সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১ জন শিশু আইসিইউ ভেন্টিলেটরের অভাবে মারা গেছে। এতে তারেকের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছেন উক্ত হাসপাতালের পরিচালকের ফাঁসি হওয়া উচিত, তিনি কেন সময়মত ভেন্টিলেটর না থাকার ব্যাপারটি মন্ত্রীকে জানান নি?
এবার আমি একটু অন্য হিসাব দেই। আমাদের আওয়ামীলীগ সরকারের শাষনামলে ডিজিটাল বাংলাদেশ এর প্রতিশ্রুতি হিসেবে যেসব উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে দাড়িয়েছে এর মাঝে অন্যতম হলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়াধীন ডিজিটাল রিপোর্টিং সিস্টেম। আওয়ামীলীগ সরকারের সময় দেশের সকল সরকারি হাসপাতাল এমনকি কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত অনলাইন রিপোর্টিং এর বাধ্যবাধকতা করা হয়েছিল। হাসপাতালের নানা বিষয়ে রিপোর্টিং করা, সেই রিপোর্টে হাসপাতালে কার্যকর ও সর্বমোট ভেন্টিলেটর এর সংখ্যার ও হিসাব থাকে। এই রিপোর্টিং এর ভিত্তিতে ২০১৭ সাল থেকে হেলথ সিস্টেম স্ট্রেন্থেনিং স্কোর এর ভিত্তিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রী জাতীয় পুরষ্কার দেয়া হয়। সেই স্কোর এবং রিপোর্টিং সবই কিন্তু অনলাইন।
কৌতুহল বশত আজকে চেক করে দেখলাম সর্বশেষ আপডেট হয়েছে জুলাই ২০২৫ সালে। সেই র্যাংকিং এ মেডিকেল কলেজ ক্যাটেগরিতে প্রথম রাজশাহী মেডিকেল কলেজ। সুতরাং র্যাংকিং অনুসারে বলা যায় ২০২৫ সালের জুলাইতে এই র্যাংকিং অনুযায়ী দেশের সেরা হাসপাতাল ছিলো রাজশাহী। এবং সেই সময় পর্যন্ত ২০টি ভেন্টিলেটরের মাঝে ২০টিই সচল ছিলো। এই সেরা হাসপাতালেই যদি ভেন্টিলেটরের অপেক্ষা ১১ শিশু মারা যায় তাহলে বাকিগুলোর কি অবস্থা? এবং এর দায় কার? অবশ্যই ২০২৫ এ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী ইউনূচের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান এর।
দায় এর হিসাবে যাবার আগে আরও কি কি ডাটা আছে দেখি। ডিজি হেলথের এই স্কোরিং ছাড়াও আরেকটা রিপোর্ট আছে যাকে বলা হয় লোকাল হেলথ বুলেটিন। জিনিসটা খুব চমৎকার, এক ক্লিকে হাসপাতালের একটি পরিসংখ্যানিক রিপোর্ট তৈরি হয় যেখানে নানা ধরনের হিসাব থাকে। সেই হিসেবে “আইসিটি ইকিউপমেন্ট” অর্থাত ল্যাপটপ কম্পিউটারের হিসাব থাকলেও ভেন্টিলেটরের হিসাব থাকে না। তবে হাসপাতালের মাসিক ব্যবস্থাপনা সভায় কি কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে তা লিপিবদ্ধ থাকে। দেখলাম রাজশাহী মেডিকেলে সর্বশেষ এই আলোচনা হয়েছে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে। সেই আলোচনাতে ভেন্টিলেটরের কোন আলাপ নেই। এর পরে আর কোন আলোচনা নেই কিংবা অনলাইনে আপডেট করা হয়নি।
এই আলোচনার সভাপতি থাকে উক্ত এলাকার সংসদ সদস্য। দেশের সকল সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি উক্ত এলাকার সাংসদ। এই ব্যবস্থা রাখাই হয়েছিলো যেন হাসপাতালের সমস্যা সম্পর্কে এমপিরা জানেন এবং তারা সরকারের কাছে সমাধানের তাগিদ দিতে পারেন। সুতরাং যদি হাসপাতালের কোন সমস্যা হয়ে থাকে তার দায় যতটা পরিচালকের ঠিক ততটাই এমপিদের। বিএনপি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রী কি উক্ত এলাকার এমপিকেও ফাঁসিতে চড়াবেন?
