রূপার বয়স তিন। পল্লবীর রাস্তায় দোকানের সামনে থেকে তাকে নিয়ে হেঁটে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ আছে। এক বছর ধরে তার মা স্বপ্না আক্তার থানায় থানায় ঘুরছেন। জিডি করেছেন। মেয়ের ছবি হাতে নিয়ে বলেছেন, একমাত্র সম্বল গ্রামের ভিটেবাড়ি পর্যন্ত দিয়ে দেবেন, শুধু তার আদরের মানিককে ফিরিয়ে দিক সরকার!
একটি রাষ্ট্র যদি নিখোঁজ শিশুর সন্ধানে তিন বছরের শিশুর মায়ের কাছ থেকে ভিটেবাড়ি নিয়ে সন্তান খোঁজার অবস্থায় পৌঁছে যায়, তাহলে সেটি রাষ্ট্র নয়, নিছক একটি প্রশাসনিক কাঠামো ভিন্ন আর কিছু না।
পুলিশ সদর দপ্তরের নিজের হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের জিডি। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ। ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০টি। ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪টি। ২০২৩ সালে ১৭ হাজার ৮০৮টি। অর্থাৎ বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় আসার পর নিখোঁজের সংখ্যা কমেনি, বরং গত বছরের তুলনায় সাত মাসেই ৭১ শতাংশের বেশি জিডি হয়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোটের শাসনামলে নিখোঁজ ছিল রাজনৈতিক হাতিয়ার। থানায় জিডি হতো, তদন্ত নামত না। এখন ২০২৬ সালে সেই একই ছবি। পার্থক্য শুধু এই যে তখন জোট ক্ষমতায় ছিল, এখনো আছে। জামাত সংসদে ভাগ বসিয়েছে। বিএনপি মন্ত্রিসভায় বসেছে। কিন্তু শিশু নিখোঁজের তদন্ত এখনো থানার সাধারণ ডায়েরিতে আটকে আছে।
চম্পার যমজ মেয়ে সামিয়া আড়াই বছর আগে নিখোঁজ। প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। আসামি তিন মাস পর জামিনে বেরিয়েছে। ছয় মাস আগে টিকটকে একটি শিশুর ভিডিও দেখে দাবি করেছেন, এটাই তার মেয়ে। যশোরে খোঁজ পেয়েছেন। পুলিশ তাকে সহযোগিতা করেনি। প্রশ্ন একটাই, ওই শিশুর ডিএনএ টেস্ট কেন হয়নি? টিকটক ভিডিওর শিশুটির পরিচয় যাচাইয়ের জন্য পুলিশ কী করেছে? যদি পুলিশ এটুকু না করে, তাহলে নিখোঁজ শিশুর তদন্ত মানে কী?
তহুরার দুই বছরের ছেলে তোহা আদনানকে পাশের ঘরে মুঠোফোন রেখে গিয়েছিলেন। পাঁচ মিনিটে উধাও। এক মাস বিশ দিন ধরে খোঁজ নেই। মুঠোফোনটি বিছানায় পড়ে ছিল। পুলিশ কি ওই মুঠোফোনের কল রেকর্ড, মেসেজ, লোকেশন ডেটা বিশ্লেষণ করেছে? আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে? এলাকার যৌন অপরাধীদের তালিকা যাচাই করেছে? প্রশ্নগুলো থাকছে, কারণ উত্তর নেই।
রাজবাড়ীর তামিমের বাবা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল। তিনি কবিরাজ থেকে জিন নামানো পর্যন্ত সব করেছেন। কারণ তিনি জানেন, থানায় জিডি ছাড়া আর কিছু নেই। পুলিশের সাবেক সদস্য হিসেবে তিনি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, তারপরও তার ছেলের খোঁজ নেই। তাহলে একজন সাধারণ শ্রমজীবী বাবার অবস্থা কী হবে?
এক বছর পর মেয়েকে ফিরে পেয়েছেন আজাদ রহমান। কিন্তু তার স্ত্রী শামসুন্নাহার সন্তানের শোকে পাঁচ মাস আগেই মারা গেছেন। মেয়েটি ফিরে এসে বলেছে, তাকে পপকর্ন খাইয়ে ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়েছিল। বাড়ির কথা সে মনে করতে পারে না। এই মৃত্যুর দায় কার? রাষ্ট্র যদি অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালু করত, শিশু নিখোঁজের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সতর্কতা জারি হতো। রেলস্টেশন, বাস কাউন্টার, লঞ্চ ঘাটে নজরদারি বাড়ত। শামসুন্নাহার হয়তো বেঁচে থাকতেন।
জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান বলেছেন, মুনতাহা হত্যাকাণ্ডের পর এক লাখ স্বাক্ষরের পিটিশন জমা পড়েছে অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালুর দাবিতে। সাত মাস পার হয়েছে, চালু হয়নি। প্রশ্ন হলো, কেন? কেন বিএনপি-জামাত জোট অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালু করছে না? উত্তর স্পষ্ট, এই ব্যবস্থা চালু হলে প্রতি মাসে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা প্রকাশ্যে আসবে। জনগণ জানবে, তাদের সন্তানরা কতটা ঝুঁকিতে আছে।
জাতীয় শিশু নিখোঁজ ডেটাবেজ নেই। নিখোঁজ শিশুর পরিবারের জন্য কোনো সহায়তা তহবিল নেই। থানায় নিখোঁজের মামলা তদন্তে বিশেষ ইউনিট নেই। পুলিশের কাছে ডিএনএ ফরেনসিক ল্যাব সীমিত। অথচ মানবপাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২ আছে। নিখোঁজের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনুসন্ধান শুরুর নির্দেশনা আছে। এগুলো কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে মানুষ জানে না।
বিএনপি-জামাতের নেতারা সংসদে জুলাই দাঙ্গাবাজদের মানবাধিকারের বক্তৃতা-ফতোয়া দেন। অথচ নিখোঁজ শিশুদের ব্যাপারে তারা নিরব। ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ, আর এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের হার কত? পুলিশ কি বলছে? কিছুই বলছে না। কারণ বললে সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণিত হবে।
২০০১-০৬ সালে নিখোঁজদের পরিবার ন্যায়বিচার পায়নি। এখন ২০২৬ সালে বিএনপি-জামাত আবার ক্ষমতায়। শিশু নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একই নিষ্ঠুরতা। অ্যাম্বার অ্যালার্ট চালুর দাবি, প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর সন্ধানে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন, পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ এবং পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা। যদি বিএনপি-জামাত এগুলো না করতে পারে, তাহলে তাদের ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার নেই। কারণ যে রাষ্ট্র শিশুকে রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে অপরাধী। আর যে সরকার তা জেনেও চুপ থাকে, সে সরকার অপরাধের অংশীদার।

