শামস-ঈ-নোমান:
আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় তোষণনীতির বলয়ে দেশের নারী ও শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা আজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে নিপতিত হয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। যে রাষ্ট্রে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও জীবনের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের, সেখানে প্রতিদিন ঘরে-বাইরে নারীরা শিকার হচ্ছেন বর্বর নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যার। বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যম, পুলিশ সদর দপ্তর এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেবল ভেঙে পড়েনি, বরং অপরাধীদের জন্য তৈরি হয়েছে এক অভয়ারণ্য। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাজনৈতিক ছত্রছিয়ায় নির্যাতনকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যার সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে নিরীহ নারী ও শিশুদের।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র ফুটে ওঠে। গত বছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাবের সাথে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের তুলনা করলে দেখা যায়, নারী ও শিশুদের ওপর অপরাধের মাত্রা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর যেখানে ৫৫ জন নারী ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছিলেন, সেখানে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই এই সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ৩৪১ জনে। অর্থাৎ, মাসভিত্তিক গড় হিসাবে এ ধরনের নৃশংস অপরাধের ঘটনা বেড়েছে ৯৬৩.৫৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা ও আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার অকার্যকারিতা কতটা প্রকট রূপ ধারণ করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত বছর দেশে মোট ৭৪৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যার মধ্যে ৫৬৯টি ছিল একক ধর্ষণ এবং ১৮০টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। কিন্তু অপরাধের লাগাম টানতে প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই সার্বিকভাবে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে ১২ হাজার ৪৪৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ধর্ষণের অভিযোগেই মামলা হয়েছে ৪ হাজার ২৫টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত শিশুধর্ষণের মামলা দায়ের হয়েছে ১ হাজার ৪৮৫টি। অথচ গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৯৯৮টি এবং তার আগের বছর ছিল ৭৫১টি। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে শিশুধর্ষণের মামলা বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৯৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশে অপরাধীদের শাস্তি পাওয়ার ভয় উঠে গেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা অপরাধ প্রবণতাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে উসকে দিচ্ছে।
নারীরা আজ কেবল রাজপথ বা কর্মক্ষেত্রেই অসুরক্ষিত নন, ঘরের চার দেয়ালের ভেতরেও তাঁদের জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। দেশে আইনের শাসন না থাকায় এবং অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয় ও সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় গৃহস্থালি সহিংসতার মাত্রা সব সীমা অতিক্রম করেছে। সম্প্রতি রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের একটি বাসায় ২৫ বছর বয়সী মুক্তা ইসলাম মাওয়ার ওপর তাঁর স্বামী সোহেল শিকদার যে বর্বর নির্যাতন চালিয়েছেন, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। পায়ে শিকল বেঁধে, খাটের সাথে আটকে রেখে চামড়ার বেল্ট দিয়ে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়েছে এই তরুণীকে। দুই শিশু সন্তান সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়া (৪)-এর কান্নার সামনে মা যখন আকুতি জানিয়েছিলেন কেবল সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে আসার জন্য, তখনও নির্যাতনকারীর হাত থামেনি। রক্তাক্ত জখম করার পর সেই নির্যাতনের ৩ মিনিটের ভিডিও ফুটেজ মুক্তার স্বজনদের মোবাইলে পাঠায় অভিযুক্ত। পরবর্তীতে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলেও দেখা যায়, গত কয়েক বছরে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের ঘটনা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে, যা ২০২৩ সালের ৩ হাজার ৩৪৮টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬২৬টিতে। খিলক্ষেতের ঘটনাটি কেবল একটি উদাহরণ; এটি প্রমাণ করে, রাষ্ট্র যখন নাগরিককে আইনি সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সমাজের ভেতরে এক ধরণের মানসিক বিকৃতি ও উগ্রতার জন্ম নেয়।
সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত অংশ হলো শিশুরা। অথচ বর্তমান শাসনব্যবস্থায় শিশুদের নিরাপত্তাও সম্পূর্ণ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। মাদ্রাসা, স্কুল থেকে শুরু করে সাধারণ দোকান—কোথাওই শিশুরা নিরাপদ নয়। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার একটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলে বর্তমান বিচার ব্যবস্থার দেউলিয়াত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মাত্র ১১ বছরের এক শিশু মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফেরার পথে দোকানে ভাঙ্গতি টাকার জন্য গেলে, তাকে বিস্কুট দেওয়ার ছলে ডেকে নিয়ে পরিত্যক্ত স্থানে ধর্ষণ করে আল আমীন নামের এক ব্যক্তি। শুধু তাই নয়, ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে ভয় দেখিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হতে থাকে। পরবর্তীতে ঘটনা প্রকাশ পেলে মামলা দায়ের হলেও তিন মাসের বেশি সময় ধরে প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক চক্রের মাধ্যমে অর্থ প্রদান ও সালিসের দরবার করে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে।
