নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের চরম স্থবিরতায় দেশের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। বিএনপি সরকার গঠনের পর একটি ‘সাহসী ও ভিন্নধর্মী’ বাজেট ঘোষণা করে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দূর করার যে চটকদার স্বপ্ন জনগণকে দেখানো হয়েছিল, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে তার প্রাপ্তির খাতা বস্তুত শূন্য। প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এই আকাশপাতাল ফারাকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কেবল দুর্বিষহ হয়ে ওঠেনি, বরং তারেক রহমানের সর্বগ্রাসী নীতিগত ব্যর্থতা ও চরম আর্থিক অপব্যবস্থাপনা দেশকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
চাল, ডাল, তেলসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চড়া দাম এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ পিষে মেরেছে। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে ৩.২ শতাংশে নেমে আসা বিএনপি-জামাত সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার দেউলিয়াত্বকেই নগ্নভাবে প্রকাশ করে। এই ধস কেবল কোনো পরিসংখ্যানগত বিপর্যয় নয়, বরং এটি দেশে সম্ভাব্য এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্ভিক্ষের স্পষ্ট পূর্বাভাস।একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটের প্রতিশ্রুতিগুলো কাগজে-কলমেই আটকে আছে, অন্যদিকে রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে না পেরে সরকার চরম দায়-দেনার বোঝা তৈরি করছে, যার চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
অর্থনৈতিক সংকটের এই দুঃসময়ে সাধারণ মানুষের জীবিকাকে সুরক্ষা দেওয়ার ন্যূনতম দায়িত্ববোধটুকুও দেখায়নি নীতি-নির্ধারকরা। কোনো ধরনের বিকল্প পুনর্বাসন বা আয়ের উৎস নিশ্চিত না করেই হকার উচ্ছেদ এবং অটোরিকশা বন্ধের মতো অবিবেচকমূলক ও অমানবিক সিদ্ধান্ত নিয়ে শত শত নিম্নআয়ের পরিবারকে রাতারাতি বেকার বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিকল্প কর্মসংস্থান না বানিয়ে খেটে খাওয়া মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়ার এই আচরণ দুর্নীতিতে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন হওয়া বিএনপি সরকারের দায়িত্বহীনতা ও গণবিরোধী মানসিকতারই প্রমাণ।
নিজেদের এই চরম ব্যর্থতা ঢাকার জন্য সরকারের মন্ত্রী ও নেতারা বরাবরই বিশ্বমন্দা, করোনা মহামারী কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংকটকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে ভালোবাসেন। অথচ বাস্তব চিত্র হলো— আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই ধরনের মহামারী ছিল তখন দেশের পরিস্থিতি এরকমের হয়নি।বিশ্বের অন্যান্য বহু উন্নয়নশীল ও প্রতিবেশী দেশ একই বৈশ্বিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও নিজেদের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে। প্রকৃত সংকট বৈশ্বিক নয়; বরং বিএনপি সরকারের অদূরদর্শী নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাজার তদারকির চরম ব্যর্থতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কারণেই দেশের এই শোচনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
যদিও রপ্তানি ও রেমিট্যান্স খাতে খানিকটা আশা জাগানিয়া চিত্র দেখা গেছে, কিন্তু সার্বিক অর্থনীতিকে সচল রাখতে তা বিন্দুমাত্র ভূমিকা রাখতে পারছে না। বাজেটে দেশি-বিদেশি বিশাল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের যে রঙিন স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর জটিলতা ও অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি তো দূরের কথা, বিদ্যমান কর্মসংস্থানও এখন চরম হুমকির মুখে।
অর্থবছরের শুরুতে ঘোষিত সেই তথাকথিত ‘সাহসী’ বাজেট আজ কেবল কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ। সুনির্দিষ্ট, বাস্তবমুখী ও সাহসী কর্মপরিকল্পনার অভাব এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে দুর্নীতির বরপুত্র তারেক রহমানের ধারাবাহিক অক্ষমতা আজ পুরো জাতিকে দিশেহারা করে তুলেছে। বৈশ্বিক অজুহাতের আড়ালে নিজেদের চরম অভ্যন্তরীণ অপশাসনকে লুকিয়ে রাখার এই অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। অবিলম্বে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, অমানবিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা এবং জনমুখী বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারলে, এই নীতিহীন ও দিশেহারা সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতার চড়া মাশুল পুরো দেশকে দীর্ঘকাল ধরে গুনতে হবে।

