বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটা দেখতে অনেকটা সেই পুরনো গল্পের মতো, যেখানে একজন মানুষ ধার শোধ করতে গিয়ে আরেকটা ধার নেয়, সেটা শোধ করতে গিয়ে নেয় আরেকটা। চক্রটা শেষ হয় না, শুধু গভীর হয়।
চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার যতটুকু ঋণ নেওয়ার কথা বলেছিল, নয় মাসেই তার চেয়ে বেশি নিয়ে ফেলেছে। পুরো বছরের বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্তই নেওয়া হয়ে গেছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। আর এখন বাকি সময়ের খরচ চালাতে আরো ৫ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হচ্ছে। মানে হিসাবের খাতায় যা লেখা ছিল, বাস্তবে তার ধারেকাছেও নেই সরকার।
এই সরকারের কথা মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যে সরকার ক্ষমতায় বসেছে, সেটা কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ফসল না। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে, মানুষের ব্যাপক বয়কটের মুখে, কার্যত নিজেরা নিজেরা একটা ভোটের মঞ্চ সাজিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। এই দলের জন্মই হয়েছিল সেনানিবাসের ছায়ায়, জিয়াউর রহমানের হাতে, রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে। সেই ইতিহাস মাথায় রাখলে এখনকার অর্থনৈতিক বেহালটা বোঝা সহজ হয়।
জনগণের কাছে জবাবদিহি নেই বলে খরচের লাগাম টানার কোনো রাজনৈতিক চাপ এই সরকারের ওপর নেই। রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭১ হাজার কোটি টাকারও বেশি পিছিয়ে আছে মাত্র আট মাসে। বছর শেষে এই ঘাটতি ১ লাখ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একদিকে আয় নেই, অন্যদিকে জ্বালানি ও সারে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, প্রকল্পের নামে খরচ চলছে, আর এই পুরো গর্ত ভরাট করা হচ্ছে ব্যাংক থেকে ধার নিয়ে। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন ঠিকই বলেছেন, এই তিনটির মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্য হবে সেটা সরকার নিজেও বলতে পারছে না।
ব্যাংকগুলো কেন এত উৎসাহে সরকারকে ধার দিচ্ছে, সেটাও একটা সংকটের লক্ষণ। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নেই, ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না, কারণ ইরান যুদ্ধ আর জ্বালানি সংকটে ব্যবসার পরিবেশটাই তলানিতে। তাই ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিলে টাকা ঢালছে নিশ্চিত সুদের আশায়। সরকার চাইছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি, ব্যাংকগুলো দিতে চাইছে ১৬ হাজার কোটির বেশি। এই চিত্রটা আসলে পুরো অর্থনীতির অসুখের একটা এক্সরে।
কিন্তু এই ঋণ বিনা মূল্যে আসছে না। প্রতিটা ট্রেজারি বিলের পেছনে সুদ আছে, প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। আজকের এই ধার আগামী দিনে সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে। সেই ভার কার কাঁধে পড়বে? সাধারণ মানুষের। কর বাড়বে, পরিষেবার মান কমবে, উন্নয়নের টাকা যাবে সুদ শোধতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম যে সতর্কতা দিয়েছেন, সেটা কেবল অর্থনীতির পরিভাষায় বলা একটা সাধারণ কথা, আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে, পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হবে, আর সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা বাজারে আরো বেশি কারসাজি করবে।
এত কিছুর পরেও সরকার বলছে তারা ঋণনির্ভরতা কমাতে চায়। কথা আর কাজের এই ব্যবধান দেখলে হাসব না কাঁদব বোঝা মুশকিল। যে দল দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে দশকের পর দশক ধরে চলছে, যার নেত্রী দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, সেই দলের মুখে দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কথা অনেকটা সেই চোরের মায়ের বড় গলার মতো শোনায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বাইরে এখন ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ ঘুরছে। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে বিশ্বাস পাচ্ছে না, বিনিয়োগের পরিবেশ নেই, সঞ্চয়ের নিশ্চয়তা নেই। এই টাকা যদি একসময় বাজারে আসে, আর ঠিক তখনই পণ্য সরবরাহ কম থাকে, তাহলে কী হবে সেটা অর্থনীতির ছাত্র না হলেও বোঝা যায়।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন একটাই কথা বলেছেন সোজাসুজি, আয়ের পথ না বাড়িয়ে শুধু খরচ বাড়িয়ে গেলে দুর্দশা ছাড়া কিছু হয় না। এই সরকারের কাছে আয় বাড়ানোর কোনো রোডম্যাপ নেই, রাজস্ব সংস্কারের কোনো সদিচ্ছা নেই, কারণ তার জন্য যে জনমতের চাপ লাগে, সেই বৈধতাই এই সরকারের নেই। ফলে সহজ পথ, ব্যাংক থেকে ধার নাও, বিল ছাড়ো, পরেরটা পরে দেখা যাবে। তলাবিহীন ঝুড়িতে পানি ঢালার এই খেলা কতদিন চলবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

