কখন একটি কোর্ট কিংবা ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলা যায়?

এস. আর. সিদ্দিকী সাইফ
আসুন সংবিধান, আইন ও প্রচলিত কাস্টমস ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার পূর্বে ক্যাঙ্গারু কোর্ট (Kangaroo Court) সংক্রান্ত একটু সংক্ষিপ্ত ধারণা নিয়ে রাখি। ক্যাঙ্গারু কোর্ট বলতে এমন একটি বিচারব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি, নিরপেক্ষতা ও যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া উপেক্ষা করা হয় এবং বিচারপ্রক্রিয়াটি প্রায়ই পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত বা অন্যায়ভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়।

‘Kangaroo Court’ শব্দবন্ধটির উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রে, আনুমানিক উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। এর সুনির্দিষ্ট ব্যুৎপত্তি নিশ্চিত নয়। একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, ক্যাঙ্গারু যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে, তেমনি এ ধরনের আদালতও ন্যায়বিচারের নিয়মকানুন এড়িয়ে বা লঙ্ঘন করে লাফিয়ে লাফিয়ে আবার অনেকাংশে ম্যারাথন দৌড়ে দৌড়ে চলে।
একদম সহজ কথায় যে আদালতে বা ট্রাইবুনালে ন্যায়বিচারের চেয়ে পলিটিক্যালি মোটিভেটেড হয়ে পূর্বনির্ধারিত রায় বা অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়াই মুখ্য হয়ে ওঠে, তাকে সমালোচনামূলকভাবে Kangaroo Court বলা হয়।

ধারণা তো নিলাম এবার মুল বিষয়ে পয়েন্টে পয়েন্টে সংবিধান, আইন, কাস্টমস, রাজনৈতিক বাস্তবতা আর মেটিকুলাস ডিজাইনে ঘটা ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতাসহ সবকিছুর মিশেলে আলোচনা করা যাক—

একটি ট্রাইব্যুনাল কিংবা কোর্টকে কখন নির্দ্বিধায় ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলা যায়? অথবা একটি কোর্ট বা ট্রাইব্যুনাল কখন তার বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যাঙ্গারু কোর্ট হিসেবে নিজেকে নিজেই প্রতিষ্ঠা দেয়, সমাজে ক্যাঙারু কোর্ট হিসেবে নিজেই নিজের পরিচয় নির্ধারণ করে?

আমার বিবেচনায়, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল কোন আইনের অধীনে গঠিত হয়েছে, সেই আইনে তার এখতিয়ার কতটুকু এবং বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে সে আইন ও সংবিধানের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না—

প্রথমত: যে আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে, সেই আইনের মূল উদ্দেশ্য কী?

যে আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনালটি গঠিত হয়েছে, সেই আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং তার বিচারপ্রক্রিয়া আইনসম্মত কি—না। মূল আইন কী বলে? আইন প্রণয়নের সময় আইনসভার উদ্দেশ্য বা Intention of the Legislature কী ছিল? কী উদ্দেশ্যে, কী কারণে এবং কোন ধরনের অপরাধের বিচার এবং কোন স্পেসিফিক ঘটনার বিচার করার জন্য আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল? আইনের ভাষা, প্রাসঙ্গিক বিধান, আইন প্রণয়নের ইতিহাস এবং প্রযোজ্য বিচারিক ব্যাখ্যার আলোকে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

যে অপরাধের বিচার করার জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, সেই আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল যে অপরাধের বিচার করছে, তা আইনটির প্রযোজ্যতার মধ্যে পড়ে কি না, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি কোনো ট্রাইব্যুনাল তার আইনগত এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এমন কোনো অপরাধের বিচার শুরু করে, যে ঘটনা বা অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট মূল আইন তাকে দেয়নি, তাহলে সেই বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে।

