অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনের অর্ধেকের বেশি রিফিউজ করছে। ফেব্রুয়ারিতে এই প্রত্যাখ্যানের হার ৫১ শতাংশ। ২১ বছরে অস্ট্রেলিয়ার ভিসা অনুমোদনের হার এত নিচে কখনো নামেনি। এই সংখ্যাটা শুধু একটা পরিসংখ্যান না, এটা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হয়েছে তার একটা পরিমাপ।
এখন প্রশ্ন হলো, এই ধারণাটা হঠাৎ তৈরি হয়নি। মাসের পর মাস ধরে বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে যা হয়েছে, বিশ্ব সেটা দেখেছে। এগুলো জমতে জমতে একটা দেশের ছাত্রছাত্রীদের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে এসে ঠেকে। কিন্তু শুধু এটুকু বললে পুরো ছবিটা আঁকা হয় না।
আসল প্রশ্নটা হলো, যে সরকার এখন দেশ চালাচ্ছে, তারা এই পরিস্থিতি সামলানোর যোগ্য কিনা। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ বড় দলগুলো অংশ নেয়নি। ভোটার উপস্থিতি নিয়ে যে তথ্য সরকারি সূত্র দিয়েছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিস্তর। যে নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ নেই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, বিরোধী দল নেই, সেই নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক বলার সাহস বিএনপির মন্ত্রীরাও প্রকাশ্যে দেখাতে পারেন না। পারেন না বলেই তারা ব্যস্ত থাকেন পুরনো শত্রুতা চর্চায়, পদ ভাগাভাগিতে আর নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ে কথা বলা যাক। অস্ট্রেলিয়া যখন ৫১ শতাংশ আবেদন বাতিল করছে, তখন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যিনি আছেন তিনি কী করেছেন? শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে, দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে, কিংবা অস্ট্রেলিয়ার হোম অ্যাফেয়ার্সের সাথে কোনো কূটনৈতিক যোগাযোগে তার নাম কোথাও শোনা যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়ে কোনো বিবৃতি দেয়নি, কোনো উদ্যোগের কথা জানায়নি। কারণটা সহজ, এই সরকার ব্যস্ত আছে টিকে থাকা নিয়ে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই।
বিএনপির ইতিহাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনো জ্ঞানচর্চার জায়গা হিসেবে গণ্য হয়নি। দলীয় ছাত্রসংগঠন ব্যবহার করা হয়েছে আধিপত্য বিস্তারে, টেন্ডার দখলে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী থেকে খুলনা, বিএনপি যখনই ক্ষমতায় ছিল তখন ক্যাম্পাসে মেধার চেয়ে লাঠির দাম বেশি ছিল। এই দলটির আমলে শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত উন্নয়নের কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া মুশকিল। উল্টো দুর্নীতির দায়ে যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, সাজা আছে, তারাই এখন শিক্ষার ভবিষ্যৎ ঠিক করবেন, এই চিত্রটা দেশের মধ্যে যতটা হাস্যকর, বাইরে ততটাই উদ্বেগজনক।
অস্ট্রেলিয়ার ভিসা কর্মকর্তারা একটা আবেদন দেখলে শুধু ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখেন না, একটা দেশের প্রোফাইল দেখেন। সেই প্রোফাইলে এখন কী আছে? একটা বিতর্কিত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা সরকার, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতির পুরনো রেকর্ড এবং ক্যাম্পাস সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস। এই প্রোফাইল দেখে একজন ভিসা কর্মকর্তার মাথায় যে প্রশ্নটা আসে সেটা হলো, এই দেশ থেকে যে ছেলেটা বা মেয়েটা আসতে চাইছে, সে পড়াশোনা শেষ করে ফিরে যাবে কিনা।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব ছিল এই সরকারের। তারা সেই দায়িত্ব নেওয়ার বদলে পদ আঁকড়ে বসে আছেন।

