একটা মামলার আলাপ দিয়ে শুরু করা যাক। চট্টগ্রামে জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগে মামলা করলেন বিএনপির এক নেতা। মামলা যুক্তি এতটাই হাস্যকর ছিল যে খোদ বিএনপিই সেই নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করল। অর্থাৎ যে দল আজ রাষ্ট্র ক্ষমতায়, তারাই একসময় স্বীকার করে নিয়েছিল মামলাটা ঠিক হয়নি। অথচ সেই মামলাতেই সন্ন্যাসী চিন্ময় দাস আজ প্রায় দুই বছর ধরে জেলে। যে মামলার জনক নিজের দলই ত্যাজ্য করেছে, সেই মামলার আসামি আজও মুক্ত নন। এই অসংগতির জবাব কি ক্ষমতাসীনদের কাছে আছে?
লালদীঘি ময়দানে যখন চিন্ময় ভাষণ দিচ্ছিলেন, প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নিউমার্কেট চত্বরে একদল তরুণ বাংলাদেশের পতাকার ওপরে, আলাদা স্ট্যান্ডে, গেরুয়া পতাকা তোলে। ভাষণ দিয়েছিলেন একজন, পতাকা তুলেছিল অন্যরা, আর জেলে গেলেন প্রথমজন। এই যুক্তিতে চললে যেকোনো সভার বক্তাকে আশপাশের যেকোনো ঘটনার দায়ে ফেলা যায়।
আদালত পাড়ায় নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে আইনজীবী আলিফ নিহত হলেন, আর সেই হত্যা মামলায়ও গ্রেফতার দেখানো হলো চিন্ময়কে। অথচ আলিফ যখন খুন হন, চিন্ময় তখন পুলিশের প্রিজন ভ্যানে, পুলিশেরই হেফাজতেই আটকাবস্থায় বসে আছেন। রাষ্ট্র নিজেই যাঁকে আটকে রেখেছে, তিনি কীভাবে রাষ্ট্রের চোখের সামনে আরেকজনকে খুন করালেন, সেই ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। প্রহসন বলতে এর চেয়ে ভালো সংজ্ঞা কী হতে পারে?
চিন্ময়ের মা মারা গেছেন। বেঁচে থাকতে তাঁর একটাই চাওয়া ছিল, ছেলের মুখটা একবার দেখা। রাষ্ট্র দেয়নি। খুনের আসামিদেরও অনেক সময় প্রিয়জনের শেষকৃত্যে যেতে দেওয়া হয়, আর এখানে এক মায়ের শেষ আর্জি নাকচ হলো। পুরো দেশকে সাক্ষী রেখে দিনের আলোয় এভাবে একটি সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অপমান করা গেল, আর কারও গায়ে তার আঁচও লাগল না।
এবার আসা যাজ সেই পরিসংখ্যানের গল্পে, যা দিয়ে সরকার প্রমাণ করতে চেয়েছিল হিন্দুরা কত ভালো আছে! গত বছর দেশে মণ্ডপ হয়েছিল ৩৩ হাজার, আগের বছরের চেয়ে দুই হাজার বেশি। সংখ্যাটা সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে দারুণ! কিন্তু একই বছরে এই মণ্ডপগুলোতে ঘুরে ঘুরে অসুরের দাড়ি ছিঁড়ে দিয়ে আসে একদল মোল্লা, কারণ নাকি ওই দাড়ি ইসলামের ভাবমূর্তিতে আঘাত।
মাটির প্রতিমার অসুরের মুখের চুলে যে দেশে ধর্মের অবমাননা খুঁজে পাওয়া যায়, সেখানে মণ্ডপের সংখ্যা দিয়ে নিরাপত্তা মাপা হাস্যকর। সবচেয়ে বড় তামাশা হলো, তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর এসব আয়োজনকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে আয়োজকদেরই গ্রেফতারের হুমকি দিলেন। যাঁরা হামলার শিকার, ধমকটাও খেলেন তারাই।
আর এটাই একমাত্র ঘটনা নয়। দীপু চন্দ্র দাশ। যশোরের অভয়নগরে মতুয়া সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো। কিশোরগঞ্জের হৃদয় রবি দাসের পরিবারও একই ধরনের নির্যাতন ও সামাজিক নিগ্রহের মুখোমুখি হয়েছে।
সরকারি প্রচারণায় যখন দেখা যায় মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির খতিয়ান, তখন মাঠপর্যায়ে বিচারহীনতা, পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা এবং একের পর এক নিপীড়নমূলক ঘটনা অন্য কথা বলে। একটি স্বাধীন দেশে বিচারের নামে প্রহসন এবং সুরক্ষার নামে উদাসীনতা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আত্মবিশ্বাসকে তলানিতে ঠেকিয়েছে। সরকার কি এই অসংগতি ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার অভাব দূর করতে কোনো পদক্ষেপ নেবে, নাকি পরিসংখ্যানের আক্ষরিক প্রচারণাতেই ঢাকা পড়ে থাকবে বাস্তবতার ক্ষত—এখন সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