আর যদি সেই বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাউকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা আরও কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আইন যে ক্ষমতা দেয়নি, সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিচার করা হলে তা আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে কোনো ট্রাইব্যুনাল তার প্রতিষ্ঠাকালীন ঐতিহাসিক উদ্দেশ্যের বাইরে কোনো ঘটনার বিচার করছে বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার বিচার অবৈধ হয়ে যায় না। দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট আইনের প্রকৃত বিধান ও প্রযোজ্য সংশোধনীগুলোর আসল উদ্দেশ্য, সংশোধনীগুলো সংবিধানের বিধান মতো হয়েছে কি-না সেই বিচারকে অনুমোদন করে কি না, তবে সংশ্লিষ্ট কোর্ট কিংবা ট্রাইবুনালে যদি আইনগত এখতিয়ারের অভাব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই অভাব সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনাল বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিদুৎ গতিতে গণহারে একেরপর এক ফাঁসির রায় ঘোষণা করে তাহলে সেই বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের বিচারপ্রক্রিয়া’ বলে সমালোচনা করার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত: সংবিধান ও বিচারপতির অবসরের বয়সসীমা ও নিয়োগ সহ সামগ্রীক নীতিমালা সংক্রান্ত— এরপর আসা যাক বিচারকের নিয়োগ এবং সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নে। যখন কোনো দেশের সংবিধান সুনির্দিষ্ট ভাবে বিচারপতিদের অবসরের বয়স সীমা নির্ধারণ করে দেয় তখন এটাই অনুমিত হয় উক্ত নির্দিষ্ট বয়সের পরে উক্ত মানুষের বিচারিক ক্ষমতা কিংবা বিচারিক বিবেচনা প্রসুত প্রকৃতিক প্রদত্ত ক্ষমতার লোপ পায়। তাই অবসর পরবর্তী কোন বিচারপতির কোনরূপ দায়িত্বশীল রাস্ট্রীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করা, কোন কোর্ট কিংবা ট্রাইবুনালের মূল নেতৃত্ব তথা বেঞ্চের চেয়ারম্যান হিসেবে লিড করা টোটালি এগেইন্সট স্পিরিট অব দ্যা কনসটিটিউশন। এরপর সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর বিচারপতি পদ এজিউম না করে তথা হাইকোর্ট ডিভিশনে কোনরূপ বিচার কার্যে অংশপ্রহণ না করে বিচারপতি হিসেবে মিনিমাম অভিজ্ঞতা অর্জন না করে কোন ট্রাইবুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করাও সংবিধান, ন্যায় বিচার ও আইনের শাসনের ধারণার পরিপন্থী।

কিন্তু যদি দেখা যায়, কোনো বিচারককে এমনভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা সংবিধান বা প্রযোজ্য আইনের বাধ্যতামূলক বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিংবা সংবিধানের মূল স্পিরিট এর বাহিরে তাহলে সেই নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আর যদি কোনো ট্রাইব্যুনালের গঠন বা বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুতর আইনগত ত্রুটি থাকে, তাহলে সেই ত্রুটির প্রকৃতি এবং প্রযোজ্য আইনের আলোকে ট্রাইব্যুনালের বৈধতা ও তার বিচারিক কার্যক্রমের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে এবং দেশের প্রত্যেক নাগরিক সেই বিচার প্রক্রিয়া ইস্যুতে প্রশ্ন করার অধিকার রাখে এমনকি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোর্ট কিংবা ট্রাইবুনাল ক্যাঙারু কোর্টের তকমাও পেতে পারে।

তৃতীয়ত: বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি আবশ্যক ধাপ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার— এরপর আসা যাক বিচারিক প্রক্রিয়ার ন্যায্যতার প্রশ্নে। একটি বিচার সম্পন্ন করার জন্য প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিচারপ্রক্রিয়ার আবশ্যক ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অভিযোগ সম্পর্কে জানানো, আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ দেওয়া, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী সাক্ষ্য-প্রমাণ মোকাবিলা করার সুযোগ দেওয়া ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে যে বিচারপ্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির প্রশ্ন জড়িত, সেখানে অভিযুক্তের অধিকার ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।

এখানে Trial in Absentia বা অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু আইনব্যবস্থায় নির্দিষ্ট শর্তে অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনার বিধান রয়েছে। অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছে বলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই বিচার স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না।
তবে দেখতে হবে, অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনার জন্য আইনগত শর্তগুলো পূরণ করা হয়েছিল কি না, অভিযুক্তকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না। বিশেষত মৃত্যুদণ্ডের মামলায় এসব সুরক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। যদি কোনো অভিযুক্তকে কার্যকরভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে, ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক সুরক্ষাগুলো উপেক্ষা করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তাহলে সেই বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিচার মানে শুধু রায় ঘোষণা করা নয়; বিচার মানে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
যখন বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক শর্তগুলো উপেক্ষা করে গণহারে কথায় কথায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তখন সেই বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের বিচারপ্রক্রিয়া’ বলে আখ্যা দেওয়ার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি অবশ্যই তৈরি হবে।

