সৌজন্য বনাম প্রতিহিংসা: ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যবচ্ছেদ

পল্লব রানা পারভেজ
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে স্পিকারের আসনটি পরম শ্রদ্ধার এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলী আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অন্ধকার দিক উন্মোচিত করেছে। একদিকে আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের উদারতা ও আইনি মহানুভবতা, অন্যদিকে বর্তমান অস্থির সময়ে দেশের প্রথম নারী স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর প্রতি আচরণের বৈপরীত্য। এই দুই চিত্রই বলে দেয়—কে প্রতিহিংসা করে আর কে গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষা করে।

মেধার আলোকবর্তিকা ও আইনের শাসনের অঙ্গীকার

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি বাংলাদেশের নারী জাগরণ ও মেধার প্রতীক। তার ছাত্রজীবনের একটি গল্প আজও অনেকের মুখে মুখে ফেরে। বোর্ড পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করার পর সাংবাদিকরা যখন তার স্বপ্নের কথা জানতে চেয়েছিলেন, কিশোরী শিরীন শারমিন বিনয়ের সাথে বলেছিলেন, “আমি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে চাই।” তিনি তার কথা রেখেছেন। লন্ডনের বিখ্যাত এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পিএইচডিধারী এই ব্যক্তিত্ব যখন স্পিকারের চেয়ারে বসেছেন, তখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যে সেই আইনি পাণ্ডিত্যের ছাপ ছিল স্পষ্ট। অথচ আজ তাকে যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় জড়ানো হচ্ছে, তা যেন সেই ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নটাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার: আওয়ামী লীগের উদারতার দলিল

রাজনীতিতে সৌজন্যবোধের অভাব যখন প্রকট, তখন আমাদের ফিরে তাকাতে হয় আওয়ামী লীগ আমলের একটি দৃষ্টান্তের দিকে। বিএনপির সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে চিকিৎসার নামে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও পাঁচটি মামলা ছিল। আওয়ামী লীগ চাইলে তাকে আইনি গ্যাঁড়াকলে আটকে রাখতে পারত। কিন্তু দলটির রাজনৈতিক দর্শন প্রতিহিংসার নয়, বরং সংশোধনের।

বিবেচনা ও ন্যায়বিচার: আওয়ামী লীগ সরকার তাকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা না করে বিষয়টি আদালতের ওপর ছেড়ে দেয়।

সম্মানজনক সমাধান: আদালত যখন তাকে আত্মসাৎকৃত ২৭ লাখ ৮৬ হাজার ৩৬৪ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন, তিনি তা পরিশোধ করেন। এরপর আপিল বিভাগ তার মামলাগুলো বাতিল করে তাকে সসম্মানে অব্যাহতি দেয়।

সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন প্রবীণ রাজনীতিক ও সাবেক স্পিকারকে কারাগারে না পাঠিয়ে তাকে আইনি পথে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া—এটিই হলো আওয়ামী লীগের উদার রাজনীতির প্রকৃত প্রতিফলন।

গণতন্ত্রের সূতিকাগার বনাম প্রতিহিংসার রাজনীতি

আওয়ামী লীগকে বলা হয় বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সূতিকাগার। দলটি সবসময় বিশ্বাস করেছে যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর মতো একজন স্বচ্ছ ইমেজের ব্যক্তিত্বকে যখন ভিত্তিহীন মামলার জালে জড়ানো হয়, তখন তা কেবল তাকে অপমান করা নয়, বরং পুরো সংসদীয় কাঠামোর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার শামিল।

“আওয়ামী লীগ সবসময় উদার গণতন্ত্র এবং সহনশীলতার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর মতো মেধাবী মানুষদের যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হেনস্তা করা হয়, তখন তা ইতিহাসের একটি কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে।”

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা। আওয়ামী লীগ তার শাসনামলে বিরোধী দলের স্পিকারের প্রতি যে সম্মান ও আইনি শিথিলতা দেখিয়েছে, তা ছিল সুস্থ রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।

একটি দেশের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, তা বোঝা যায় সেই রাষ্ট্র তার গুণীজনদের প্রতি কেমন আচরণ করছে তা দেখে। আওয়ামী লীগ দেখিয়েছিল কীভাবে বিরোধী দলের শীর্ষ ব্যক্তিদের আইনি অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করতে হয়। আর আজ আমরা দেখছি তার বিপরীত এক নিষ্ঠুর চিত্র। ক্ষমতার হাতবদল হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক শিষ্টাচার হারিয়ে গেলে সেই ক্ষতি অপূরণীয়। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর মতো মেধাবী মানুষেরা ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়েই থাকবেন, আর প্রতিহিংসার রাজনীতি নিক্ষিপ্ত হবে আস্তাকুঁড়ে।