বলতে পারেন মাত্র তো সরকার গঠন হলো, এমপির হাসপাতাল মিটিং এ থাকার সময় আসেনি এখনো। কিন্তু বিএনপি সরকারের এক মাসের বেশি সময় পার হয়েছে। হাসপাতাল পরিদর্শন রাজশাহী মেডিকেলে কি এমপি গিয়েছিলেন? উক্ত এলাকার এমপি বিএনপির মিজানুর রহমান মিনু। তাকে কি প্রশ্ন করা হয়েছে যে তিনি হাসপাতালের সমস্যার ব্যাপারে জানতেন কিনা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় গিয়েছিলেন কিনা?
এই ব্যবস্থাপনা সভার বাইরেও প্রতিটি জেলার সিভিল সার্জন অভিস ও বিভাগের বিভাগীয় অফিস অধিনস্ত হাসপাতালগুলোতে অনসাইট মনিটরিং করার কথা প্রতিমাসে। সেই মনিটরিং এর চেকলিস্ট আছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই মনিটরিং সর্বশেষ কবে হয়েছিলো? আরও বলি, হাসপাতাল লজিস্টিক্স ম্যানেজমেন্ট এর জন্য আলাদা অনলাইন সিস্টেম আছে। সেখানেও রিপোর্ট হয় কি আছে কি নেই এর। সেই রিপোর্ট পাবলিক নয়। এর বাইরে ডিজি হেলথের DHIS2 সিস্টেমেও প্রতিমাসে সব হাসপাতাল রিপোর্ট করে যার মাঝে ভেন্টিলেটরের হিসাবও থাকে। এই সকল রিপোর্ট অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দেখেন (অন্তত দেখার কথা)।
হাসপাতালের ব্যাপারে রোগীরা কি অভিযোগ এসএমএস পাঠালো এবং তার সমাধান হলো কিনা সেটাও পাবলিক ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়। কানাডার একটি প্রাদেশিক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আমার বন্ধু কাজ করে। ও আমাকে একদিন বলেছে জননেত্রী শেখ হাসিবা স্বাস্থসেবার জন্য যেসব মনিটরিং ব্যাবস্থা করেছিলেন এত ব্যবস্থা কানাডাতেও নেই। দেশের জনগণ এই সব রিপোর্ট দেখে সহজেই উপলব্ধি করতে পারবে আওয়ামীলীগ শাষনামলে স্বাস্থ্য ব্যাবস্থা আর বিএনপি এর সময় কোথায় যাচ্ছে এই স্বাস্থ্য খাঁত।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে সিস্টেমের অভাব নেই, রিপোর্টের অভাব নেই, সেসব দেখার লোকেরও অভাব নেই। কিন্তু দেখতে কতজন? আসলেই কি দেখছে কেউ? দেখলে সমাধান হচ্ছে না কেন? কোথায় আটকে যাচ্ছে? রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মন্ত্রীকে ফোন করে কেন জানাবেন?
মন্ত্রী বা তার দপ্তর তো নিজেরাই দেখতে পারেন, পরিচালকের কি সার্বক্ষণিক একসেস আছে মন্ত্রীর ফোনে? যথাযথ নিয়মমাফিক পরিচালক মহোদয় কি সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন? আর না জানালেও মন্ত্রীর দপ্তরে প্রতিটি হাসপাতাল এর নজরদারী করার জন্য নানা পর্যায়ের ব্যুরোক্র্যাট নিযুক্ত করা আছে। তাদেরও জানার ও দেখার কথা হাসপাতালে কি আছে কি নেই।
জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিরানব্বইভাগ সমস্যার সমাধানের ক্ষমতা বহু “সিস্টেম” তৈরি করে রেখেছেন। বিএনপির স্বাস্থ্যমন্ত্রী আওয়ামীলীগ সরকারের করা এসব রিসোর্স কে কাজে না লাগিয়ে অদক্ষ ও অথর্ব এর পরিচয় দিয়েছে। সেই সাথে প্রশ্ন জাগে আওয়ামীলীগ সরকারের সময় বাস্তবায়িত স্মার্ট স্বাস্থ্যখাঁত আজ ধ্বংসের পথে।