চতুর্থত: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার ও বিচারিক হত্যার অভিযোগ—

এরপর আসা যাক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার এবং বিচারের নামে Judicial Killing বা বিচারিক হত্যার অভিযোগের বিষয়ে। যখন কোনো বিচারপ্রক্রিয়া আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়, অথবা এমন অভিযোগের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সামনে আসে যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের দমন কিংবা নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন সেই বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

যদি কোনো বিচারপ্রক্রিয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করা, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে ধ্বংস করা কিংবা বিদেশি শক্তিকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিচারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা ন্যায়বিচারের মৌলিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিচারপ্রক্রিয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতীয়মান হয় যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নই মুখ্য হয়ে উঠেছে, তাহলে সেই বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট উপাদান ও কারণ রয়েছে তখনও সেই বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের বিচারপ্রক্রিয়া’ বলে আখ্যা দেওয়ার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তৈরি হতে পারে সচেতন মহলে।

পঞ্চমত: বিচারক, প্রসিকিউটর ও আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য যখন একি সূত্রে গাঁথা—

এরপর আসা যাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে যেখানে বিচারক, প্রসিকিউটর ও আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের নেক্সাস রয়েছে। একটি ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের রাজনৈতিক মূল্যবোধ বা Political Values তাঁদের বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে কি না, প্রসিকিউটরদের রাজনৈতিক অবস্থান তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে প্রভাব ফেলছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিরপেক্ষভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন কি না—এসব প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মূল বিষয় কারও রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা নয়। মূল বিষয় হচ্ছে, সেই মতাদর্শের কারণে বিচারিক নিরপেক্ষতা কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পক্ষপাত সৃষ্টি হচ্ছে কি না। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয় কি-না।

যদি প্রাসঙ্গিক তথ্য ও প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে বিচারক, প্রসিকিউটর কিংবা আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে যেকোনো মূল্যে শাস্তি দেওয়ার পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছেন, তাহলে সেই বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

বিচারপ্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য যদি সত্য উদ্‌ঘাটন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে Punish Someone by Hook or by Crook—অর্থাৎ যেকোনো উপায়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া—হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যদি বিচারপ্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্যই কাউকে যেকোনো উপায়ে শাস্তি দেওয়া এবং বিচার সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ যেমন বিচারক, প্রসিকিউটর ও সকল পক্ষের আইনজীবী একিসূত্রে গাঁথা, একি বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সারথী হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য দৃশ্যমান প্রমাণ মেলে তাহলে সেটি আর ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি থাকতে পারে।

ষষ্ঠত: একই অপরাধে একাধিক বিচার, Double Jeopardy এবং আইনের সমান সুরক্ষা— এরপর আসা যাক সংবিধানের সমতা, সমান আইনি সুরক্ষা এবং Double Jeopardy বা একই অপরাধে একাধিকবার বিচার ও দণ্ডিত হওয়ার প্রশ্নে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। অন্যদিকে, ৩৫(২) অনুচ্ছেদে একই অপরাধের জন্য একজন ব্যক্তিকে একাধিকবার বিচার ও দণ্ডিত করার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটি দেশে মেটিকুলাস ডিজাইনে বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনা নিয়ে হাজার হাজার মামলাও হয়েছে। কোনো কোনো মামলার আসামীদের বিচার হচ্ছে প্রচলিত ফৌজদারি আদালতে, আবার সেই সংশ্লিষ্ট একই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত একই মামলায় অভিযুক্ত কিছু আসামীর বিচার হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।

ধরা যাক, চট্টগ্রামে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দন্ড বিধি আইনে ও প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে চট্টগ্রামের আদালতে বিচার চলছে। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই ঘটনা বা অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও বিচারপ্রক্রিয়া চলছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুটি বিচারপ্রক্রিয়ার আইনগত ভিত্তি কী? দুটি মামলায় অভিযোগ কি একই অপরাধের, নাকি অপরাধের আইনগত উপাদান ভিন্ন? ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার কী? এবং এ ধরনের বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদের কোনো সংঘাত রয়েছে কি না?

