অবস্থান থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদটা আসলে অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু বেতন আর গাড়ি তো দরকার।
লুৎফুজ্জামান বাবর এই তালিকায় আলাদা উচ্চতায়। তিনি কেবল কথায় নয়, চেহারায়ও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই পদের জন্য জ্ঞান না থাকলেও চলে, জেলমাখা খাড়া চুল থাকলেই যথেষ্ট। দেশে তখন সিরিয়াল বোমা হামলা, জঙ্গি সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর বাবর সাহেব মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করছেন “উই আর লুকিং ফর শত্রুজ।” কোথায় খুঁজছেন সেটা অবশ্য বলেননি। পরে আদালত খুঁজে পেয়েছিল, কিন্তু সেটা ভিন্ন গল্প।
তবে এই দুজন মিলে যা পারেননি, অন্তর্বর্তী সরকারের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এককভাবে তা করে দেখিয়েছেন। তাকে একসাথে স্বরাষ্ট্র আর কৃষি দুটো মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়েছিল, এবং তিনি দুটোকে এমনভাবে মিশিয়ে ফেলেছিলেন যে আলাদা করা আর সম্ভব হয়নি। সাংবাদিকরা মব সন্ত্রাস নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি পেঁয়াজের দাম বলতেন। ধর্ষণের ঘটনায় জবাবদিহি চাইলে বলতেন আলুর বাজার স্থিতিশীল। থানা পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞেস করতেন আজকের মেনু কী। মানুষ রাস্তায় পিটিয়ে মারা যাচ্ছে, আর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মাথায় রান্নাঘর। রাত তিনটায় হঠাৎ জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে এমন কথা বললেন যা পরদিন সকালে বললে কেউ পাত্তাও দিত না। কী বলেছিলেন? কেউ মনে রাখেনি। শুধু মনে আছে রাত তিনটা।
এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে এখন এসেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি চৌকস, এটা সত্যি। কিন্তু ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে নির্বাচন হয়েছে সেটা নিয়ে কথা বলার আগে একটু ভাবা দরকার, যে নির্বাচনে মূল বিরোধী দলগুলো নেই, ভোটার নেই, শুধু আছে ফলাফল, সেই নির্বাচন থেকে যে সরকার আসে তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যতই বুদ্ধিমান হোক, জবাবদিহির জায়গাটা কোথায়? যাকে ভোট দেওয়া হয়নি তাকে ভয় পাওয়ার কারণও নেই।
বিএনপির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গল্পটা তাই আসলে কোনো মন্ত্রীর ব্যক্তিগত হাস্যকর বচনের গল্প না। এটা একটা দলের গল্প যারা রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়টাকে বারবার এমন মানুষের হাতে দিয়েছে যারা নাগরিকের জীবনকে হয় ঈশ্বরের সম্পদ মনে করেছে, নয়তো পেঁয়াজের বাজারের সাথে গুলিয়ে ফেলেছে। এটা অদক্ষতা না, এটা অগ্রাধিকার। মানুষের নিরাপত্তা এই দলের তালিকায় কোথায় আছে সেটা তাদের বেছে নেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরাই বলে দেয়।

