ফেব্রুয়ারির সেই অংশগ্রহণহীন নির্বাচনের পর বিএনপি যখন ক্ষমতায় বসেছে এবং জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলের ভূমিকায়, তখন তানোরের ঘটনা প্রমাণ করে দিলো, এই দুই দলের মধ্যকার পুরনো সাম্প্রদায়িক মানসিকতার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি তার পুরনো চরিত্রে ফিরেছে, আর জামায়াতও বিরোধী দল হয়ে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অন্য ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ পাঠ বন্ধের নির্দেশ দিচ্ছে। স্বাধীনতা দিবসের মতো জাতীয় দিবসে গীতা পাঠে আপত্তি জানানো জামায়াত এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের এই নির্দেশনা শুধু ব্যক্তিগত উক্তি নয়, বরং তাদের দর্শনেরই প্রতিফলন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশগ্রহণ করেনি। জনগণের একাংশ সেই ভোট বয়কট করেছে। তবুও বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে এবং জামায়াত হয়েছে বিরোধী দল। এই বাস্তবতায় তানোরের ইউএনও নাঈমা খান যখন জামায়াত এমপির নির্দেশনা অমান্য করে রাষ্ট্রীয় নিয়মে গীতা পাঠ করান, তখন তিনি কেবল প্রশাসনিক দায়িত্বই পালন করেননি, বরং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধরে রেখেছেন। অথচ ক্ষমতাসীন বিএনপি থেকে শুরু করে বিরোধী দল জামায়াত, দুই জায়গাতেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি যে বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে গেছে।
জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে।মানবতাবিরোধী অপরাধে তাদের অনেক নেতাকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়েছে। সেই সংগঠন আজ যখন সংসদের বিরোধী দল, তখনও তাদের কর্মপদ্ধতি একই – ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি করা, সংখ্যালঘুদের অনুভূতিতে আঘাত করা। তানোরের এমপি মুজিবুর রহমান কেন্দ্রীয় জামায়াতের নায়েবে আমির। তিনি মোবাইল ফোনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলে দিয়েছেন, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ করা যাবে না। শুধু কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে।
এ নির্দেশনা জামায়াতের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার সাম্প্রতিক উদাহরণ মাত্র। তাঁরা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের জন্য। অথচ বাংলাদেশ সংবিধানের মূল চেতনাই হলো ধর্মনিরপেক্ষতা ও সকল ধর্মের সমান মর্যাদা। জামায়াত এই চেতনার বিরুদ্ধে সব সময় অবস্থান করে এসেছে।
বিএনপি এখন ক্ষমতায়। এই দলটির জন্মই সেনানিবাসে, জিয়াউর রহমানের হাতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে তিনি ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে রাজনীতি করেছেন। বিএনপি ক্ষমতায় এসে আজ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুঁজি করে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সুসম্পর্ক থেকে গেছে। তানোরের অনুষ্ঠানে উপজেলা জামায়াতের আমিরের পাশাপাশি বিএনপি নেতারা উপস্থিত ছিলেন, এটাও যেন দুই দলের সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে।
যখন ইউএনও জামায়াতের আমিরকে বলেন, ‘এমপি স্যার তো গীতা পাঠ করতে নিষেধ করেছেন, তাহলে আমরা কী করব?’ সেখানে জামায়াতের আমিরকেও বাধ্য হয়ে বলতে হয়, ‘রাষ্ট্রীয় নিয়মে যেটা আছে সেটাই করবেন।’ কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ক্ষমতাসীন বিএনপি কেন এই সাম্প্রদায়িক নির্দেশনার বিরুদ্ধে কিছু বলল না? কেন তাঁরা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের পক্ষে সরব হলেন না? নীরবতা মানেই সমর্থন, এই সত্যটি বিএনপিকেও আড়াল করতে পারবে না।
তানোরের ইউএনও নাঈমা খান সঠিক কাজটি করেছেন। তিনি নির্দেশনা অমান্য করে কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি গীতা পাঠ করিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান রাষ্ট্রীয় নিয়মে পালন করতে হবে।’ এই এক লাইনের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে একজন দায়িত্বশীল প্রশাসকের সংবিধান ও আইনের প্রতি আস্থা। জামায়াতের এমপি যতই নির্দেশনা দিন না কেন, রাষ্ট্রের কর্মকর্তা আইনের বাইরে যেতে পারেন না। নাঈমা খান প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের প্রশাসনে এখনও অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ আছেন যারা সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সামনে মাথা নত করেন না।
একটি চিরন্তন সত্য হচ্ছে, অন্যের ধর্মকে সম্মান করলে নিজের ধর্মের সম্মান আরও বাড়ে। কয়লা ধুলে যেমন হাত কালো হয়, তেমনি অন্য ধর্মকে অপমান করে নিজের ধর্মকে বড় করার চেষ্টা কখনো সফল হয় না। জামায়াতের এমপি যদি মনে করেন, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে গীতা পাঠ করলে ইসলামের অবমাননা হয়, তাহলে এটা তাঁর নিজস্ব সংকীর্ণতা মাত্র। প্রকৃত ইসলামও অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।
বাংলাদেশ হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের দেশ। এ দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান – সব ধর্মের মানুষ শতাব্দী ধরে শান্তিতে বসবাস করে আসছে। স্বাধীনতা দিবস এই সকল মানুষের যৌথ অর্জন। সেখানে শুধু একটি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ পাঠ করানো হবে, আর অন্যটি বাদ দেওয়া হবে -এটা কাম্য নয়, এটা সংবিধানসম্মতও নয়।
বাংলাদেশের জনগণ বারবার প্রমাণ করেছে, তারা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে। বিএনপি যেভাবে ক্ষমতায় এলো, তাতে জনগণের প্রকৃত রায় প্রতিফলিত হয়নি। তবুও প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যখন আইনের প্রতি অটল থাকেন, তখন সাম্প্রদায়িক অপশক্তি প্রতিহত হয়। তানোরের ইউএনও দেখিয়েছেন রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে দিলে সাম্প্রদায়িক নির্দেশনা কোনো কাজে আসে না।
জামায়াতের এমপি মুজিবুর রহমানের এই নির্দেশনা আর বিএনপির নীরবতা, দুই মিলেই সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা মেনে নেওয়ার নয়। দেশের জনগণ, সংস্কৃতিচর্চাকারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রগতিশীল শক্তিকে এখন এক হয়ে দাঁড়াতে হবে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যেখানেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠুক, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তানোরের ইউএনও যেমন রাষ্ট্রীয় নিয়মে অনুষ্ঠান করিয়েছেন, তেমনই সব স্তরে আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক নির্দেশনার উৎস শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
স্বাধীনতা দিবসে গীতা পাঠের এই ঘটনা সামান্য নয়। এটি এমন একটি বার্তা, ধর্মের নামে বিভাজন সৃষ্টিকারী শক্তি এখনও সক্রিয়। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে, সামাজিকভাবে, ব্যক্তিগতভাবে সবার অবস্থান নেওয়া দরকার। কেবল তখনই বাংলাদেশ তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ধরে রাখতে পারবে।