কিন্তু যদি দেখা যায়, একজন ব্যক্তিকে একই অপরাধের জন্য পুনরায় বিচার ও দণ্ডিত করা হচ্ছে এবং তা সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদের সুরক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাহলে বিষয়টি গুরুতর আইনগত পর্যালোচনার দাবি রাখে।

অন্যদিকে, একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কিছু মানুষের বিচার হচ্ছে দণ্ডবিধি আইনে নিন্ম আদালতে আবার কিছু স্পেসিফিক ব্যাক্তির বিচার হচ্ছে উচ্চতর অপরাধ ট্রাইবুনালে। সেটিও সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক কি-না অবশ্যই দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপীল বিভাগ কতৃক টেস্টিফাই হতেই হবে সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনালে বিচার শুরু ও সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে টু প্রিভেন্ট এবিউস অব দ্যা প্রসেস অব দ্যা কোর্ট।

আইনের চোখে সবাই সমান হলে, বিচারপ্রক্রিয়ায়ও আইনের সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে যদি আইনগত এখতিয়ারের অভাব, সাংবিধানিক বিধান লঙ্ঘন, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হরণ, রাজনৈতিক পক্ষপাত কিংবা ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক নীতিগুলো উপেক্ষা করার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকে, তাহলে সেই অভিযোগগুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা করা অপরিহার্য। আর যদি এসব গুরুতর ত্রুটি ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বৈধতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে ক্যাঙারু কোর্ট বলে অভিহিত করতে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

উপরের ৬ টি প্রশ্নের আলোকে ও আলোচনার প্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে যদি কোনো ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনগত এখতিয়ার, সাংবিধানিক বৈধতা, বিচারিক নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলোর গুরুতর লঙ্ঘন দেখা যায়, তাহলে সেই ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলা একটি কঠোর সমালোচনামূলক মতামত হিসেবে প্রকাশ করা যেতে পারে।

কোনো বিচারব্যবস্থা, বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনা করা মানেই একটি দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থাকে অস্বীকার করা নয়। বরং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, বৈধতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অতীব গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১৯ অনুচ্ছেদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদেও চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্‌স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত, যদিও এই অধিকার সংবিধান ও প্রযোজ্য আইনে নির্ধারিত সীমাবদ্ধতার অধীন।

ক্যাঙ্গারু কোর্টকে ক্যাঙ্গারু কোর্ট বলা, অবৈধকে অবৈধ বলা এবং অন্যায়কে অন্যায় বলা—এগুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চর্চার অংশ। বিচারের নামে প্রহসন, বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারপ্রক্রিয়ায় ব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তার প্রতিবাদ করা একজন নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চারও অংশ।

আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো কোনো ট্রাইব্যুনালকে শুধু তার নাম, পদবি কিংবা আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার কারণে বিচারিক সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। তার আইনগত বৈধতা, বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতা অবশ্যই পর্যালোচনাযোগ্য।

যেখানে সংবিধান, প্রচলিত আইন ও কাস্টমস লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠবে, সেখানে প্রশ্ন উঠবে। যেখানে সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ থাকবে, সেখানে তার প্রতিকার দাবি করা হবে। আর যেখানে বিচারের নামে পলিটিক্যালি মোটিভেটেড হয়ে অন্যায় সংঘটিত হওয়ার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকবে, সেখানে সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। কারণ, অন্যায়কে অন্যায় বলার অধিকার এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস—একটি গণতান্ত্রিক ও আইনভিত্তিক আধুনিক রাস্ট্রের আধুনিক সমাজের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।

নোট- “কোন ব্যাক্তি বা ব্যক্তিবর্গ কে যদি কোন কোর্ট কিংবা ট্রাইবুনাল ‘ক্যাঙারু কোর্ট’ ডাকার অপরাধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে ডেকে পাঠায় তখন সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি বা তার সমর্থক গোষ্ঠী গতানুগতিক দায় স্বীকার করে ক্ষমা না চেয়ে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কোর্ট কিংবা ট্রাইবুনালের সামনে অন্তত উপরের ৬ টি প্রশ্ন (যদি প্রশ্ন গুলো মিলে যায়) রেখে উত্তর খোঁজার অধিকার রাখেন। প্রয়োজন একটু সৎসাহস আর বিচক্ষণ নেতৃত্বের”।

লেখক— সাবেক সহকারী এটর্নি জেনারেল ও আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

