শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে দেশজুড়ে আতঙ্কের কালো ছায়ায়। প্রতিমা ভাঙচুর, পূজামণ্ডপে হামলা, আর প্রকাশ্য সড়কে ডাকাতির ঘটনায় দিশেহারা হিন্দু সম্প্রদায়। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দাবি করে মুখে “অল ইজ ওয়েল” বুলি আওড়ানো হলেও বাস্তবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা তলানিতে ঠেকেছে। দেশে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রভাব ও রাজত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন যে লাগামহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে তাদের এই ভূখণ্ডে টিকে থাকা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
পূজা শুরুর আগেই বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এক উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করে জানায়, দেশের অন্তত ৩৪টি স্থানে মণ্ডপ ও প্রতিমায় হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যেই কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মন্দিরে তিনটি প্রতিমা ভাঙচুর করার ঘটনা ঘটে। একইভাবে রাতের আঁধারে পঞ্চগড়েও প্রতিমা ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে গত মঙ্গলবার রাতে। কুষ্টিয়ার মিরপুরে পূজামণ্ডপে যাওয়ার পথে ভ্যানে থাকা চার নারীর সর্বস্ব ও গয়না কেড়ে নেয় একদল মুখোশধারী। গাছের ডাল ফেলে রাস্তা আটকানোর পর সিএনজির যাত্রীদের মোবাইল ফোনসহ সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সড়কে আগে থেকেই নিয়মিত ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসবের রাতে সেখানে ছিল না কোনো পুলিশি পাহারা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পরবর্তীতে গ্রামবাসী ছুটে আসায় ডাকাত দল পালিয়ে যায় এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় অনেক পরে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি-জামাতের রাজত্বে এটাই যেন হিন্দু সংখ্যালঘুদের অবধারিত নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি গৈলার কালী মন্দিরেও চোরেরা লোহার দরজা ভেঙে প্রবেশ করে এবং স্টিলের ট্রাংক ও দানবাক্স ভেঙে সমস্ত অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। জনবিরল বা রাস্তার ধারের মন্দিরগুলোতে পাহারা না থাকায় এসব ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এগুলোকে পাশ কাটানোর সুযোগ থাকলেও, মানবাধিকার সংগঠন ও ঐক্য পরিষদের পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলে।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট ও ঐক্য পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দেশে ১৩৩টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে খুন হয়েছেন ২৫ জন এবং মন্দিরে হামলা ও লুটের ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি। প্রথম ছয় মাসের হিসাব আরও ভয়ঙ্কর—নিহত হয়েছেন ৪৪ জন, যার মাসিক গড় দাঁড়ায় সাতের বেশি। চলতি বছরের মার্চে কুমিল্লার পূজার সময় মন্দিরে বোমা বিস্ফোরণে পুরোহিতসহ পাঁচজন আহত হন। সরকার গঠনের প্রথম মাস পার না হতেই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করতে বাধ্য হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সে সময়ই ঐক্য পরিষদ সতর্ক করেছিল যে, বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পরও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা একবিন্দুও কমেনি।
আজকের বাস্তবতা সেই আশঙ্কারই নির্মম বহিঃপ্রকাশ। একের পর এক মণ্ডপ ভাঙচুর, ডাকাতি আর নৈরাজ্যের মুখে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না আসায় এবং উগ্রবাদী শক্তির আস্ফালন বেড়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এই দেশে কি তবে সত্যিই হিন্দুদের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার দিন ফুরিয়ে আসছে?