একইভাবে, মাদারীপুরের শিবচরে ২৮ বছরের এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ ঝোপের মধ্যে ফেলে দেওয়া এবং প্রমাণ লোপাটের জন্য তাঁর এক বছরের নিষ্পাপ শিশুপুত্রকে আড়িয়াল খাঁ নদীতে ফেলে হত্যা করার ঘটনা দেশের সামাজিক অবক্ষয় ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার চরম স্মারক। মিরপুরে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা কিংবা নেত্রকোনার মদনে ১১ বছরের মাদ্রাসা ছাত্রীকে শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষণ ও অন্তঃসত্ত্বা করার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তদারকি ও জবাবদিহিতা শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মূল কারণ রাষ্ট্রীয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার দেওয়ার বদলে অপরাধীদের রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষা দেওয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে পুরস্কৃত করার যে নীতি পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা দেশকে একটি মৌলবাদী ও অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো কঠোর আইন কাগজে-কলমে থাকলেও তার প্রয়োগ বাস্তবে অনুপস্থিত। আইন শক্তিশালী হলেও ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণের পুরো দায়িত্ব বহন করতে হয় ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারকে।
পুলিশ, চিকিৎসক এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ ও নারীবান্ধব ভূমিকার অভাবে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত অপরাধীরা ভুক্তভোগীর তুলনায় সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে অধিক শক্তিশালী হয়। স্থানীয় ক্যাডাররা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এবং মামলা আপস করার জন্য ভুক্তভোগীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ধর্ষণের মতো অসংঘীয় ও অ-আপসযোগ্য অপরাধকেও স্থানীয় প্রভাবশালীরা ‘পারিবারিক সম্মান’ বা সামাজিকভাবে ফয়সালা করার নামে ধামাচাপা দেয়। হাইকোর্টে বিচারাধীন ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার মধ্যে ৩০ হাজার ৩৬৫টি মামলা ৫ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তা কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ।
বর্তমানে দেশে কেবল নারী নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হচ্ছে না, বরং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে। বেপরোয়া চাঁদাবাজি, দখলদারি ও সিন্ডিকেট রাজত্বের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। অর্থনৈতিক এই বিশৃঙ্খলার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সামাজিক সুরক্ষায়। ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের জীবন যখন নিরাপত্তাহীন, ঠিক তখনই নারীর ওপর নিপীড়নকে রাজনৈতিক হাতিয়ার ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ আজ দ্রুতগতিতে একটি উগ্রপন্থী ও চরমপন্থা-শাসিত সামাজিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা আফগানিস্তানের তালেবানি ব্যবস্থার সাথে দৃশ্যত সাদৃশ্যপূর্ণ। দেশে নারীবিদ্বেষী ও উগ্র মানসিকতার গোষ্ঠীগুলো সরকারের রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্রয় পাচ্ছে। নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়া, শিক্ষা গ্রহণ করা এবং কর্মক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় আইন ও আদালতের কার্যকারিতাকে খর্ব করে স্থানীয় পর্যায়ে ফতোয়া, অবৈধ সালিস ও ক্যাডারভিত্তিক শাসন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের রাজনৈতিক চাদরে ঢেকে রাখা হচ্ছে।
দেশকে এই ভয়াবহ সামাজিক পতন ও নৈরাজ্য থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও আইনি কাঠামোর কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি মামলায় ১৮০ দিনের সময়সীমা কঠোরভাবে মেনে বিচার নিষ্পত্তি করতে হবে এবং সাজা দৃশ্যমান করতে হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে হবে এবং সালিস বা অর্থ দিয়ে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। ফরেনসিক ও আলামত সংগ্রহ আধুনিকায়ন করে ভুক্তভোগীর ওপর প্রমাণের অতিরিক্ত চাপ কমাতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবার যাতে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের হুমকির মুখে না পড়ে, সে জন্য রাষ্ট্রীয় সামাজিক ও আইনি সুরক্ষাবলয় তৈরি করা জরুরি।
একটি স্বাধীন দেশের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ছিল তার নাগরিকদের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিতে যেভাবে ধর্ষণ, বলাৎকার, যৌতুকের জন্য হত্যা এবং শিশুদের ওপর পাশবিকতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে এ দেশের ভবিষ্যৎ গভীর অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সরকারের অদক্ষতা, তোষণনীতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে আজ বাংলাদেশ এক চরম সংকটকালে উপনীত। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এবং নারীদের নিরাপদ চলাচলের স্বাধীন পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে না পারলে, সামাজিক কাঠামোর এই সম্পূর্ণ ধস দেশকে চিরতরে একটি চরমপন্থী ও অকার্যকর রাষ্ট্রের কাতারে নামিয়ে আনবে।