এস. আর. সিদ্দিকী সাইফ
আসুন সংবিধান, আইন ও প্রচলিত কাস্টমস ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার পূর্বে ক্যাঙ্গারু কোর্ট (Kangaroo Court) সংক্রান্ত একটু সংক্ষিপ্ত ধারণা নিয়ে রাখি। ক্যাঙ্গারু কোর্ট বলতে এমন একটি বিচারব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি, নিরপেক্ষতা ও যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়া উপেক্ষা করা হয় এবং বিচারপ্রক্রিয়াটি প্রায়ই পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত বা অন্যায়ভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়।

‘Kangaroo Court’ শব্দবন্ধটির উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রে, আনুমানিক উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। এর সুনির্দিষ্ট ব্যুৎপত্তি নিশ্চিত নয়। একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, ক্যাঙ্গারু যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে, তেমনি এ ধরনের আদালতও ন্যায়বিচারের নিয়মকানুন এড়িয়ে বা লঙ্ঘন করে লাফিয়ে লাফিয়ে আবার অনেকাংশে ম্যারাথন দৌড়ে দৌড়ে চলে।
একদম সহজ কথায় যে আদালতে বা ট্রাইবুনালে ন্যায়বিচারের চেয়ে পলিটিক্যালি মোটিভেটেড হয়ে পূর্বনির্ধারিত রায় বা অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়াই মুখ্য হয়ে ওঠে, তাকে সমালোচনামূলকভাবে Kangaroo Court বলা হয়।

ধারণা তো নিলাম এবার মুল বিষয়ে পয়েন্টে পয়েন্টে সংবিধান, আইন, কাস্টমস, রাজনৈতিক বাস্তবতা আর মেটিকুলাস ডিজাইনে ঘটা ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতাসহ সবকিছুর মিশেলে আলোচনা করা যাক—

একটি ট্রাইব্যুনাল কিংবা কোর্টকে কখন নির্দ্বিধায় ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলা যায়? অথবা একটি কোর্ট বা ট্রাইব্যুনাল কখন তার বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যাঙ্গারু কোর্ট হিসেবে নিজেকে নিজেই প্রতিষ্ঠা দেয়, সমাজে ক্যাঙারু কোর্ট হিসেবে নিজেই নিজের পরিচয় নির্ধারণ করে?

আমার বিবেচনায়, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল কোন আইনের অধীনে গঠিত হয়েছে, সেই আইনে তার এখতিয়ার কতটুকু এবং বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে সে আইন ও সংবিধানের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না—

প্রথমত: যে আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে, সেই আইনের মূল উদ্দেশ্য কী?

যে আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনালটি গঠিত হয়েছে, সেই আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং তার বিচারপ্রক্রিয়া আইনসম্মত কি—না। মূল আইন কী বলে? আইন প্রণয়নের সময় আইনসভার উদ্দেশ্য বা Intention of the Legislature কী ছিল? কী উদ্দেশ্যে, কী কারণে এবং কোন ধরনের অপরাধের বিচার এবং কোন স্পেসিফিক ঘটনার বিচার করার জন্য আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল? আইনের ভাষা, প্রাসঙ্গিক বিধান, আইন প্রণয়নের ইতিহাস এবং প্রযোজ্য বিচারিক ব্যাখ্যার আলোকে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

যে অপরাধের বিচার করার জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, সেই আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল যে অপরাধের বিচার করছে, তা আইনটির প্রযোজ্যতার মধ্যে পড়ে কি না, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি কোনো ট্রাইব্যুনাল তার আইনগত এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এমন কোনো অপরাধের বিচার শুরু করে, যে ঘটনা বা অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট মূল আইন তাকে দেয়নি, তাহলে সেই বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে।