লেখক: কর্মসংস্থান সম্পাদক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়৷

পল্লব রানা পারভেজ
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে স্পিকারের আসনটি পরম শ্রদ্ধার এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলী আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অন্ধকার দিক উন্মোচিত করেছে। একদিকে আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের উদারতা ও আইনি মহানুভবতা, অন্যদিকে বর্তমান অস্থির সময়ে দেশের প্রথম নারী স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর প্রতি আচরণের বৈপরীত্য। এই দুই চিত্রই বলে দেয়—কে প্রতিহিংসা করে আর কে গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষা করে।

মেধার আলোকবর্তিকা ও আইনের শাসনের অঙ্গীকার

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি বাংলাদেশের নারী জাগরণ ও মেধার প্রতীক। তার ছাত্রজীবনের একটি গল্প আজও অনেকের মুখে মুখে ফেরে। বোর্ড পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করার পর সাংবাদিকরা যখন তার স্বপ্নের কথা জানতে চেয়েছিলেন, কিশোরী শিরীন শারমিন বিনয়ের সাথে বলেছিলেন, “আমি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে চাই।” তিনি তার কথা রেখেছেন। লন্ডনের বিখ্যাত এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পিএইচডিধারী এই ব্যক্তিত্ব যখন স্পিকারের চেয়ারে বসেছেন, তখন তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যে সেই আইনি পাণ্ডিত্যের ছাপ ছিল স্পষ্ট। অথচ আজ তাকে যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় জড়ানো হচ্ছে, তা যেন সেই ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নটাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার: আওয়ামী লীগের উদারতার দলিল

রাজনীতিতে সৌজন্যবোধের অভাব যখন প্রকট, তখন আমাদের ফিরে তাকাতে হয় আওয়ামী লীগ আমলের একটি দৃষ্টান্তের দিকে। বিএনপির সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে চিকিৎসার নামে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও পাঁচটি মামলা ছিল। আওয়ামী লীগ চাইলে তাকে আইনি গ্যাঁড়াকলে আটকে রাখতে পারত। কিন্তু দলটির রাজনৈতিক দর্শন প্রতিহিংসার নয়, বরং সংশোধনের।

বিবেচনা ও ন্যায়বিচার: আওয়ামী লীগ সরকার তাকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা না করে বিষয়টি আদালতের ওপর ছেড়ে দেয়।

সম্মানজনক সমাধান: আদালত যখন তাকে আত্মসাৎকৃত ২৭ লাখ ৮৬ হাজার ৩৬৪ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন, তিনি তা পরিশোধ করেন। এরপর আপিল বিভাগ তার মামলাগুলো বাতিল করে তাকে সসম্মানে অব্যাহতি দেয়।

সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন প্রবীণ রাজনীতিক ও সাবেক স্পিকারকে কারাগারে না পাঠিয়ে তাকে আইনি পথে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া—এটিই হলো আওয়ামী লীগের উদার রাজনীতির প্রকৃত প্রতিফলন।

গণতন্ত্রের সূতিকাগার বনাম প্রতিহিংসার রাজনীতি

আওয়ামী লীগকে বলা হয় বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সূতিকাগার। দলটি সবসময় বিশ্বাস করেছে যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর মতো একজন স্বচ্ছ ইমেজের ব্যক্তিত্বকে যখন ভিত্তিহীন মামলার জালে জড়ানো হয়, তখন তা কেবল তাকে অপমান করা নয়, বরং পুরো সংসদীয় কাঠামোর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার শামিল।

“আওয়ামী লীগ সবসময় উদার গণতন্ত্র এবং সহনশীলতার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর মতো মেধাবী মানুষদের যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হেনস্তা করা হয়, তখন তা ইতিহাসের একটি কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে।”

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা। আওয়ামী লীগ তার শাসনামলে বিরোধী দলের স্পিকারের প্রতি যে সম্মান ও আইনি শিথিলতা দেখিয়েছে, তা ছিল সুস্থ রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।

একটি দেশের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, তা বোঝা যায় সেই রাষ্ট্র তার গুণীজনদের প্রতি কেমন আচরণ করছে তা দেখে। আওয়ামী লীগ দেখিয়েছিল কীভাবে বিরোধী দলের শীর্ষ ব্যক্তিদের আইনি অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করতে হয়। আর আজ আমরা দেখছি তার বিপরীত এক নিষ্ঠুর চিত্র। ক্ষমতার হাতবদল হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক শিষ্টাচার হারিয়ে গেলে সেই ক্ষতি অপূরণীয়। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর মতো মেধাবী মানুষেরা ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়েই থাকবেন, আর প্রতিহিংসার রাজনীতি নিক্ষিপ্ত হবে আস্তাকুঁড়ে।

লেখক: কর্মসংস্থান সম্পাদক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়৷

আরো পড়ুন

সর্বশেষ