আর যদি সেই বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাউকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা আরও কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আইন যে ক্ষমতা দেয়নি, সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিচার করা হলে তা আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে কোনো ট্রাইব্যুনাল তার প্রতিষ্ঠাকালীন ঐতিহাসিক উদ্দেশ্যের বাইরে কোনো ঘটনার বিচার করছে বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার বিচার অবৈধ হয়ে যায় না। দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট আইনের প্রকৃত বিধান ও প্রযোজ্য সংশোধনীগুলোর আসল উদ্দেশ্য, সংশোধনীগুলো সংবিধানের বিধান মতো হয়েছে কি-না সেই বিচারকে অনুমোদন করে কি না, তবে সংশ্লিষ্ট কোর্ট কিংবা ট্রাইবুনালে যদি আইনগত এখতিয়ারের অভাব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই অভাব সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনাল বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিদুৎ গতিতে গণহারে একেরপর এক ফাঁসির রায় ঘোষণা করে তাহলে সেই বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের বিচারপ্রক্রিয়া’ বলে সমালোচনা করার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত: সংবিধান ও বিচারপতির অবসরের বয়সসীমা ও নিয়োগ সহ সামগ্রীক নীতিমালা সংক্রান্ত— এরপর আসা যাক বিচারকের নিয়োগ এবং সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নে। যখন কোনো দেশের সংবিধান সুনির্দিষ্ট ভাবে বিচারপতিদের অবসরের বয়স সীমা নির্ধারণ করে দেয় তখন এটাই অনুমিত হয় উক্ত নির্দিষ্ট বয়সের পরে উক্ত মানুষের বিচারিক ক্ষমতা কিংবা বিচারিক বিবেচনা প্রসুত প্রকৃতিক প্রদত্ত ক্ষমতার লোপ পায়। তাই অবসর পরবর্তী কোন বিচারপতির কোনরূপ দায়িত্বশীল রাস্ট্রীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করা, কোন কোর্ট কিংবা ট্রাইবুনালের মূল নেতৃত্ব তথা বেঞ্চের চেয়ারম্যান হিসেবে লিড করা টোটালি এগেইন্সট স্পিরিট অব দ্যা কনসটিটিউশন। এরপর সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর বিচারপতি পদ এজিউম না করে তথা হাইকোর্ট ডিভিশনে কোনরূপ বিচার কার্যে অংশপ্রহণ না করে বিচারপতি হিসেবে মিনিমাম অভিজ্ঞতা অর্জন না করে কোন ট্রাইবুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করাও সংবিধান, ন্যায় বিচার ও আইনের শাসনের ধারণার পরিপন্থী।

কিন্তু যদি দেখা যায়, কোনো বিচারককে এমনভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা সংবিধান বা প্রযোজ্য আইনের বাধ্যতামূলক বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিংবা সংবিধানের মূল স্পিরিট এর বাহিরে তাহলে সেই নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। আর যদি কোনো ট্রাইব্যুনালের গঠন বা বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুতর আইনগত ত্রুটি থাকে, তাহলে সেই ত্রুটির প্রকৃতি এবং প্রযোজ্য আইনের আলোকে ট্রাইব্যুনালের বৈধতা ও তার বিচারিক কার্যক্রমের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে এবং দেশের প্রত্যেক নাগরিক সেই বিচার প্রক্রিয়া ইস্যুতে প্রশ্ন করার অধিকার রাখে এমনকি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোর্ট কিংবা ট্রাইবুনাল ক্যাঙারু কোর্টের তকমাও পেতে পারে।

তৃতীয়ত: বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি আবশ্যক ধাপ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার— এরপর আসা যাক বিচারিক প্রক্রিয়ার ন্যায্যতার প্রশ্নে। একটি বিচার সম্পন্ন করার জন্য প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিচারপ্রক্রিয়ার আবশ্যক ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অভিযোগ সম্পর্কে জানানো, আত্মপক্ষ সমর্থনের কার্যকর সুযোগ দেওয়া, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী সাক্ষ্য-প্রমাণ মোকাবিলা করার সুযোগ দেওয়া ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে যে বিচারপ্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির প্রশ্ন জড়িত, সেখানে অভিযুক্তের অধিকার ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।

এখানে Trial in Absentia বা অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু আইনব্যবস্থায় নির্দিষ্ট শর্তে অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনার বিধান রয়েছে। অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছে বলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই বিচার স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না।
তবে দেখতে হবে, অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনার জন্য আইনগত শর্তগুলো পূরণ করা হয়েছিল কি না, অভিযুক্তকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না। বিশেষত মৃত্যুদণ্ডের মামলায় এসব সুরক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। যদি কোনো অভিযুক্তকে কার্যকরভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে, ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক সুরক্ষাগুলো উপেক্ষা করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তাহলে সেই বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিচার মানে শুধু রায় ঘোষণা করা নয়; বিচার মানে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
যখন বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক শর্তগুলো উপেক্ষা করে গণহারে কথায় কথায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তখন সেই বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের বিচারপ্রক্রিয়া’ বলে আখ্যা দেওয়ার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি অবশ্যই তৈরি হবে।

চতুর্থত: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার ও বিচারিক হত্যার অভিযোগ—

এরপর আসা যাক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার এবং বিচারের নামে Judicial Killing বা বিচারিক হত্যার অভিযোগের বিষয়ে। যখন কোনো বিচারপ্রক্রিয়া আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়, অথবা এমন অভিযোগের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সামনে আসে যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের দমন কিংবা নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন সেই বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

যদি কোনো বিচারপ্রক্রিয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করা, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে ধ্বংস করা কিংবা বিদেশি শক্তিকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিচারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা ন্যায়বিচারের মৌলিক আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিচারপ্রক্রিয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতীয়মান হয় যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নই মুখ্য হয়ে উঠেছে, তাহলে সেই বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট উপাদান ও কারণ রয়েছে তখনও সেই বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের বিচারপ্রক্রিয়া’ বলে আখ্যা দেওয়ার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি তৈরি হতে পারে সচেতন মহলে।

পঞ্চমত: বিচারক, প্রসিকিউটর ও আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য যখন একি সূত্রে গাঁথা—

এরপর আসা যাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে যেখানে বিচারক, প্রসিকিউটর ও আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের নেক্সাস রয়েছে। একটি ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের রাজনৈতিক মূল্যবোধ বা Political Values তাঁদের বিচারিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে কি না, প্রসিকিউটরদের রাজনৈতিক অবস্থান তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে প্রভাব ফেলছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিরপেক্ষভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন কি না—এসব প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মূল বিষয় কারও রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা নয়। মূল বিষয় হচ্ছে, সেই মতাদর্শের কারণে বিচারিক নিরপেক্ষতা কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পক্ষপাত সৃষ্টি হচ্ছে কি না। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয় কি-না।

যদি প্রাসঙ্গিক তথ্য ও প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে বিচারক, প্রসিকিউটর কিংবা আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে যেকোনো মূল্যে শাস্তি দেওয়ার পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছেন, তাহলে সেই বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

বিচারপ্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য যদি সত্য উদ্‌ঘাটন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে Punish Someone by Hook or by Crook—অর্থাৎ যেকোনো উপায়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া—হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যদি বিচারপ্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্যই কাউকে যেকোনো উপায়ে শাস্তি দেওয়া এবং বিচার সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ যেমন বিচারক, প্রসিকিউটর ও সকল পক্ষের আইনজীবী একিসূত্রে গাঁথা, একি বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সারথী হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য দৃশ্যমান প্রমাণ মেলে তাহলে সেটি আর ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি থাকতে পারে।

ষষ্ঠত: একই অপরাধে একাধিক বিচার, Double Jeopardy এবং আইনের সমান সুরক্ষা— এরপর আসা যাক সংবিধানের সমতা, সমান আইনি সুরক্ষা এবং Double Jeopardy বা একই অপরাধে একাধিকবার বিচার ও দণ্ডিত হওয়ার প্রশ্নে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। অন্যদিকে, ৩৫(২) অনুচ্ছেদে একই অপরাধের জন্য একজন ব্যক্তিকে একাধিকবার বিচার ও দণ্ডিত করার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটি দেশে মেটিকুলাস ডিজাইনে বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনা নিয়ে হাজার হাজার মামলাও হয়েছে। কোনো কোনো মামলার আসামীদের বিচার হচ্ছে প্রচলিত ফৌজদারি আদালতে, আবার সেই সংশ্লিষ্ট একই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত একই মামলায় অভিযুক্ত কিছু আসামীর বিচার হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।

ধরা যাক, চট্টগ্রামে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দন্ড বিধি আইনে ও প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে চট্টগ্রামের আদালতে বিচার চলছে। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই ঘটনা বা অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও বিচারপ্রক্রিয়া চলছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুটি বিচারপ্রক্রিয়ার আইনগত ভিত্তি কী? দুটি মামলায় অভিযোগ কি একই অপরাধের, নাকি অপরাধের আইনগত উপাদান ভিন্ন? ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার কী? এবং এ ধরনের বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদের কোনো সংঘাত রয়েছে কি না?

কিন্তু যদি দেখা যায়, একজন ব্যক্তিকে একই অপরাধের জন্য পুনরায় বিচার ও দণ্ডিত করা হচ্ছে এবং তা সংবিধানের ৩৫(২) অনুচ্ছেদের সুরক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাহলে বিষয়টি গুরুতর আইনগত পর্যালোচনার দাবি রাখে।

অন্যদিকে, একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কিছু মানুষের বিচার হচ্ছে দণ্ডবিধি আইনে নিন্ম আদালতে আবার কিছু স্পেসিফিক ব্যাক্তির বিচার হচ্ছে উচ্চতর অপরাধ ট্রাইবুনালে। সেটিও সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক কি-না অবশ্যই দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপীল বিভাগ কতৃক টেস্টিফাই হতেই হবে সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনালে বিচার শুরু ও সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে টু প্রিভেন্ট এবিউস অব দ্যা প্রসেস অব দ্যা কোর্ট।

আইনের চোখে সবাই সমান হলে, বিচারপ্রক্রিয়ায়ও আইনের সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে যদি আইনগত এখতিয়ারের অভাব, সাংবিধানিক বিধান লঙ্ঘন, আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হরণ, রাজনৈতিক পক্ষপাত কিংবা ন্যায্য বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক নীতিগুলো উপেক্ষা করার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকে, তাহলে সেই অভিযোগগুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা করা অপরিহার্য। আর যদি এসব গুরুতর ত্রুটি ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বৈধতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে ক্যাঙারু কোর্ট বলে অভিহিত করতে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

উপরের ৬ টি প্রশ্নের আলোকে ও আলোচনার প্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে যদি কোনো ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ায় আইনগত এখতিয়ার, সাংবিধানিক বৈধতা, বিচারিক নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলোর গুরুতর লঙ্ঘন দেখা যায়, তাহলে সেই ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বলা একটি কঠোর সমালোচনামূলক মতামত হিসেবে প্রকাশ করা যেতে পারে।

কোনো বিচারব্যবস্থা, বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনা করা মানেই একটি দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থাকে অস্বীকার করা নয়। বরং বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, বৈধতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অতীব গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১৯ অনুচ্ছেদ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদেও চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্‌স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত, যদিও এই অধিকার সংবিধান ও প্রযোজ্য আইনে নির্ধারিত সীমাবদ্ধতার অধীন।

ক্যাঙ্গারু কোর্টকে ক্যাঙ্গারু কোর্ট বলা, অবৈধকে অবৈধ বলা এবং অন্যায়কে অন্যায় বলা—এগুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চর্চার অংশ। বিচারের নামে প্রহসন, বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারপ্রক্রিয়ায় ব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তার প্রতিবাদ করা একজন নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চারও অংশ।

আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো কোনো ট্রাইব্যুনালকে শুধু তার নাম, পদবি কিংবা আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার কারণে বিচারিক সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। তার আইনগত বৈধতা, বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা ও নিরপেক্ষতা অবশ্যই পর্যালোচনাযোগ্য।

যেখানে সংবিধান, প্রচলিত আইন ও কাস্টমস লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠবে, সেখানে প্রশ্ন উঠবে। যেখানে সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ থাকবে, সেখানে তার প্রতিকার দাবি করা হবে। আর যেখানে বিচারের নামে পলিটিক্যালি মোটিভেটেড হয়ে অন্যায় সংঘটিত হওয়ার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকবে, সেখানে সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। কারণ, অন্যায়কে অন্যায় বলার অধিকার এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস—একটি গণতান্ত্রিক ও আইনভিত্তিক আধুনিক রাস্ট্রের আধুনিক সমাজের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।

নোট- “কোন ব্যাক্তি বা ব্যক্তিবর্গ কে যদি কোন কোর্ট কিংবা ট্রাইবুনাল ‘ক্যাঙারু কোর্ট’ ডাকার অপরাধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে ডেকে পাঠায় তখন সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি বা তার সমর্থক গোষ্ঠী গতানুগতিক দায় স্বীকার করে ক্ষমা না চেয়ে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কোর্ট কিংবা ট্রাইবুনালের সামনে অন্তত উপরের ৬ টি প্রশ্ন (যদি প্রশ্ন গুলো মিলে যায়) রেখে উত্তর খোঁজার অধিকার রাখেন। প্রয়োজন একটু সৎসাহস আর বিচক্ষণ নেতৃত্বের”।

লেখক— সাবেক সহকারী এটর্নি জেনারেল ও আইনজীবী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

আরো পড়ুন

সর্বশেষ